দীক্ষা নিলে শ্রাদ্ধ বাড়িতে খাওয়া যায় না কেন?

0
1263

গুরু মহারাজ একটা গল্প বলতেন, সেটা আগে বলি। এই গল্পটা এক সত্য ঘটনা। অনেক সাধুরা গল্পটা বলে থাকেন। একবার এক সাধু ঘুরতে ঘুরতে এক গ্রামে এসে পৌঁছান। সন্ধেবেলা তিনি সেই গ্রামের এক মন্দিরে আশ্রয় নেন। সাধুরা যাঁরা পরিব্রাজন করেন, এখান থেকে ওখানে যান, তাঁরা সাধারণত কারুর বাড়িতে থাকেন না বা শয়ন করেন না। কোন আশ্রম বা মন্দির থাকলে সেখানেই থাকেন। আর মন্দির সব গ্রামেই, সব স্থানেই থাকে। যাই হোক সেই মন্দিরে শতরঞ্জি ছিল, পাতলেন। মন্দিরের যিনি পুরোহিত তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘রাতে কিছু ভোজন করবেন তো?’ সাধু বলেন, ‘যদি চাল, ডাল, আলু নিয়ে আসেন।’ সাধু সেটাকে ফুটিয়ে নিয়ে খেয়ে নেন। পুরোহিত দেখলেন মানুষটা ভাল, শুধু শুধু বাইরের চাতালে শোবেন কেন, সাধুকে বলেন ‘আপনি রাত্রে মন্দিরের ভেতরেই শুয়ে পড়ুন।’ মন্দিরের মধ্যে সাধুকে শুতে দিয়ে পুরোহিত বাড়ি চলে যান। অনেক রাতে সাধুর ঘুম ভেঙে গেল। আর প্রদীপের সেই অল্প আলোয় তিনি দেখতে পেলেন মায়ের সারা অঙ্গে মহা মূল্যবান সব অলংকার রয়েছে। তাঁর তখন মনে হোল এই সমস্ত গয়না-গাটি মন্দিরের তো কোন কাজে লাগবে না, আর আমারও তো কিছুই নেই, আমার কাজে লাগতে পারে। এই ভেবে সাধু আস্তে আস্তে মন্দিরের বিগ্রহ থেকে সমস্ত গয়না-গাটি খুলে নিজের ঝোলায় ঢুকিয়ে নিলেন। তারপর খুব দ্রুত কম্বল-টম্বল গুটিয়ে রেখে হাঁটা দিলেন। প্রতিদিনের মত সেদিনও ভোরবেলা যখন সূর্য উঠেছে পুরোহিত মন্দিরে এসেছেন মন্দির পরিষ্কার করার জন্য। এসে তিনি দেখেন সাধুও নেই আর মায়ের গায়ে একটাও গয়না নেই। এই দেখে তিনি তো বিকট হাঁকডাক শুরু করে দিলেন। ডাক শুনে গ্রামবাসীরা হাজির। পুরো ঘটনা শুনে তারা এতই রেগে গেল যে হাতের কাছে যে যা পেল …লাঠি, বাঁশ, ইট, পাটকেল তুলে নিয়ে ঠিক করল যেমন করে হোক সাধুকে খুঁজে বার করবই, মেরেই ফেলব আজ তাঁকে। ওদিকে সাধুও গ্রামবাসীদের হাতে ধরা পড়ে যাবার ভয়ে ছুটতে ছুটতে যাচ্ছেন। এবার ভোরবেলায় তাঁর মলত্যাগের বেগ এসে গেছে। এক পুকুরের ধারে ঝোলাটিকে পাশে রেখে যথারীতি মলত্যাগ করেছেন তিনি। করার পর ঝোলাটির দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবছেন, এ আমি কি করলাম? আমি সাধু হয়েছি, ত্যাগের জীবন বেছে নিয়েছি, শেষে কিনা আমি মন্দিরের গয়না চুরি করে পালাচ্ছি! শেষ পর্যন্ত আমার এই হাল হোল! এতটা অবনতি হল! আমি তো কোনদিন ভাবতেও পারিনি যে কখনও চুরি করতে পারি! তিনি ভাবতে লাগলেন যে কেন আমার এমন হোল? যাই হোক তিনি অনেক ভেবে ঠিক করলেন যে যা হয়েছে হয়েছে, মার খেতে হয় তো তাও খাব, জেল খাটতে হলে খাটব, তাও আমি এটা যথাস্থানে ফেরত দেব। তখন সেই ঝোলা নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে সাধু আবার সেই গ্রামের দিকেই ফিরতে লাগলেন। এদিকে গ্রামবাসীরা সবাই যখন মারমুখো হয়ে বেরিয়ে পড়েছে, তারা দেখে যে সাধু নিজেই ফিরে আসছেন। সেই দেখে উপস্থিত বিজ্ঞজনেরা বললেন, ‘ওকে মেরো না, ও যখন নিজেই ফিরে আসছে, আগে শোন কী বলতে চায়।’ সাধু ফিরে এসে ঝোলাটা পুরোহিতের হাতে দিয়ে বললেন, ‘আমাকে মারার আগে একটা কথা তুমি ব’ল যে তুমি কি শ্রাদ্ধের পুজো ক’র?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ করি’। সাধু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কালকে আমাকে যে চাল, ডাল, আলু দিয়ে গেলে সেগুলো কি শ্রাদ্ধ থেকে পাওয়া?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ, শ্রাদ্ধ থেকেই ওগুলো পাওয়া’। ‘কবে মারা গেছে সে’, সাধুর প্রশ্নে পুরোহিত বললেন, ‘এই দিন চারেক আগেই সে মারা গেছে’। সাধু আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেমন লোক ছিল সে?’ সবাই সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘ভীষণ দুর্নীতিগ্রস্ত লোক, মহা চোর ছিল সে।’ সাধু নিজেও বুঝলেন ব্যাপারটা, উপস্থিত সকলকেও বোঝালেন। সাধু শ্রাদ্ধের অন্ন খাবার পরে যখন মলত্যাগ করলেন শরীরের মধ্যে থেকে খাদ্যের দোষ ও প্রভাব অনেকটা কেটে গেল। শ্রাদ্ধের অন্নের প্রভাব খুবই শক্তিশালী হয়। তা বলে বলছি না যে সবাই খুব খারাপ লোক। কিন্তু যার মৃত্যু হয়েছে তাকে যখন অন্ন নিবেদন করা হচ্ছে আর সেই অন্ন যখন আমরা গ্রহণ করছি তখন মৃত্যুপথযাত্রীর সংস্কার, কামনা ও বাসনা যেহেতু খুব তীব্র থাকে তাই সেই খাদ্যের প্রভাবও খুব দ্রুত অনুভব করা যায়। বিশেষ করে মৃত্যুর সময় এগুলোর তীব্রতা আরও বেশি থাকে। মানুষের যখন মৃত্যু হয় তখন জীবনে কি কি করতে পারলাম না, আর শরীর ও মনের যে সকল বাসনাগুলো ছিল, সেগুলো আরও প্রবল হয়ে ওঠে। কারণ সেগুলো পুরণ না করেই শরীর চলে যাচ্ছে। মৃত্যুর পরে সেই অবস্থায় তার প্রেতযোনি বা সূক্ষ্ম শরীরটা থাকে। নিবেদন করা খাদ্যে তার প্রচণ্ড লোভ থাকলেও সে সেটা খেতে পারে না কারণ তখন সে শরীরে নেই। কিন্তু খাদ্যের সাথে যে শুধু স্থূল যোগই থাকে তা নয়, মনেরও যোগ থাকে। যেমন ধর কোন বাড়িতে গিয়ে অনেক ভাল-মন্দ খাওয়ার পরেও তুমি দেখলে তোমার ঠিক তৃপ্তি হচ্ছে না। তার কারণ সেই বাড়িতে যেভাবে উপার্জন করা হয় এবং রান্না করা হয় তা তামসিক। আর সেই ভাব সেই খাবারকে দূষিত করছে বলেই সেই খাদ্য শরীরে প্রবেশ করে তোমার মনকে প্রভাবিত করছে। আবার হয়ত কোন বাড়িতে তুমি সাদামাটা ভাতেভাত, আলু সেদ্ধ খেয়ে যেন মনের মধ্যে একটা তৃপ্তি ও আনন্দ পেলে। তার মানে জানবে সেই বাড়িতে যেভাবে উপার্জন হয় তা সৎভাবে হয় এবং একটা সেবা ও ভালবাসার মন নিয়ে রান্না করা ও খেতে দেওয়া হয়। সুতরাং খাদ্যের সাথে মনের একটা সম্পর্ক থাকে। কি মন নিয়ে খাবারটা নিয়ে আসা হয়েছে, কি মন নিয়ে রান্না করা হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করছে তার প্রভাব আমাদের শরীরে কেমন থাকবে। সুতরাং মৃতের প্রতি উৎসর্গ করা খাবারের প্রতি মৃত ব্যক্তির একটা প্রবল টান থাকে বা বলা যায় খাদ্যের যে সূক্ষ্মতা সেটা সূক্ষ্ম শরীর টেনে নেয়। তাই সেই খাবার খেলে মৃতের কামনা, বাসনা ও তার কষ্ট তোমার মধ্যে প্রভাব ফেলবেই। বিশেষ করে যদি কারুর দীক্ষা হয়ে থাকে তার ওপর বেশি প্রভাব দেখা যায়। কারণ দীক্ষা নেওয়ার পর সে তার জীবন যাপন পাল্টায়, ধ্যান জপ করে, ঈশ্বর চিন্তা করে বলে তার শরীরের মধ্যে এক ধরণের সাত্ত্বিকতা ফুটে ওঠে। তাই যার দীক্ষা হয়েছে সে তার নিজের মধ্যে ঐ খাবারের প্রভাব ভালভাবে অনুভব করতে পারে। আবার অনেকে আছে দীক্ষা না হওয়া সত্ত্বেও ছোটবেলা থেকেই শ্রাদ্ধ বাড়ির খাবার খেয়েই অসুস্থ বোধ করে। রান্না হয়ত ভালই হয়েছে, সে অত শ্রাদ্ধের বিষয়ে হয়ত জানেও না, তাও অসুস্থ হয়ে পড়ে, দু’দিন তিনদিন ধরে তার রেশ থাকে। এই কারণেই দীক্ষা নেওয়ার পরে শ্রাদ্ধ বাড়িতে খেতে বারণ করা হয়। সবাই এই কথাটা বোঝে না বলেই ‘কেন খাবি না, কি হবে একদিন খেলে…’ বলে খিটিমিটি শুরু করে দেয়। শ্রাদ্ধ বাড়িতে যদি বাইরে থেকে বা দোকান থেকে কেউ ফল, মিষ্টি বা অন্য কিছু এনে দেয় সেটা খাওয়া যায়। এমনকি যদি আলাদা রান্না করেও কিছু দেয় সেটাও খাওয়া যায়। কিন্তু মৃতকে নিবেদন করা বা তার চিন্তা করা যে খাবার, সেই খাবারটা সাধারণত দীক্ষিত যারা তাদের খেতে বারণ করা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here