হিন্দুশাস্ত্র মতে ১০৮ মালা জপ করা ও তার ফলাফল

0
495

হিন্দু পুরাণে ১০৮ নম্বরের গুরুত্ব কী? ভারতীয় পৌরাণিক কথায়, ভারতীয় সংস্কৃতির সংখ্যা ১০৮-র একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই সংখ্যা আসলে কী? কেনই বা এই সংখ্যা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ? আসুন একনজরে দেখে নেওয়া যাক।
১। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতি মিনিটে প্রায় ১৫ বার শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ ও বর্জন করেন, তাহলে ১ ঘন্টায় ৯০০ বার এবং ১২ ঘন্টায় ১০,৮০০ বার। ২৪ ঘণ্টায় একদিন হয় এবং যদি আমরা প্রতিদিনের রুটিনের জন্য অর্ধেক দিন সরিয়ে রাখি তবে একজন মন্ত্রপাঠের জন্য ১২ ঘন্টা ব্যয় করতে পারেন। অতএব, সর্বাধিক সংখ্যক ব্যক্তি যে “মন্ত্র” বা “জপ” সম্পাদন করতে পারেন সেটি হল ১০,৮০০। যদি কেউ তার জপের ১০০ শতাংশ পূণ্য বা ফল পেতে চান, তবে ১০৮ বার জপ করলে সেই সুবিধা তিনি পেয়ে যাবেন। এইকারণে একটি “জপমালা”য় ১০৮ জপমালা আছে। বেদে লেখা আছে, যে ১ জন ১ মালা (যার ১০৮টি পান্না আছে) এর সাথে সম্পর্কিত, তাই ১০৮ জপমালাগুলির জপ সম্পাদন করলে ১০০ শতাংশ সুফল পাওয়া যায়।
২) জ্যোতির্বিদ্যাগতভাবে, আমাদের ছায়াপথের মধ্যে ২৭টি নক্ষত্রপুঞ্জ রয়েছে, এবং প্রত্যেকের মধ্যে ৪টি করে দিক রয়েছে অর্থাৎ ২৭x৪= ১০৮, এককথায় বলতে গেলে ১০৮ নম্বরটি সম্পূর্ণ ছায়াপথকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে।
৩) ভারতীয় ধর্মগ্রন্থ অনুসারে, ৯ সংখ্যাটি ভগবান ব্রহ্মা (মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা)র বলে মনে করা হয়। হিন্দু ধর্মে, সংখ্যা ৯ এর খুবই গুরুত্ব। তাই ৯ নম্বরের গুরুত্ব বিবেচনা করে ঋষি ব্যাস ৯টি পুরাণ, ১০৮টি মহাপুরাণ (উপনিষদ) তৈরি করেছিলেন। মহাভারতে ১৮টি অধ্যায় রয়েছে। গীতাতেও ১৮টি অধ্যায় রয়েছে, ভাগবতে রয়েছে ১ লক্ষ ৮ হাজার শ্লোক। ভারতীয় বেদে, সূর্যকে ঈশ্বর হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং সূর্যের ১২ টি চিহ্ন (রাশিচক্র চিহ্ন) রয়েছে। যজুর্বেদে, সূর্য ব্রহ্মার সঙ্গে সম্পর্কিত। সূর্যের ১২ সংখ্যা এবং ব্রহ্মার ৯ সংখ্যা গুনিত করলে ১০৮ হয়। অতএব, ভগবানের উপাসনার জন্য ১০৮ সংখ্যাটি খুবই গুরুতবপূর্ণ ও পবিত্র।
৪) হিন্দু পৌরাণিক শাস্ত্র অনুসারে, ৪টি যুগে সময়কাল বিভক্ত।
ক। সত্যযুগের সময়কাল ১,৭২,৮০০ বছরের হয় তথাপি সংখ্যাটি হল (১+৭+২+৮ = ১৮) তেমনি ১+৮ = ৯।
খ। ত্রেতাযুগের সময়কাল ১২ লক্ষ ৯৬ হাজার বছরের হয় তথাপি সংখ্যাটি হল (১+২+৯+৬ = ১৮), তেমনি ১+৮=৯।
গ। দাপর যুগের সময়কাল ৮ লক্ষ ৬৪ হাজার বছরের হয়, তথাপি সংখ্যাটি হল (৮+৬+৪=১৮) তেমনি ১+৮=৯।
ঘ। কলিযুগের সময়কাল হয় ৪ লক্ষ ৩২ হাজার বছরের তথাপি সংখ্যাটি হল (৪+৩+২=৯)।
অর্থাৎ সংস্কৃতের হরশাদকে (পরমাননন্দ) ১০৮ বলে উল্লেখিত, যার আরেক নাম পরমানন্দ। পরমানন্দের জন্য মানুষের ১০৮ সংখ্যাটিকে আকাঙ্ক্ষা বলে মনে করা হয়। মনুষ্য জীবনে ১০৮টি বিভ্রম আছে, যা হৃদয় চক্রকে পরিপূর্ণ করে ও উর্জা শক্তির বিকাশ ঘটায়। কথিত আছে মানুষের হৃদয় চক্রে ১০৮টি উর্জা প্রবাহের পথ আছে। তার মধ্যে সুষুম্না উর্জা পথটি মুকুট চক্র বলে পরিচালিত হয় এবং তাহা মনুষ্যের মধ্যে স্ব উপলব্ধি ঘটায়।
৫) সংস্কৃতে ৫৪টি বর্ণমালা রয়েছে। প্রত্যেকটির মধ্যে পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ আছে যা শিব ও শক্তির প্রতিরূপ। তথাপি ৫৪ সংখ্যাকে ২ দিয়ে গুনিত করলে ১০৮ সংখ্যাই পাওয়া যায়। কথিত আছে কোনও মনুষ্য যদি শিব ও শক্তির অর্থাৎ ১০৮ বার ধ্যান করে বা জপ করে তাহলে তাঁর মুক্তির পথ প্রশস্ত হয়। মনুষ্য শরীরকে শ্রীযন্ত্রও বলা হয়। যাকে তিনটি মূল রেখা দিয়ে বিভক্ত করা আছে এবং ৫৪টি উপবিভাগ আছে। প্রতিটি বিভাগে শিব ও শক্তির সমন্বয় ঘটেছে। তাই ১০৮ বিন্দুতে মনুষ্য শরীরকে শ্রীযন্ত্র হিসেবে দেখা হয়।
৬। ভারতের পবিত্র নদী গঙ্গা, আর এই গঙ্গা নদীর দ্রাঘিমা বিস্তার ১২ ডিগ্রী এবং এর অক্ষাংশ ৯ ডিগ্রী। অর্থাৎ ১২x৯= ১০৮। ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুসারে ১২টি গৃহ ও ৯টি গ্রহ অবস্থিত। এর গুনিত ফলও ১০৮। বলা হয় ভারতীয় শাস্ত্রে ১০৮ দেবদেবীর নাম আছে। শুধু তাই নয়, কৃষ্ণেরও ১০৮টি গোপী ছিল। সূর্যের ব্যাস পৃথিবীর চেয়ে ১০৮গুন বেশি এবং সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সূর্যের ব্যসার্ধের ১০৮ গুণ। তেমনি পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বও ১০৮ গুণ ব্যাসার্ধের সমান। জ্যোতিষশাস্ত্রে রূপা ধাতুকে চাঁদের প্রতিনিধি বলে মনে করা হয়। আশ্চর্যজনকভাবে, রূপার পরমাণু ওজনও ১০৮। যেসব মানুষ তন্ত্র সাধনা করেন তারা ২১ হাজার ৬০০ বার শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করেন। যার মানে হল ১০ হাজার ৮০০ সৌরশক্তি এবং ১০,৮০০ চন্দ্রশক্তি। যা এককথায় বলতে গেলে ১০৮কে ১০০ দিয়ে গুনিত করলে ১০ হাজার ৮০০ হয় এবং ১০ হাজার ৮০০কে ২ দিয়ে গুনিত করলে ২১ হাজার ৬০০ হয়। তাই ১০৮ মালা জপকে ভগবান প্রাপ্তির পথ হিসেবে ধরা হয়। শুধু হিন্দু ধর্মেই নয়, জৈন, শিখ, বুদ্ধ এবং ইসলামেও ১০৮ সংখ্যাকে ঈশ্বর প্রাপ্তির পথ হিসেবে মনে করা হয়। ১৯৬১ সালের ১২ই এপ্রিল প্রথম এক প্রশংসনীয় পূর্ণ আত্মা ইউরি গ্যাগারিন (এক সোভিয়েত মহাকাশ্চারী) মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন এবং তাঁর মহাকাশে পাড়ির জন্য সময় লেগেছিল ১০৮ মিনিট। বিশিষ্ট মহাকাশচারী ও জ্যোতিষবিদদের মতে, ১০৮ সংখ্যাটিকে তিনভাগে ভাগ করে নেন। যেমন- ৩৬ সংখ্যা অতীতের জন্য, ৩৬ সংখ্যা বর্তমানের জন্য এবং ৩৬ সংখ্যা ভবিষ্যতের জন্য।
এইসব মতামত থেকে পরিষ্কার যে, ১০৮ মালা জপের মধ্য দিয়ে যেকোনো মানুষই ঈশ্বরের সংস্পর্শে আসতে পারেন বা ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করতে পারেন। তাই প্রতিটি মানুষেরই উচিত নিয়ম করে ১০৮ মালা জপ করা সে যেকোনো ধর্মাবলম্বী হোন না কেন। মানুষের জীবনে পৃথিবীতে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য হল ঈশ্বর প্রাপ্তির জন্য নিরন্তর ১০৮ মালা জপ করা। কারণ প্রত্যেক মানুষই খালি হাতে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং খালি হাতেই ইহলোক ত্যাগ করেন, শুধু থেকে যায় তাঁর ঈশ্বর প্রাপ্তির চেতনা ও বোধ। তাই প্রত্যেক মানুষের উচিত কাম, ক্রোধ, মোহ, লোভ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ১০৮ মালা নিরন্তর জপ করতে থাকা।