ভারতীয় অঘোরী সাধুরা মহাশ্মশানে কোন সাধনায় নিমগ্ন?

0
802

নিউজ ডেস্ক, এই বাংলায়ঃ অমাবস্যার কালো রাত। আর সেই রাতেই গোটা দেশ যখন নিদ্রা-মগ্ন তখন দেশের কোনও বহু পুরনো শ্মশানে তন্ত্র সাধনায় মগ্ন একদল অঘোরী ও তান্ত্রিক। আমরা ছোট বা বড় বয়সে বিভিন্ন গল্প-কাহিনী বা টিভির পর্দায় এই অঘোরী ও তান্ত্রিকদের বহু কাহিনী ও ঘটনার কথা শুনেছি বাঁ দেখছি। কিন্তু বর্তমান আধুনিক এই যুগেও বাস্তবেও এখনও বিরাজ করেন অঘোরী তান্ত্রিকরা। মূলত অমাবস্যার গভীর-কালো রাতে যখন সাধারণ মনুষ্য জগত গভীর নিদ্রায় মগ্ন থাকেন তখন বিভিন্ন শ্মশানে কিংবা গভীর জঙ্গলে এই তান্ত্রিক সাধু ও অঘোরীরা তাদের তন্ত্র সাধনায় নিবদ্ধ হন। কিন্তু কারা এই অঘোরী। অঘোর শব্দের অর্থ হল সরল। আমাদের সাধারন সমাজে অঘোরীদেরকে নিয়ে ভয়ের সঞ্চার রয়েছে। বহু দিন ধরে আমাদের সমাজে প্রবীন দাদু-ঠাকুমাদের মুখ থেকে অঘোরীদের বিষয়ে বহু ভয়ের কাহিনী আমরা শুনে এসেছি। কিন্তু আসলে অঘোরীদেরকে নিয়ে ভয়ের কোনও উদ্রেকের কারণ। কোনও সদ্যোজাত যখন জন্মায় তখন তার মধ্যে যেমন কোনও লোভ, মায়া, মমতা, পাপ, কামনা, বাসনা এইসবের কোনোটাই উপস্থিত থাকে না, তেমনই অঘোরী সন্তদের মধ্যেও আমাদের এই বিশ্ব সংসারের কোনও প্রভাবই থাকে না। তাই তারা শ্মশানের ছাই, ভস্ম, গভীর জঙ্গল, পাহাড়ের গুহা যেকোনো জায়গায় কোনও রকম সমস্যা ছাড়াই বছরের পর বছর কঠিন তপস্যায় নিমজ্জিত থাকতে পারেন। তাদের খাবারেরও কোনও মানদন্ড নেই। এককথায় সমস্ত সুখ, সুবিধা, মোহ, মায়া সমস্ত কিছুর উর্ধে বিরাজ করেন এই অঘোরী সন্তরা। আর নিজেদের তপস্যার জন্য শ্মশান, পাহাড়ের গুহা ইত্যাদির মতো দুর্গাম ও ভয়বহুল জায়গা বেছে নেওয়ার তাদের মূল উদ্দেশ্য হল এইসমস্ত জায়গায় তাদের তপস্যা ভঙ্গের কোনও সম্ভাবনা থাকে না। জানা গেছে, আমাদের এই বিশ্বব্রহ্মান্ডে বহু জায়গা আজও রয়েছে যা অঘোরী সাধুদের পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত। সেইসমস্ত জায়গার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য কিছু জায়গার মধ্যে অন্যতম হল বীরভূমের তারাপীঠ। কথিত আছে ভগবান শ্রী বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে মাতা পার্বতীর চক্ষু খন্ডিত হয়ে এই তারাপীঠে প্রথিত হয়েছিল। সেই থেকে তারাপীঠ শক্তিপীঠ নামেও পরিচিতি। বহু প্রাচীন কাল থেকেই এই তারাপীঠ মহাশ্মশানে অঘোরী সন্তগণ তাদের তপস্যা ও সাধনায় ব্রতী হয়েছেন। এরপরে হল হিংলাজ ধাম, যা বর্তমানে পাকিস্থানের বালুচিস্তান রাজ্যে হিঙ্গল নদীর তীরে অবস্থিত। মাতার ৫২ পীঠের মধ্যে এই হিংলাজ পীঠ উল্লেখযোগ্য। বিস্তীর্ন মরু অঞ্চল ও দুর্গ্ম পার্বত্য এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় একে মরুতীর্থ হিংলাজও বলা হয়। বিন্ধ্যাচল পর্বতশ্রেনীও অঘোরী সন্তদের এক অন্যতম পীঠস্থান। কথিত আছে দূর্গা মাতা মহীষাসুরকে বধ করার পর এই বিন্ধ্যাচলেই উপবিষ্ট হয়েছিলেন। জানা যায়, এখনও এই বিন্ধ্য পর্বতশ্রেণির বহু গুহায় অঘোরী তান্ত্রিক সাধুরা নিজেদের সাধনায় মগ্ন রয়েছেন। অঘোরী সন্তদের চতুর্থ পীঠস্থান হল চিত্রকূট, তীর্থস্থল হিসেবে পরিচিত এই চিত্রকূটের স্ফটিকশিলা মহাশ্মশান আজও অঘোর সন্তদের অন্যতম পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত। এরপর হল কালীমঠ, হিমালয়ের কাছে গুপ্ত কাশী থেকে বেশ কিছুটা দূরে এই অঘোর পীঠস্থানে বহু অঘোরী বাস করেন। ঊড়িস্যায় অবস্থিত পুরীর জগন্নাথ মন্দিরও অঘোরীদের অন্যতম পীঠস্থানগুলির মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য। কথিত আছে এখানে মাতা পার্বতীর পায়ের খন্ড প্রথিত হয়েছিল। পুরীর স্বর্গদুয়ার মহাশ্মশান অঘোরী সন্তদের প্রসিদ্ধ সাধনা স্থল। দক্ষিণ ভারতের মাদুরাইয়েও অঘোরীদের কপালেশ্বর মন্দির রয়েছে, যেখানে বসবাসরত অঘোরীরা অঘোরী বিধি অনুযায়ী কপালেশ্বর মায়ের পূজা-অর্চনা করেন। এরপর রয়েছে কলকাতার কালীঘাত। কথিত আছে, এই কালিঘাটে ও দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিনীর মন্দিরে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব মাতা কালীকার উপাসনা করতেন, যা অঘোরীদের অন্যতম পীঠস্থান হিসেবেও পরিচিত। দেশজুড়ে অবস্থিত এইসমস্ত উল্লেখযোগ্য কিছু অঘোরী পীঠস্থানের কোনও একটিতেই (ইচ্ছাকৃতভাবে উল্লিখিত জায়গার নাম দেওয়া হল না) সম্প্রতি বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা বেশ কয়েকজন তান্ত্রিক ও অঘোরী সাধু জড়ো হয়েছিলেন বিশেষ এক সাধনার জন্য। কি সেই বিশেষ সাধনা। কিসের প্রাপ্তির জন্যই বা অমাবস্যার গভীর রাতে জনমানবশূন্য মহাশ্মশানে একান্তে তন্ত্র সাধনায় মগ্ন হয়েছিলেন ওই তান্ত্রিক সাধুরা? জানা গেছে, ভ্রষ্টাচার তথা দূর্নীতি মুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যেই সম্প্রতি অমাবস্যার রাতে কালভৈরবের সাধনায় মগ্ন হয়েছিলেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ওই অঘোরী ও তান্ত্রিকেরা। তাদের বিশ্বাস, তাদের তন্ত্র সাধনার বলে দেশ থেকে অচিরেই মুক্তি পাবে দূর্নীতি, ফিরে আসবে বিদেশে গচ্ছিত কালো টাকা। শুনতে অবাক লাগলেও এই তথ্যই উঠে এসেছে। অঘোরী ও তান্ত্রিকদের বিশ্বাস, কালভৈরবকে সুপ্রসন্ন করে দূর্নীতি মূর্তির বিনাসের মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষকে দূর্নীতি মুক্ত করতেই তাদের অমাবস্যার রাতে বিশেষ তন্ত্র সাধনার আয়োজন করা হয়েছিল। তান্ত্রিকদের কথায়, এইধরণের তন্ত্র সাধনা এই প্রথম নয়, এর আগেও বহুবার তাঁরা এইধরণের তন্ত্র সাধনা করেছেন এবং তার ফলও দেশবাসী পেয়েছে, এর উদাহরণ হিসেবে তাঁরা জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময়ে ডেঙ্গু বা বিভিন্ন রোগ-মহামারীতে বহু মানুষের অসুস্থতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের এই বিশেষ তন্ত্র সাধনার ফলে মানুষ সেই মহামারী থেকে মুক্তি পেয়েছে বলে বিশ্বাস তান্ত্রিক সাধুদের। শুধু তাই নয়, বহুবার জঙ্গি হামলা হওয়ার আগেই তা ঠেকানো সম্ভব হয়েছে তাঁদের এই তন্ত্র সাধনার মাধ্যমেই, দাবি তান্ত্রিকদের। যখনই দেশ তথা ভারতবর্ষের বুকে কোনও না কোনও বিপর্যয় নেমে এসেছে তখনই তাঁরা তন্ত্র সাধনায় নিজেদের নিয়োজিত করেন বলে জানান তাঁরা। এবারও তাদের তন্ত্র সাধনা তথা কালভৈরবকে সুপ্রসন্ন করার জন্য আবাহন অচিরেই দেশকে দূর্নীতি ও কালো টাকা উদ্ধারের পথ দেখাবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। অমাবস্যার রাতে নিকশ কালো গহন অন্ধকারময় শ্মশানে সাধনা মগ্ন তান্ত্রিক ও অঘোরীদের তন্ত্র-সাধনা দূর্নীতিমুক্ত দেশ ও কালো টাকা উদ্ধারের ক্ষেত্রে কতটা সাহায্য করবে তা হয়তো সময়ই বলবে।