স্বাস্থ্যে – অসুখ/২#…. হেলথওয়ার্ল্ড হাসপাতাল কিসসাঃ দাম বাড়ছে ‘মুরগী’র আর সরকার পাচ্ছে ঘণ্টা, তাই জলেই গেল ৮৫ লাখ!

0
25414

মনোজ সিংহ, দুর্গাপুরঃ- করোনা ভাইরাস আতঙ্কে ঝর ঝর করে দাম পড়ছে মুরগীর। তবে, নেতা-আমলাদের দাক্ষিন্যে শহর দুর্গাপুরে এমন ‘মুরগীর’ হদিশ মিলেছে- যে ‘মুরগী’ কে বার বার কাটা হলেও, দাম তার আকাশমুখী আর ডিম তার আরো দামী। ‘আন্ডা বাচ্চা সহ’ সেই মুরগী যত বার হাত বদল হয়, দাম তার বাড়ে চড় চড় করে, তবে বিক্রী বাবদ সরকারের পাওনা গন্ডার ঘরে কিন্তু সেই অষ্টরম্ভা।
জাতীয় সড়কের গা ঘেঁষে স্বদম্ভে মাথা তুলেছে হেলথওয়ার্ল্ড হাসপাতাল। কাতারে কাতারে রোগীর ভিড়ে গিজ গিজ করছে গোটা এলাকা। স্বাস্থ্য পরিষেবায় বেশ নাম ডাক হাঁকিয়েছে পরশমণি মেডিক্যাল সেন্টারের এই সংস্থাটি। মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষায় ‘নিজের জায়গা’ করে নেওয়া একটি চালু হাসপাতালের সাথে করোনা ভাইরাস, মুরগী আর ডিমের কিসের সম্পর্ক?
“মুরগী বা ডিম নয়- বলুন মুরগী এবং ডিম এবং সেই একই মুরগী কে বার বার জবাই করার গভীর সম্পর্ক। যে সম্পর্কের জেরে হাসপাতাল চালু করার আগেই রাজ্য সরকারের কোষাগারে অদৃশ্য ‘লুঠ’ চালিয়েছেন এর পরিচালন পর্ষদ। সমাজের মানি – গুনীরা আইনের ফাঁক ফোকর কে কাজে লাগিয়ে, বলা যায় সরকার কে ঠকিয়েছেন। তার প্রমান ও রয়েছে”, বললেন শহর দুর্গাপুরের লড়াকু আইনজীবিদের একজন প্রিয়বত গোস্বামী। তাঁর দাবি- “হাসপাতালটির মালিকানা যে শুধু রহস্যে ঘেরা তাই-ই নয়, ঠান্ডা ঘরে বসে ওই মালিকের হয়ে ‘দালালি’ করে আসছেন এক শ্রেনীর রাজনৈতিক নেতা থেকে আমলা। তথ্য প্রমান সহ সব পাঠাচ্ছি সরকারের কাছে”।
কেমন দালালি? কিসের রহস্য? একটি হাসপাতাল কে ঘিরে রাজস্ব-জালিয়াতির কথাই বা উঠছে কেন?
গান্ধীমোড়ে যে ঢাউস বিল্ডিংটিতে চলছে হেলথওয়ার্ল্ড হাসপাতাল, সেটি পরশমণি মেডিক্যাল সেন্টার খরিদ করে বেনাচিতির মোটর সাইকেল ব্যবসায়ী, প্রোমোটার “দত্ত বিল্ডারস’র কাছ থেকে। দত্ত কোম্পানী সেটি খরিদ করেছিল অন্য একটি অটোমোবাইল সংস্থার থেকে। সেই খরিদ কালে তখনো কার্যতঃ অসমাপ্ত বিল্ডিং সহ জমিটির সরকারি মূল্যায়ন (সাব রেজিষ্ট্রি অফিসের দেওয়া ভ্যালুয়েশন) হয় ২ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা। সেই মোতাবেক মালিকানা হস্তান্তরের জন্য দত্ত কোম্পানীর পক্ষ থেকে রাজ্য সরকার কে ৯ লক্ষ টাকার স্ট্যাম্প ডিউটি ফি দেওয়া হয়। দত্ত কোম্পানী সূত্রে জানা গেছে, ওই অসমাপ্ত বিল্ডিংটিতে তারাও আসলে একটি হাসপাতালই করতে চাইছিলেন। সেটি সম্ভব না হওয়ায় তারা পরশমণি’র মালিকদের কে বিল্ডিংটি বেচে দিলেন দু’বছর পর। রহস্য, জালিয়াতি আর দালালির অভিযোগের গন্ধ ওঠা শুরু এই দ্বিতীয় হাতবদল কে ঘিরেই।
কেমন?
দু’বপছর পর দুর্গাপুর শহরের অনান্য জমি-বাড়ির মতোই ওই হাসপাতাল বিল্ডিংটিরও দাম বাড়ল। তবে, স্বাভাবিক দাম বাড়া নয়। শরীরে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধির মতোই হুশ করে দশ গুন বেড়ে গেল ২০ কাঠা সহ অসমাপ্ত বিল্ডিংটির দাম। আর রহস্যজনক ভাবে ঝুপ করে কমে গেল রাজ্য সরকারের প্রাপ্য শুল্ক।
দত্ত কোম্পানী যখন ‘বাড়ীটি’ কিনল, সরকারী মূল্য তখন আড়াই কোটি টাকা আর দু’বছরেই তার সরকারি মূল্য হল ২৫ কোটি টাকা। তবে, দত্ত কোম্পানীর খরিদের সময় ৯ লক্ষ টাকার স্ট্যাম্প শুল্ক সরকারের ঘরে এলেও, পরশমণি সংস্থা কেনার সময় রাজ্য সরকারের প্রাপ্য শুল্ক কমে হল ৫ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ, পূর্বতন মূল্যায়ন যখন দশ গুন বেড়ে ২৫ কোটি টাকা হল, তখন সরকারের প্রাপ্য শুল্কও বেড়ে অন্ততঃ ৯০ লক্ষ টাকা হওয়ার কথা – পাটিগনিতের সরল নিয়মে। কিন্তু, সরকার পেল ৫ লক্ষ টাকা, অর্থাৎ ৮৫ লক্ষ টাকার ঘাটতি। তদন্তে যে টুকু জানা গেছে- “সাব রেজিষ্ট্রি অফিস, শুল্ক দপ্তর আর রাজ্য সরকারের নগরোন্নয়ন দপ্তরের দুটি সংস্থার কিছু আমলার ‘লীলা’য় এটি সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি, পরশমণি’র কর্তাদের মাথায় অবিরাম ঝরছে রাজ্যের দুটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের ওপর তলার কিছু নেতার আশীর্বাদ, বলে অভিযোগ। তাদের বিরুদ্ধে এ হেন জালিয়াতির অভিযোগ প্রসঙ্গে হেলথওয়ার্ল্ড হাসপাতালের মুখ্য কায্য নির্বাহী আধিকারিক প্রবীর মুখোপাধ্যায় এবং একজন পরিচালক ডাঃ অরুনাংশু গাঙ্গুঁলী কিছুক্ষন থমকে গিয়ে, দূর সঞ্চার মারফৎ তাদের আইনী কৌশলীর সাথে কথা বললেন। শনিবার সন্ধ্যায়। দশ মিনিট পর জানালেন, “এই অভিযোগটি নিয়ে এখনি কোনো প্রতিক্রিয়া দিতে নিষেধ করছেন আমাদের আইনজীবিরা”। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, পরশমণি’র কর্তারা বেশ গুছিয়ে, কায়দা করে হাসপাতাল বিল্ডিং আর জমি আলাদা দেখিয়ে, ভ্যালুয়েশন বাড়ানো আর স্ট্যাম্প ডিউটি ফাঁকির ফাঁক ফোকর খুঁজে নিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here