মুর্শিদাবাদে শিক্ষক পরিবারের হত্যালীলা নিয়ে দেশব্যাপী রাজনৈতিক চাপানউতোর, মিসিং লিঙ্কের খোঁজে পুলিশের

0
1003

সংবাদদাতা, মুর্শিদাবাদ:-

বিজয়া দশমীর উচ্ছাসের মাঝে নারকীয় ভাবে মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জ শহরে বাড়ীর ভেতর থেকে স্কুল শিক্ষক গৃহ কর্তা বন্ধু প্রকাশ পাল, তার সন্তান সম্ভবা স্ত্রী বিউটি মন্ডল পাল ও তাদের নাবালক ছেলে বন্ধু অঙ্গন পালের খুনের ঘটনায় তোলপাড় দেশের রাজ্য রাজনীতি থেকে সোশ্যাল মিডিয়া। সূত্রের খবর, মৃত ওই স্কুল শিক্ষক রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক কর্মী হওয়ায় তার পরিবারের উপর এই অন্তর্ঘাত। আর সেই কারণেই নাকি খোদ আর এস এস এর মোহন ভাগবত এই ঘটনার নিয়ে আন্দোলে নামার জন্য পশ্চিমবঙ্গের আর এস এস নেতৃত্ব ও বিজেপি নেতা বর্গের সাথে কথা বলতে চলেছেন। আর এই নিয়েই উত্তাল রাজ্য রাজনীতি। এই ব্যাপারে মুর্শিদাবাদ জেলা বিজেপির সভাপতি গৌরী শঙ্কর ঘোষ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তার তীব্র প্রতিক্রিয়ায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়,”পুরোপুরি ভাবে ব্লু-প্রিন্ট বানিয়ে ওই আর এস এস কর্মীর পরিবারকে নিশ্চিন্ন করতে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আজ ৭২ ঘন্টা অতিবাহিত হয়ে গেলেও পুলিশ এই ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। আমরা এবার এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে জেলা জুড়ে বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে চলেছি”। এইদিন কলকাতা থেকে এলাকা পরিদর্শনে আসেন বিজেপির নেতা সমিক ভট্টাচার্য্য।

তিনি সব কিছু খতিয়ে দেখে খুনের বীভৎসতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,”এই নারকীয় খুন দলমত নির্বিশেষে উঠে পুলিশের তদন্ত করে দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার করা উচিত। এখানকার মানুষ ঘটনার পর থেকে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ পুলিশ এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করে উঠতে পারেনি। কেবল আমাদের একজন কর্মীই উনি নন, একজন সমাজের সুশিক্ষক ও তার পরিবার কেও সমূলে যে ভাবে শেষ করে দেওয়া হল তার কোন ভাষাতেই নিন্দা করে শেষ করা যাবেনা”। এই যদিও ঘটনায় জেলার উচ্চ পুলিশ আধিকারিকেরা ও তদন্তকরি দল রাজনীতির যোগ ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েই তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। অবশ্য সাড়া ফেলে দেওয়া এই ঘটনার ২ দিন কেটে গেলেও বৃহস্পতিবার শেষ পাওয়া খবর পর্যন্ত কেউ গ্রেফতার হয়নি বলেই পুলিশ সূত্রে জানা যায়। সেক্ষেত্রে পুরো ঘটনার মোডাস অপারেন্ডি নিয়ে দেখা দিয়েছে ধোঁয়াশাও। জেলা পুলিশ মহলের কর্তারা এই নারকীয় খুনের কিনারায় কোমর বেঁধে নেমেছেন। এই ব্যাপারে মুর্শিদাবাদ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তন্ময় সরকার সাংবাদিক বৈঠক করে ঘটনার একাধিক বিষয়ের উপর আলোকপাত করেন। শুরুতেই তিনি জানান,”এখনই ঘটনার কারণ স্পষ্ট নয়, তবে কতগুলি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যার মধ্যে প্রথম, মৃত ওই স্কুল শিক্ষক শিক্ষকতার ছাড়াও অন্য পার্শ্ববর্তী কাজের সাথেও যুক্ত ছিলেন, সেক্ষত্রে তার আদি বাড়ী সাগড়দিঘি থানা এলাকা থেকে স্থানীয় কয়েক জনের সাথে আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়ে জড়িয়ে পড়ার ফল এই ঘটনা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, যে বা যারা এই বীভৎস ঘটনা ঘটিয়েছে সেক্ষেত্রে খুব চেনা পরিচিতর কেউ যুক্ত থাকার প্রবল সম্ভবনা রয়েছে। শুধু তাই নয়, ঘটনা স্থল ময়না করে মেলা তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিক অনুমান, মৃত কেউ খুনের সময় কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। সম্ভবত তাদের কোন ভাবে খাবারের সঙ্গে মাদক বা নেশার জিনিষ মিশিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। যার ফলে ওই পরিবারের লোকেরা অল্পতেই কাহিল হয়ে গিয়ে থাকতে পারেন”। এখানেই শেষ নয় ওই উচ্চ পুলিশ আধিকারিক আরও জানিয়ে বলেন,”পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মৃতা বিউটি পালের লেখা একটি নোট ও ডায়রী উদ্ধার করেছে। সেখানে তার স্বামীর সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত মিলেছে। যদিও ডায়রী ও ওই নোট দুটি হাতের লেখাই বিউটি দেবীর কিনা তা নিশ্চিত হবার জন্য বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয়েছে”। এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এলাকায় মিশুকে ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত জিয়াগঞ্জ- আজিমগঞ্জ পুরসভার ভাগীরথী লাগোয়া ১৬ নং ওয়ার্ডের কানাইগঞ্জ লেবুবাগানের বাসিন্দা খুন হওয়া গোসাঁই গ্রাম সাহাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওই শিক্ষক বন্ধু প্রকাশ পাল ও তার পরিবার নিয়ে বছর আড়াই আগে থেকে এলাকায় বাড়ী তৈরি করে বসবাস করতে শুরু করেন। বন্ধু প্রকাশ বাবুর আদি বাড়ী জেলার সাগড়দিঘি থানার। প্রাথমিক ভাবে লক্ষ করা যায় মৃতব্যক্তিদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলেও দুষ্কৃতি প্রত্যেকের গলা কেটে খুন করেছে। খুনের নৃশংসতা দেখে স্থানীয়রা অনুমান করছেন চরম আক্রোশ কিংবা কোন বদলা থেকেও এই খুন হয়ে থাকতে পারে। একই কায়দায় খুনের লক্ষ্মণ দেখে বাড়ীর লোকের প্রাথমিক অনুমান এই খুনের সঙ্গে কোনও পেশাদার খুনির যোগ থাকাতে পারে। সেই রহস্য ভেদ করতে পুলিশ ছুটছেন মৃত প্রকাশের আদি বাড়ি সাগরদীঘি থানার সাহাপুর গ্রামে যেখানে ওই মৃত শিক্ষকের মা থাকেন। জানা যায় প্রকৃতপক্ষে মৃতের বাবার দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান ছিলেন প্রকাশ বাবু। সেক্ষেত্রে প্রথম পক্ষের ভাই বোনদের সঙ্গে সম্পত্তির বিবাদ ছিল কি না তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। আবার এল আই সি এজেন্ট হিসেবে প্রকাশ বাবুর কাজ কর্মের খোঁজ খবরও নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। পরিবার সুত্রে জানা গিয়েছে, ২০০৫ সালে গোঁসাইগ্রাম সাহাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি পান প্রকাশ।

পরে ছেলের পড়াশুনার কথা ভেবে তার মা মায়ারানী পালের কেনা জমি জিয়াগঞ্জের লেবুবাগান এলাকায় বছর দুয়েক আগে বাড়ি করে পরিবার নিয়ে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন তিনি। এর মধ্যে কি এমন হল যে ভাল মানুষ হিসেবে পরিচিত এক জন শিক্ষককে সপরিবারে এই ভাবে খুন হয়ে যেতে হবে। এই প্রশ্নই এখন ঘুর পাক খাচ্ছে জিয়াগঞ্জ ও সাগরদীঘি জুড়ে। এই ব্যাপারে মৃতের বাড়িতে ঘটনার পর যিনি প্রথম গিয়েছিলেন সেই দুধ ওয়ালা রাজিব দাশ কে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। তিনি বলেন,“প্রতিদিনের মত ওই দিন দুধ দিতে গিয়ে বাইরে থেকে দরজা ঠেলতেই তা খুলে যায়, দেখি খাটের উপর রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে প্রকাশ বাবু। চিৎকার করতেই কালো গেঞ্জি ও প্যান্ট পরা একটি লোক পাশের ঘর থেকে ছুটে পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যায়।”রাজিবের চিৎকার শুনেই প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। দেখা যায় একই ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে ছেলের মৃতদেহ তবে বিউটি দেবীর মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে পাশের ঘরে খাটের উপর থেকে। খুনের আগে বিউটি দেবী যে রান্না করছিলেন তার প্রমান মিলেছে। মৃত শিক্ষকের মাসতুতো ভাই নবগ্রাম থানার রাইন্ডা এলাকার বন্ধু কৃষ্ণ ঘোষ সম্পূর্ণ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে এই হত্যা লীলা প্রসঙ্গে বলেন,”আমার কেউ কোন ভাবেই এই ঘটনা এখনও বিশ্বাসই করতে পারছিনা। নৃসংশ এই খুনের চরম শাস্তি হওয়া দরকার। সমাজে আইনের শাসন তাহলেই প্রতিষ্ঠিত হবে, নচেৎ নয়”।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here