ভয়ানক অসুখে “এমআইএসসি ” আক্রান্ত শিশুকে নতুন জীবন ফিরিয়ে দিলেন হেলথওয়ার্ল্ড হাসপাতালের চিকিৎসকদের টিম

0
2289

এই বাংলায় ওয়েব ডেস্কঃ- কোভিডে শিশুরা বড়দের তুলনায় কম আক্রান্ত হচ্ছে বলেই এখনো অবধি আমাদের জানা ছিল। কোভিড আক্রান্ত শিশুদের উপসর্গও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাত্রাতিরিক্ত অবস্থায় যাচ্ছে না বলে জানা ছিল । কিন্তু কিছু কিছু বাচ্চা করোনা ইনফেকশন চলাকালীন বা ইনফেকশনের পরবর্তী সময়ে একটি ভয়ানক অসুখে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে, ডাক্তারি পরিভাষায় যে রোগের নাম মাল্টিসিস্টেম ইনফ্লামেটরি সিন্ড্রোম ইন চিলড্রেন বা এমআইএসসি। এই রোগটি শরীরের যে কোনো অঙ্গকেই আক্রমণ করতে পারে কিন্তু মূলত বাচ্চাদের হার্ট এবং হার্টের রক্ত চলাচল করে যে ধমনী দিয়ে অর্থাৎ করোনারি আর্টারি, তাদেরকেই বেশি আক্রমণ করছে।

দুবছর বয়সী অপূর্বী দূর্গাপুরের হেলথওয়ার্ল্ড হাসপাতালে দুসপ্তাহ আগে ভর্তি হয় জ্বর আর দুর্বলতা নিয়ে। হাসপাতালে ভর্তির সময় ডাক্তাররা দেখেন তার জ্ঞান পুরোপুরি নেই, তার শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কম এবং সবথেকে চিন্তার বিষয় তার রক্তচাপ খুবই কম ছিল। সাথে সাথে তাকে পিডিয়াট্রিক আইসিইউতে স্থানান্তরিত করা হয় এবং হাই ফ্লো মেশিনের মাধ্যমে অক্সিজেন শুরু করা হয়। তার হার্টের ইকো করলে দেখা যায় তার ইজেকশন ফ্র্যাকশন অর্থাৎ হার্টের পাম্প করার ক্ষমতা মোটেই ১৫ শতাংশ। সাধারণত সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এটা ষাট শতাংশ থাকে। অর্থাৎ তার হার্ট পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্ত পাম্প করতে পারছিল না। শিশুটির কিডনি দুটোও স্বাভাবিকের থেকে অনেকটাই কম পরিমাণে কাজ করছিল যাকে অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি বলে। তার অন্যান্য রক্তের পরীক্ষায় সব মাত্রাই স্বাভাবিকের থেকে অনেকটা বেশি ছিল যেমন সিআরপি বা ডি-ডাইমার। রক্তচাপ বজায় রাখার জন্যে তাকে চারটে ওষুধ দেওয়া হয় ডাক্তারি পরিভাষায় যাদের আয়নোট্রোপ বলে। শিশুটির করোনা টেস্টও করা হয় যা পজিটিভ আসে। তাকে একটি অত্যন্ত দামী জীবনদায়ী ওষুধ যা এক্ষেত্রে দেওয়া হয়ে থাকে, যার নাম আইভিআইজি, সেটিও দেওয়া হয়। এতকিছুর পরেও তার জ্বর পুরোপুরি না কমার কারণে আরেকটি পরীক্ষা করে দেখা যায় যে তার শরীরে অ্যাসপারজিলাস নামক একটি ছত্রাক থেকে সংক্রমণও রয়েছে এবং তার পরে সেটির জন্যেও চিকিৎসা শুর করা হয়। ধীরে ধীরে তার জ্বর কমে আসে এবং ভর্তির ষোলোদিনের মাথায় শিশুটি বাড়ি যাচ্ছে আজ।

কয়েকবছর আগেও এধরণের রোগের চিকিৎসার জন্যে মফস্বলের মানুষদের কলকাতা বা দক্ষিণে যেতে হতো। এবং বলাই বাহুল্য তাতে অনেক মূল্যবান সময় নষ্টও হতো। এধরণের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সময় ভীষণ মূল্যবান এবং এক ছাদের নীচে বাচ্চার ডাক্তার, ইনটেনসিভিস্ট এবং বাচ্চাদের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ থাকা খুবই প্রয়োজন। এই টিমে ডাঃ সৌম্যদীপ বিশ্বাস, ডাঃ চন্দ্রশেখর দে, ডাঃ কৃষ্ঞেন্দু খাঁ, ডাঃ সঞ্জীব তিওয়ারি এবং বাচ্চাদের হার্ট স্পেশ্যালিস্ট ডাঃ নুরুল ইসলামের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় অপূর্বী নতুন করে জীবন ফিরে পেলো। ডাঃ সৌম্যদীপ বিশ্বাস আমাদের জানান যে ” সাধারণত এত কম ইজেকশন ফ্র্যাকশন নিয়ে, তার সাথে কোরোনা এবং ছত্রাকের সংক্রমণ আর তার উপর কিডনি ফেলিওর নিয়ে এত ছোট বাচ্চার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়, কিন্তু এক্ষেত্রে চিকিৎসা খুব তাড়াতাড়ি শুরু করা হয়েছে উন্নতমানের পিআইসিইউতে এবং টিমের সব ডাক্তাররা তাঁদের দিক থেকে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেননি। বাচ্চার পরিবারের লোকজনও ডাক্তারদের উপর ভরসা রেখেছিলেন বাচ্চা এতটা ক্রিটিকাল থাকা সত্ত্বেও” । চিকিৎসকদের টিমের সবার পক্ষ থেকে ডাঃ সৌম্যদীপ বিশ্বাস বাচ্চার পরিবারের লোকজনদের ধন্যবাদ জানান। পরিশেষে তিনি আবারও বলেন “মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, ভিড় এড়ানোর মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ নিয়মগুলি আবারও মেনে চলার জন্যে সবাইকে অনুরোধ জানান।”

উল্লেখ্য গতবছর করোনা প্রথম ঢেউয়ে দুর্গাপুর ইস্পাত নগরীর একটি সাত বছরের বাচ্চা ও তার পুরো পরিবার করোণা আক্রান্ত হন। তারা সকলেই দুর্গাপুরের একমাত্র কোভিড হাসপাতাল সনোকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন এবং ১৪ দিন পর করোনা মুক্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু তার ঠিক এক মাস পর সাত বছর বয়সী ওই ছোট্ট শিশুর হঠাৎই আবার জ্বর আসে । তার মা-বাবা তৎক্ষনাতই বাচ্চাটিকে নিয়ে দুর্গাপুরের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ আজিজুর রহমানের কাছে যান । ডাঃ আজিজুর রহমান বাচ্চাটিকে ভালো করে পরীক্ষা করার পর তার মা-বাবাকে বাচ্চাটিকে তাড়াতাড়ি হাসপাতলে ভর্তি করার নির্দেশ দেন এবং তিনি প্রথমই শিশুটির “এমআইএসসি ” রোগে আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহ প্রকাশ করেন। শিশুটির মা বাবা তৎক্ষনাতই তাকে কলকাতার বাইপাসের ধারে অ্যাপোলো বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করেন। সেখানে বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ তমাল লাহার নেতৃত্বে তৎক্ষনাতই একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে চিকিৎসা শুরু হয় বাচ্চাটির। তবে সেই সময় বাচ্চাটির শরীরে করোণা সংক্রমণ ছিলনা । তাই তাকে তৎক্ষণাৎ এন.আই.সি.ইউ এ ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করেন ডাক্তারের বিশেষ দলটি । সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল আসার পর জানা যায় যে দুর্গাপুরের ডাঃ আজিজুর রহমানের সঠিক সন্দেহ করেছিলেন। তাই সঠিক সমস্ত রকম চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার ১২ দিনের মাথায় শিশুটি সুস্থ হয়ে আবার বাড়ি ফিরে আসে। তবে শিশুটিকে এখনও ইকো-কার্ডিওগ্রাফি প্রতি দুই মাস অন্তর করতে হচ্ছে , এটি দেখার জন্য যে সে সম্পূর্ণভাবে সুস্থতার পথে এগোচ্ছে কি না ।

করোনার তৃতীয় ঢেউ যেকোনো সময় আছড়ে পড়তে পারে ভারতবর্ষের বুকে । এই তৃতীয় ঢেউয়ে সবথেকে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে শিশু ও কিশোরদের করোনা আক্রান্ত হওয়ার। কারণ ইতিমধ্যেই প্রাপ্ত বয়স্কদের টিকাকরণ চলছে কিন্তু শিশুদের টিকাকরন এখনো শুরু হয়নি। তাই সমস্ত শিশু-কিশোরদের সুরক্ষিত রাখতে হবে করোনার এই তৃতীয় ঢেউ থেকে।

এই বিষয়ে ডাঃ আজিজুর রহমান জানান “এই রোগের সঠিক সময় চিকিৎসা শুরু না হলে প্রাণ সংশয় থাকে রোগীর। যে সমস্ত পরিবারে করোণা আক্রান্ত রোগী বা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন এমন লোক জন রয়েছেন তাদের বাড়ির বাচ্চাদের এই ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে তিনি মনে করেন।” সমস্ত রকম কোভিড বিধি-নিষেধ মেনে বাচ্চাদের সাথে থাকা উচিত বলে তিনি জানিয়েছেন। অল্প বিস্তর শরীর খারাপ হলেই তৎক্ষনাতই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে অনুরোধ করেন ডাঃ আজিজুর রহমান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here