ভূতের রাজার বরপুত্র/১০# দুর্গাপুরে কোটি টাকায় ‘ঝিনুকের পেটে মুক্তো’ কাটা দেখছে এডিডিএ

0
4706

মনোজ সিংহ ও বিমান পন্ডিত, দুর্গাপুর ও কলকাতাঃ-

(ক) নামঃ বেলা মাথুর
বাবার নামঃ প্রভ দাস
গ্রামঃ নয়ডা


আরেকজন-
(খ) নামঃ সুধীর কুমার ঘোষ
নিবাসঃ বেনাচিতি, দুর্গাপুর


অন্য জন-
(গ) নামঃ পার্থ পবি
বাড়ীঃ বিধাননগর, দুর্গাপুর
এখানে দু’জনের বাবার নাম দেওয়া নেই, কারন সেটা অত জরুরি বিষয় নয়। তবে বেলা মাথুরের কিন্তু ‘বাপের নামটাই’ সব। কারন ৩২ বছর আগে, এডিডিএ (আসানসোল-দুর্গাপুর উন্নয়ন সংস্থা’)র কুর্সিতে বসে তিনি একদিন যে ছোট্ট ঝিনুক হেলায় ফেলে গিয়েছিলেন সিটি সেন্টারের আলাউদ্দিন খান বিথিতে, সেই ঝিনুকের পেটে কোটি টাকার মুক্তো এসেছে। নয়ডা’র পশ এলাকার ‘পার্ল গেটওয়ে টাওয়ার’ এ বসে এখন সেই মুক্তো চুপি চুপি কুড়িয়ে নিতে চাইছিলেন বেলা। তার বাবা প্রভ দাস আটের দশকের মাঝামাঝি এডিডিএ’র সি.ই.ও (মুখ্য কারয্যনির্বাহী আধিকারিক) ছিলেন। নিজের নামে জমি নিলে বিতর্কে পড়তে পারেন ভেবে বেলা মাথুরের নামেই লিখিয়ে নিলেন আলাউদ্দিন খান বিথির বিতর্কিত ওই ৪ কাটা জমি। বিবাহিত মেয়ের নামে কেনা ‘ঝিনুক’ পড়ে রইল অনাদরে। টানা ৩২ বছর। তারপর ধীরে ধীরে সেই ঝিনুকের পেটে যখন টলটলে মুক্তো এল, দিল্লি- নয়ডায় বসে সেই ‘ঝিনুক-ঝিনুক’ জমিটি নিয়ে ফের নাড়াচাড়া শুরু করলেন পিতা-পুত্রী। আর, তদন্তে যে টুকু জানা গেছে- ওই নাড়াচাড়া’র দোহারের কাজটি করছিলেন দুর্গাপুরের এক প্রাক্তন কোল মাফিয়া। প্রাক্তন কোল মাফিয়া- প্রাক্তন আই.এ.এসের মধুর যোগে শুরু হল ‘মুক্তো’ র সওদাগরী। আর ওই জমি কেনার জন্য একে একে লাইন দিলেন এক পুলিশ অফিসার, এক তৃনমূল কংগ্রেস নেতা আর এক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মালিক। শিকে ছিঁড়ল কলেজ মালিক পার্থ পবির ভাগ্যে।
“কেউ জমি বেচতে চাইলে, কেউ না কেউ তো কিনতেই পারেন। তাতে দোষের কি? আমাদের প্রশ্নটা একদম সোজা সাপটা – নিয়ম কানুন সব জেনে বুঝেও ওই প্রাক্তন আমলা কি করে জলের দরে নেওয়া ওই জমি বেচে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছিলেন? তার কি সাজা হল?” প্রশ্ন তুললেন স্থানীয় নন কোম্পানী রেসিডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পিযূষ মজুমদার।
তবে, প্রশ্নের শেষ এখানেই নয়। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে- প্রভ দাস, বেলা মাথুর, পার্থ পবি’র সম্পর্ক না হয় বোঝা গেল। তাহলে, সুধীর কুমার ঘোষ কে?


বিতর্কিত ওই জমিটির প্রথম মালিক ইনি (সুধীর কুমার ঘোষ )। দুর্গাপুর নগর নিগমের সম্পত্তি কর আদায়ের খাতায় এখনও জ্বল জ্বল করছে তার নাম। নগর নিগম ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে সম্পত্তি কর সম্পর্কিত যে নোটিশ জারি করেছে, তাতে ওই জমি বাবদ বেনাচিতির ব্যবসায়ী সুধীর কে ২০০০-২০০১ সাল থেকে ২০১৮-২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ২২৫০ টাকার বকেয়া সম্পত্তি কর জমা করতে বলা হয়েছে। আবার ওই নোটিশে (নং- ২০১৯ – ২০২০/ ০০৯৪/ ১০৭৪৯৩১) ই তাকে ২০২০ র ৩১, মার্চের মধ্যে নতুন কর বাবদ আলাদা করে ৩৪ টাকা ২০ পয়সা জমা করতে বলা হয়েছে।
যে জমি নাকি বেলা মাথুরের, যে জমি নাকি পার্থ পবি কিনতে চান- সে জমির জন্য সম্পত্তি কর সুধীর ঘোষ কেন জমা করবেন? প্রশ্ন শুধু এটাই নয়। বাস্তু ঘুঘু’র আড্ডা ওই এ.ডি.ডি.এ তে সক্রিয় জালিয়াতি চক্র একই জমির বাস্তু ঠিকানা বিভিন্ন নথিপত্রে বদলে ফেলেছে, বারে বারে। যেমন- পার্থ পবি কে পাঠানো মালিকানা বদলের ‘ডিমান্ড নোট’ এ জমিটির হস্তান্তর ‘ফি’ বাবদ ১৩ লক্ষ ১১ হাজার টাকা চাওয়ার সময় বিতর্কিত জমিটির ঠিকানা লেখা হয়েছে- বি.সি.- ১/১১, আলাউদ্দিন খান বিথি। আবার ওই ‘নোট’ এই হস্তান্তর প্রস্তাব কলামে ঠিকানা লেখা হয়েছে- এল.ও.পি- ১/১, এ.কে.বিথি। আরো চোখ কপালে ওঠার যোগাড় যখন ওই জমির’ই সম্পত্তি কর চেয়ে নগর নিগমের পাঠানো চিঠিতে ঠিকানা লেখা হয়েছে- আর.ডি.- ১, এ.কে. বিথি।
কেন এমন? একই জমির বার বার মালিকানা বদলের সাথে তার ঠিকানা বদল কেন?
গোটা ঘটনায় বিভ্রান্ত এডিডিএ’র আধিকারিকদের একাংশও। এডিডিএ’র বর্তমান মুখ্য কায্য নির্বাহী আধিকারিক অরুন প্রসাদ বললেন, “ওই জমিটির ব্যাপারে আমি নতুন করে খোঁজ নিচ্ছি। বিষয়টা ভাল করে জানতে হবে”।
এডিডিএ’র নিয়ম মোতাবেক- বরাদ্দ করা খালি জমি হস্তান্তর করা যায় না। আবার, বরাদ্দ করা জমিতে দু’বছরের ভেতর বাড়ি নির্মান করে ফেলতে হবে।
বিতর্কিত জমিটি খোলা আকাশের নিচে হা-পিত্যেশ করে বসেই আছে টানা ৩২ বছর! ও দিকে, তার ‘প্রভূ’ বদল হয়ে গেছে চুপি সারে তিন-তিন বার!!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here