কেয়া পাতার নৌকা, ইষ্টিকুটুম, খেলাঘরের জনপ্রিয় অভিনেতা সুদীপ সেনগুপ্তের সাক্ষাৎকার

0
1002

সাক্ষাৎকার নিলেন সঙ্গীতা চৌধুরী

টেলিভিশন ইন্ড্রাস্টির পরিচিত মুখ সুদীপ সেনগুপ্ত। ‘নেতাজি’, ‘বিকেলে ভোরের ফুল’,‘এসো মা লক্ষ্মী’, ‘গুড়িয়া যেখানে গুড্ডু সেখানে’ ইত্যাদি ধারাবাহিকে অভিনয় করে টেলি অনুরাগীদের মন জিতে নিয়েছেন তিনি। বর্তমানে স্টার জলসার খেলাঘর ধারাবাহিকের ‘সত্য’ চরিত্রটি করছেন অভিনেতা। পর্দার এই ‘সত্য’ বাস্তবে কেমন? কীভাবেই বা অভিনয়ের জগতে এলেন তিনি?

১) জীবনসাথী আর খেলাঘরে আপনাকে ইতিবাচক চরিত্রেই দেখতে পাই, আপনি কি ইতিবাচক চরিত্রেই বেশী স্বছন্দ্যবোধ করেন ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- দেখুন আমি একজন অভিনেতা হিসেবে সবরকম চরিত্রেই অভিনয় করতে চাই, সেটা নেতিবাচক হতে পারে আবার ইতিবাচক ও হতে পারে। ইষ্টিকুটুম ধারাবাহিকে প্রথম থেকে আমার চরিত্রটা পজেটিভ থাকলেও শেষের দিকের একবছর কিন্তু আমার চরিত্রটা নেগেটিভ ছিল। আমি সেই নেগেটিভ অংশটাও খুব মজা করে করি আর সেখানে পজিটিভের পাশাপাশি নেগেটিভ চরিত্রটাও ভীষণভাবে দর্শক পছন্দ করেছিলেন। তবে সবাই বলেন আমার লুকটা নাকি ভালো মানুষের মতো (হাসতে হাসতে) সেই কারণে ভালো মানুষের চরিত্রে আমাকে বেশি ভাবা হয়।

২) কখনো কমেডি চরিত্র করেছেন ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- আজ অবধি কখনো কমেডি করিনি।তবে অভিনেতা কে সব সময় ক্রিকেটারের মতো রেডি থাকতে হয় কখন কোন বল আসবে বলা তো যায় না, তাই আমারও যদি কখনো কমেডি চরিত্রের কোনো কাজ আসে তো করব। খেলাঘরে মাঝেমধ্যে কমেডি তো হয়, সেগুলো এনজয় করি।তবে কী হয় খেলাঘরে সত্যর চরিত্রটা যেরকম সেখানে আমি বেশি কমেডি করতে পারিনা।

৩) আপনার পরিবারের কি কেউ অভিনয়ের সাথে কেউ যুক্ত ছিলেন ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- আমি ছোট থেকে বাবাকে দেখেছিলাম থিয়েটার করতে যাত্রা করতে, আমার মা একজন সংগীত শিল্পী,যদিও এখন মায়ের সেইভাবে চর্চা করা হয় না তাই ছোট থেকে আমি এই পরিবেশের মধ্যেই বড় হয়েছি। অ আ শেখার বয়সে বাবার মুখে কবিতা শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। আমার মনে হয় অভিনয়টা বাবা-মায়ের সূত্রেই পেয়েছি। ক্লাস ওয়ানে প্রথম স্কুলে নাটক করেছিলাম। এইভাবে করতে করতে অভিনয়টা একটা ভালোবাসার জায়গা হয়ে গিয়েছে। বড় হয়ে থিয়েটারে জয়েন করি,দমদমে আমাদের নিজের একটা থিয়েটার দল ছিলো, কৌশিক সেনের দল স্বপ্নসন্ধানীতে অল্প কিছু সময় ছিলাম। তারপর শাঁওলী মিত্র ও অর্পিতা ঘোষের থিয়েটার দল পঞ্চম বৈদিকে ফাইনালি জয়েন করি।

৪) আপনার অভিনয় জগতের গুরু কে ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- আমার প্রথম শিক্ষা গুরু আমার বাবা। তারপর শাঁওলী দি ও অর্পিতাদির নাম করতে হয়, ওনারাই শিখিয়েছেন কীভাবে মঞ্চে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে ভয়েস থ্রো করতে হয়। অর্পিতা দি আমার ফ্রেন্ড, ফিলোজফার গাইড বলতে পারেন।

৫) অভিনয় করাটা তাহলে ভালোলাগা থেকেই ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- হ্যাঁ। পুরোপুরি ভালোলাগা থেকেই এসেছি। শোয়ের দিনগুলো আমার কাছে সবসময় থ্রিলিং লাগে, শ্যুটিং এর সময় মেকাপ রুমে যখন বসি তখন সারা গায়ে কাঁটা দেয়, মনে হয় নতুন কিছু করবো আজ।

৬) অভিনয়ের কথা বাবা মাকে বললে তারা মেনে নিয়েছিলেন ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- অভিনয় করবো বলে সেভাবে কোনদিন বাবা-মাকে বলিনি, ওনারা নিজেরাই আসলে বুঝতে পেরেছিলেন।আমি স্কুল থেকে ইউনিভার্সিটি অবধি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি বরাবর। সেই করতে করতে বাবা মা বুঝতেই পেরেছিলেন যে অভিনয়ের প্রতি আমার একটা ভাললাগা আছে তাই ওনারা কোনদিনই আমাকে আটকাননি।

৭) আপনি তো রবীন্দ্রভারতী থেকে অভিনয় নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, ভবিষ্যতে কী ডাইরেকশন বা কিছু করার ইচ্ছা আছে ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- এখন আমি অভিনয়টাই‌ পুরোপুরি করতে চাই। আর আমি মনে করি ডাইরেকশনের কাজ করতে গেলে তার জন্য আরো পড়াশোনা দরকার। ভবিষ্যতে যদি কখনো ডাইরেকশন করার ইচ্ছা হয়, তার জন্য আর‌ও পড়াশোনা করে তারপর সেই কাজে যেতে চাই। আমি হুজুগে মেতে কোনো কিছু করতে পছন্দ করিনা।

৮) আচ্ছা বাংলা থিয়েটারের জগত কি পুরোপুরি শেষ হয়ে গিয়েছে বলে মনে করেন ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- দেখুন থিয়েটারের বাইরের মানুষ এইসব কথা বলতেই পারেন তবে আমি মনে করি এখন অনেক ভালো ভালো কাজ হচ্ছে। হ্যাঁ গোল্ডেন পিরিয়ডটা হয়ত নেই,যেটা একসময় ছিলো,সব যে ভালো হচ্ছে তাও নয়। এখন শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্তের মতো তো সবকিছু হবে না, তবে ভালো কাজ প্রচুর হচ্ছে। আমি পঞ্চম বৈদিকের‌ একটা নাটক বলতে পারি, জীবনানন্দ দাশের‘কারুবাসনা’, অর্পিতাদির ডাইরেকশনে, সেখানে অনির্বাণ ভট্টাচার্য, সুজন মুখোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী ও বাবু দত্ত রায় আছেন, যথেষ্ট ভালো একটা নাটক। এছাড়া এখন আমার পূর্বসূরী উত্তরসূরি সবাইকেই তো দেখতে পাই থিয়েটারে, না শেষ হয়ে যায়নি এখন‌ও থিয়েটারটা।

৯) টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথম কাজ পেতে স্ট্রাগল করতে হয়েছিল ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- বাবা মায়ের আশীর্বাদে বলুন অথবা গুরুর আশীর্বাদে আমি প্রথম অডিশনে দিয়েই সিলেক্ট হয়ে ছিলাম তাই জীবনের প্রথম কাজটা পেতে আমাকে সেই অর্থে স্ট্রাগল করতে হয় নি। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম যে শিক্ষকতাও করবো এবং পাশাপাশি থিয়েটারটা চালিয়ে নিয়ে যাবো।সেইসময় অর্পিতা দি আমায় একদিন জানান যে, লীনা গাঙ্গুলী কেয়াপাতার নৌকো ধারাবাহিকের জন্য নতুন ছেলেমেয়ে নিচ্ছেন। অর্পিতা দি আমাকে অডিশনে যেতে বলেন।সেখানে অডিশনে গিয়েছিলাম তারপর তো কাবুল শেখের ভাগ্নে লুৎফার চরিত্রটার জন্য সিলেক্ট হ‌ই।

১০) প্রথম অডিশনের অভিজ্ঞতা একটু শেয়ার করুন ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- লীনা দি অডিশনে আমায় জিজ্ঞেস করেছিলেন যে,আমি বাঙাল ভাষায় কথা বলতে পারি কিনা! আমি লীনাদিকে বলেছিলাম,আমরা বাঙাল তবে বাড়িতে বাঙাল ভাষায় কথা বলি না। এরপর তিনি আমাকে কিছুক্ষণ বাঙাল ভাষায় কথা বলতে বলেন। আমি ওনার সঙ্গে কিছুক্ষণ বাঙাল ভাষায় কথা বলি তারপর উনি বলেন যে, তোমাকে আমরা ফোন করে‌ ডেকে নেব। আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে কাজটা আমার হবে না, এত লোক গিয়েছিল (হাসতে হাসতে), কিন্তু ফোনটা এসেছিল। তারপর তো লীনা দির পরপর কয়েকটি ধারাবাহিক ইষ্টি কুটুম, হিয়ার মাঝে, চোখের তারা তুই তে কাজ করেছিলাম, তারপর আস্তে আস্তে অনেক কাজ করেছি।

১১) খেলাঘরের গগনদার সাথে কেমন সম্পর্ক ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- ২০১৬ তে ‘এসো মা লক্ষ্মী’ থেকেই শঙ্করদার পরিচয়। শঙ্করদার সাথে ভীষণ অন্যরকম একটা সম্পর্ক। একে অন্যের লেগ পুল করি।

১২) খেলাঘরে সবথেকে ভালো বন্ধুত্ব কার সাথে ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- দেখুন ইন্ড্রাস্ট্রিতে সকলের সাথেই খুব ভালো সম্পর্ক আমার, এখন কমবেশি তো থাকেই। তবে আমার সাথে শান্টুর মানে আরেফিনের সম্পর্কটা খুব‌ই ভালো।

১৩) অনস্ক্রিণে শান্টুর খুব ভালো বন্ধু সত্য,অফস্ক্রিণ আরেফিনের সাথে সুদীপের সম্পর্ক কেমন ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- ভীষণ‌ই ভালো সম্পর্ক‌। আমরা একে অপরকে খুব বিশ্বাস করি। আমার ইন্ড্রাস্ট্রিতে হাতেগোনা যে কয়েকজন বন্ধু আছে তার মধ্যে আরেফিন অন্যতম।পর্দায় যেমন সত্য আর শান্টু, তেমনি সুদীপ আর আরেফিন বলতে পারেন। দুজনে খুব বন্ধুর মতো মজা করেই কাজ করি।

১৪) খেলাঘর ধারাবাহিকের এত জনপ্রিয়তা এই নিয়ে কী বলবেন ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- খেলাঘরে দেখুন একজন শিক্ষিত ছেলে, পরিস্থিতির চাপে পড়ে গুন্ডা,এটা ভীষণ‌ই ইউনিক অবশ্য স্নেহাশীষদার প্রতিটা কনসেপ্টই ইউনিক। আমার জানা মতে স্নেহাশীষদাই প্রথম যিনি প্রথম কোনো পুরুষ চরিত্রকে কেন্দ্র করে কাজ করেছিলেন খোকাবাবু, গঙ্গারাম, ভজগোবিন্দ, বাক্সবদল, খেলাঘর‌ও তাই‌। বিদেশ থেকে কিছু ভক্ত ও খেলাঘর দেখে জানেন। তারা টিভি থেকে স্ক্রিনশট তুলে পোস্ট করেছিলো এগুলো সত্যি খুব বড় প্রাপ্তি।

১৫) কোন চরিত্র করতে সবথেকে বেশি স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- যে চরিত্র যখন পেয়েছি, সবগুলোই এনজয় করেছি, ইষ্টিকুটুমের প্রকাশ বলুন বা অনান্য কাজ বা এখন খেলাঘরের সত্য সব‌ই এনজয় করেছি।

১৬)‌ স্নেহাশীষদার হাউজে প্রথম কাজ কী ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- বিকেলে ভোরের ফুল, ওখানে প্রদীপ্তের চরিত্রটা করেছিলাম।

১৭) এখনো অবধি কী কী কাজ করেছেন ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- কেয়া পাতার নৌকো করেছিলাম প্রথম।তারপর ইষ্টি কুটুম, হিয়ার মাঝে, চোখের তারা তুই, সাধক বামাক্ষ্যাপা, প্রতিনিয়ত, ঝিল ডাঙার কন্যে ,গুড়িয়া যেখানে গুড্ডু সেখানে, প্রথম প্রতিশ্রুতি, বিকেলে ভোরের ফুল, গোয়েন্দাগিন্নী, সীমারেখা, জয় বাবা লোকনাথ, জয় কালী কলকাত্তাওয়ালী। করুণাময়ী রাণী রাসমণিতে তো দুবার দুটো চরিত্র করেছিলাম। এসো মা লক্ষ্মীতে চন্দ্রদেবের চরিত্র করেছিলাম। ওম নমঃ শিবায়তেও পৌরাণিক চরিত্র করেছিলাম এছাড়া নেতাজিতে শ্রীশ চন্দ্র বসু বলে একটা ঐতিহাসিক চরিত্র করেছিলাম।

১৮) দিনের শেষে এই অভিনয়ের কাজটা তো একটা লড়াই…কে পাশে আছেন এই লড়াইয়ে ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- হ্যাঁ, আমাদের প্রফেশনটা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই। তাই যখন কাজ থাকবে তখন মন প্রাণ দিয়ে কাজ করা উচিত বলেই আমার মনে হয়। প্রথম থেকেই আমার মা বাবার একটা বিরাট সাপোর্ট ছিলো আর আমার স্ত্রী মিতাও প্রচন্ড সাপোর্টিভ।আমি ওকে নাচের ক্ষেত্রে সাপোর্ট করি ও আমার অভিনয়ের ক্ষেত্রে।

১৯) কখনো অভিনয় ছাড়ার কথা ভেবেছিলেন ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- দেখুন অনেক সময়ই হয় যে আমাদের কাজ থাকে না কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনো ভাবি নি যে, অভিনয় ছাড়া অন্য কোনো প্রফেশনে যাবো।

২০) আপনার চোখে স্নেহাশীষ চক্রবর্তী কেমন মানুষ ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- প্রথম যখন স্নেহাশীষদার সাথে দেখা করতে যায় তখন আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এতগুলো হিট সিরিয়ালের জনক স্নেহাশীষ দা, অথচ এত বিনয়ী,না দেখলে ভাবা যায়না। আমার প্রথম দেখেই ওনাকে ভালো লেগে গিয়েছিল। অত্যন্ত ভালো এবং ভীষণই প্রতিভাবান একজন মানুষ,যার প্রতিভার কথা হয়ত বলে শেষ করা যাবেনা,আপনি দেখলে বুঝতে পারবেন। সবকিছুর প্রথমে ও শেষে বলবো স্নেহাশীষ দা আমার কাছে ঈশ্বর।

২১) দর্শকদের কিছু বলতে চান ?

সুদীপ সেনগুপ্তঃ- আমি যে কাজ গুলো করছি সেগুলো দেখুন। আমার ভালো চরিত্রটাও যেমন দেখবেন তেমনি খারাপ চরিত্র করলে সেটাও দেখবেন এবং এখন আপনারা অবশ্যই প্রতিদিন খেলাঘর দেখবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here