সুউচ্চ হিমালয়ে জীবন বিপন্ন করে বৃদ্ধের জীবন বাঁচাল আসানসোলের তিন যুবক

0
99

সংবাদদাতা, আসানসোলঃ- আসানসোলের তিন তরুণ তুর্কি দুর্গম হিমালয়ে প্রায় অসাধ্য সাধন করে প্রাণ ফেরালেন বৃদ্ধের। তরুণ এই তিন তুর্কিরা হলেন চিন্ময় মিশ্র,কৌশিক মণ্ডল ও বিপ্লব মণ্ডল। আসানসোলের রূপনারায়নপুরের বাসিন্দা এই তিন যুবককে এক করেছে তাদের নেশা। সাদা হিমেল সুউচ্চ হিমালয়কে জয় করার নেশা। আর এই নেশার কারণেই প্রতি বছরই হিমালয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে এই যুবকদল।

এবারও হিমালয়ের প্রায় ২০ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত কালিন্দী পাস অভিযানে বেরিয়েছিলেন তিনজন। ঝুঁকিপূর্ণ এই যাত্রায় সহযোগিতার জন্য ওঁরা সাহায্য় নিয়েছিলেন একটি এজেন্সির। আর ওই এজেন্সির মাধ্যমেই আগত পবর্তারোহীদের মধ্যে চিন্ময়দের সঙ্গে আলাপ হয় দমদমের ৭২ বছর বয়সী অমল কুমার দাসের। পরিবার এজেন্সির নিষেধ উপেক্ষা করে যিনি তখন চলেছেন দুর্গম কালিন্দী পাস জয় করতে। তবে অমলবাবুর পর্বতারোহনের কোনও প্রশিক্ষণ নেই জেনে দুর্গম এই এভিযানে যেতে বারণ করেন চিন্ময়রা। যদিও সেই বারণে সায় দেননি কালিন্দী পাস জয়ের স্বপ্নে বিভোর ৭২-এর বৃদ্ধ।

২ জুন বৃহস্পতিবার, এজেন্সির পরিচালনায় সকলে রওনা দেন। উত্তরকাশী থেকে গঙ্গোত্রী, গোমুখ হয়ে গঙ্গোত্রী হিমবাহ ধরে ওঁরা পৌঁছে যান নন্দনবন। সেখান থেকে খাড়াপাত্থর হয়ে শ্বেতা হিমবাহ। তার পর কালিন্দী পাস। গোমুখের পর থেকে প্রায় পুরো পথই পেরোতে হয় হিমবাহ, বিশাল পাথরের স্তূপের মধ্যে দিয়ে। যার চার দিকে উঁকি দেয় শিবলিং, ভাগীরথী, মানা, নীলকণ্ঠ, অ্যাভেলাঞ্চ, কামেট, চন্দ্র পর্বতের মতো শৃঙ্গ। অতুলনীয় নিসর্গ ওই পথে বিপদ হাতছানি দেয় পদে পদে । হিমবাহের মধ্যে লুকিয়ে থাকে বড় বড় বরফের ফাটল যার পোষাকি নাম ক্রিভাস। সামান্য অসতর্ক হলেই বিপদ। আর যাওয়ার পথে ওই বিপদের মধ্যেই পড়ে যান বৃদ্ধ অমল। বরফের ফাটলের মধ্যে পড়ে যান তিনি। আর ঠিক ওই সময় থেকেই বাঁচার আর্তি জানানো বৃদ্ধ অমলের পাশে দাঁড়ায় রূপনারায়নপুরের তিন যুবক। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বহু কষ্টে বৃদ্ধ অমলকে উদ্ধার করেন ওরা। তখন অনেকটাই কাবু হয়ে পড়েছেন অমল। ওই অবস্থায় তাকে আস্তে আস্তে হাঁটিয়ে উপরে উঠানো হয়। ৮ জুন কালিন্দী পাস পৌঁছন সকলে। কিন্তু কালিন্দী পাস জয় করে নিচে ফেরার পথে ফের ঘটে যায় বিপত্তি। তখন শুরু হয়েছে তুষারঝড়। সামনে কিছু দেখা যাচ্ছে না। এই দুর্যোগের মধ্যেই ৩০০ ফুট লম্বা দড়ি খুলে গেলে দলের সবাই ছিটকে পড়েন। সকলেরই আঘাত লাগে। আর ওই সময় বৃদ্ধের জুতো ছিড়ে যায়। তখন বিপ্লব নিজের একটি জুতো দিয়ে বৃদ্ধকে সাহায্য় করেন। কিন্তু এরপরে আরও শরীর খারাপ হতে শুরু করে অমল দাসের। অন্যদিকে সেই সময় এজেন্সির যে তিন জন সঙ্গে গিয়েছিল তারা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাদের উদ্ধারকারী দল এসে আগেই উদ্ধার করে নিয়ে যায়। ফলে অমলবাবুর পাঁশে দাঁড়ানোর মতো সেই সময় চিন্ময় বিপ্লবরা ছাড়া কেউ নেই। তখন নিজেরদের জীবন বিপন্ন করে অমলবাবুকে বাঁচিয়ে নিচে নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তিন যুবক। অমলবাবুকে প্লাস্টিকের মুড়ে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকিয়ে দড়ি বেঁধে স্লেজগাড়ির মতো টেনে দুর্গম পথ দিয়ে নিচে নামাতে থাকে চিন্ময়, কৌশিক, বিপ্লবরা। কিন্তু ২০,০০০ ফুট উচ্চতা থেকে অসুস্থ এক বৃদ্ধকে টেনে নামিয়ে আনা কি সহজ কথা। প্রায় তিন ঘণ্টা ওইভাবে পথ অতিক্রম করে চিম্নয়রা বুঝতে পারেন আর টেনে নামানো সম্ভব নয়। এরপরই দলের অন্যদের ফেলে কয়েক ঘণ্টা হেঁটে ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশের ক্যাম্পে পৌঁছন চিন্ময়। সৌভাগ্যবশত সেখানে খোঁজ মেলে কর্মরত এক বাঙালি যুবকের। আইটিবিপি ক্যাম্প থেকে একটি উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয় ঘটনাস্থলে। বৃদ্ধকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় মানার কাছে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখানে ধীরে ধীরে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর তাঁকে সঙ্গে নিয়ে রুদ্রপ্রয়াগের উদ্দেশে রওনা দেন চিন্ময় ও তাঁর দুই সঙ্গী। গত বুধবার হরিদ্বার থেকে তাঁকে দুন এক্সপ্রেসে তুলে দেন চিণ্ময়রা। খবর দেন বাড়িতে। নির্বিঘ্নে বাড়ি পৌঁছে যান অমলবাবু। অন্যদিকে চিণ্ময়রা গত বৃহস্পতিবার হরিদ্বার থেকে আসানসোল ফেরার ট্রেন ধরে আসানসোলে পৌঁছয়।

রোমহর্ষক এই অভিজ্ঞতার কথা জানাতে জানাতে তরুণ তিন তুর্কি বলে ওঠে একজন মানুষকে বাঁচিয়ে ফিরিয়ে আনার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সেই আনন্দ হয়তো অভিযান জয়ের আনন্দকেও ম্লান করে দেয়। অন্যদিকে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসা অমল কুমার দাসের কথায় “ওরা না-থাকলে কালিন্দী পাস জয় করা তো দূরের কথা, আমি বেঁচেই থাকতাম না। যত দিন বাঁচব, ওই তিনটে ছেলের কথা মনে রাখব।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here