লোহা কারবারি যোগঃ বদলি হয়েও কোকওভেন থানাতেই আপাততঃ রইল সেই ‘ভীম-পুলিশ’

0
1224

অমল মাজি, দুর্গাপুরঃ- লোহা চোরেদের লুঠের কারবারে নাম জড়িয়ে পড়ায় ‘ভীম – পুলিশ’ কে নিয়ে চাঞ্চল্য ছড়াতেই তাকে বদলি করে দুর্গাপুর পুলিশ লাইনে বসিয়ে দেওয়া হল, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই নির্দেশে আচমকাই স্থগিতাদেশ জারি করল পুলিশ। অর্থাৎ ‘ভীম – পুলিশ’ সাময়িক ভাবে রয়ে গেল সেই কোক – ওভেন থানাতেই। তবে, ভীমের হাতের গদাটি অক্ষত রইল কিনা ঠাহর করা যায়নি শুক্রবার বেলা পর্যন্ত।
আসানসোল – দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের এক বরিষ্ঠ আধিকারিক বলেন, “ভীমের বিষয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্ত হবে যথা নিয়মেই। তাকে আরো কয়েকজনের সাথে বৃহস্পতিবারই বদলি করা হয়েছিল। তবে, বিশেষ একটি কারনে ওই বদলি সাময়িক ভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে দুর্নীতি করলে ছাড় পাবেনা কেউই”।
দুর্গাপুর শহরের রাতুড়িয়া – অঙ্গঁদপুর শিল্পতালুক সংলগ্ন হুচুকডাঙ্গাঁ এলাকা বে আইনী লোহা পাচারের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে। শিল্প – তালুকের বেশ কয়েকটি স্পঞ্জ আয়রন কারখানা গত তিন-চার বছরে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে, দেশীয় বাজারে চাহিদায় মন্দার জেরে। এদের মধ্যে চারটি কারখানা ইতিমধ্যেই চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে ভাড়া করা সিকিউরিটি গার্ড ছাড়া কর্তৃপক্ষের কেউ-ই নেই। সেই সুযোগে, গত ছ’মাস ধরে লোহা মাফিয়াদের দাপট শুরু হয়েছে। স্থানীয় লোকেদের কাজে লাগিয়ে, তারা একের পর এক যন্ত্র, কলকব্জা গ্যাস-কাটার দিয়ে কেটে নিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় লোকেরা অল্প টাকার লোভে চুরির ফাঁদে পা গলালেও, আসল মাখন খাচ্ছে এলাকায় ত্রাস চালানো লোহা মাফিয়াদের সিন্ডিকেট আর তাদের মাথায় রয়েছে কোক ওভেন থানা আর দুর্গাপুর থানার ডি.টি.পি.এস. পুলিশ ফাঁড়ির ‘অভয়’ যোগানো আশির্বাদের হাত বলে অভিযোগ। ফলে, গত পাঁচ মাসে বন্ধ কলকারখানা গুলি থেকে কম করে কুড়ি কোটি টাকার লোহা লোপাট হয়েছে। আর এই বে আইনী কারবারের কেন্দ্রস্থলটি ই হল হুচুকডাঙ্গাঁ। দামোদরের পাড়ের যে হুচুকডাঙ্গাঁ এখন একটি বিতর্কিত ট্যুরিস্ট স্পট বলে পরিচিত।
ওই হুচুকডাঙ্গাঁর পাশেই রয়েছে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই জমা করার ‘অ্যাশপন্ড’ বা ছাই পুকুর। ওই ছাই পুকুর টিই হল অবাধ লোহা পাচারের স্বর্গরাজ্য। জায়গাটির ভৌগলিক অবস্থান এমন যে সেটি খানিকটা ডি.টি.পি.এস. ফাঁড়ি আর খানিকটা বাঁকুড়ার মেজিয়া থানার নিয়ন্ত্রনাধীন। অথচ হুচুকডাঙ্গাঁ যাকে বলে কোকওভেন থানার কোলেই অবস্থিত। এই সুযোগ কে কাজে লাগিয়ে রাজা গুন, গোবর্ধন রেড্ডি, উমেশ যাদব আর দিলীপ কীর্তনিয়াদের মতো স্থানীয় লোহা কারবারিরা গত কয়েকমাস ধরে ঢালাও লুঠের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে বলে এলাকার বহু মানুষ অভিযোগ করেছেন। তাদের আরো অভিযোগ, লোহা চোরদের প্রত্যক্ষ মদত দিচ্ছেন কোকওভেন থানার এক এ.এস.আই. ভীম শংকর তিওয়ারী। বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন হুচুকডাঙ্গাঁর তৃনমূল কংগ্রেস নেতা বুকুন নন্দী ও। তিনি-ই আবার সেখানকার বিতর্কিত ট্যুরিস্ট বাঙলোটির প্রধান কারিগর। তার সাফাই, “লোহা চোরেরা ছাই পুকুরে কারবার চালায়। ওটা আমার ওয়ার্ডের বাইরে”।
গোটা বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবারই “এই বাংলায় ডট কম” একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করায় চাঞ্চল্য ছড়ায় শহরের রাজনৈতিক ও পুলিশ মহলে ও।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার (হেড কোয়ার্টার) ১০ জন এ.এস.আই. ও দু জন কনস্টেবলের বদলির একটি নির্দেশ জারি করেন। সেখানেই ৮ নম্বরে রয়েছে ভীম শংকর তিওয়ারীর নাম (এ.এস.আই নম্বর ৮৪)।
তবে, বদলি হয়েও আপাততঃ কোকওভেন থানাতেই “কাজ কর্ম” চালাবে ‘ভীম পুলিশ’।
ভীম কে নিয়ে অবশ্য অস্বস্থির শেষ নেই ইদানিং দুর্গাপুরের পুলিশ মহলে। গত ১ জানুয়ারি, ২০২০-র পয়লা দিন সিটি সেন্টারের একটি প্রমোদ পার্কে আটজন মদ্যপ যুবক ইভটিজিং করছিল। পাশেই সিটি সেন্টার পুলিশ ফাঁড়ি। খবর পেয়ে দ্রুত সেখানের পৌঁছায় পুলিশ। তারপরই মদ্যপ ছেলেরা সরাসরি আক্রমন করে পুলিশকেই। প্রশ্ন, তাদের বুকে এত পাটা এল কোথা থেকে? একেই বলে ‘বাঘের ঘরে ঘোঘের বাসা’। এ সবই নাকি ‘ভীম পুলিশে’র মহিমা। মদ্যপ ওই যুবকদের মধ্যে নাকি ছিল ভীম পুলিশের পুত্র। ভীম-পুলিশের ব্যাটা, তাই তার পুলিশ কে ‘গরম’ দেখানোর এত হিম্মত। তবে ‘পারিবারিক’ লজ্জা ঢাকতে ভীম-পুলিশের ব্যাটাকে সামনে না আনতে চাইলেও, শেষ পর্যন্ত চার যুবক কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাকিরা সব খালাস- ‘জয় ভীম’!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here