ড্রেজিংয়ের নামে ময়ুরাক্ষী নদীতে সিন্ডিকেট রাজের বালি লুঠের রমরমা অনুব্রতর বীরভূমে

0
1423

সংবাদদাতা, সিউড়িঃ – গোটা রাজ্য জুড়ে জাতীয় পরিবেশ আদালত ও গ্রীন ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুসারে নদীগর্ভ থেকে এখন বন্ধ রয়েছে বালি উত্তোলন। দক্ষিণবঙ্গের সমস্ত জেলাতেই এখন বৈধ বালিঘাট গুলি বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। ফলে, সব জেলাতেই চড়চড় করে বাড়ছে বালির দাম। চলছে দেদার কালোবাজারিও। কিন্তু, দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বিখ্যাত বীরভূমে রমরমিয়ে চলছে অবৈধ বালির ব্যবসা। সম্প্রতি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ও সিবিআইয়ের একটি বিশেষ দল বীরভূম জেলার বিভিন্ন জায়গায় হানা দিয়ে টুলু মন্ডল নামক এক ব্যক্তির খোঁজ চালাচ্ছে। একটি বিশ্বস্ত সূত্র মারফত জানা গেছে অবৈধ বালি কারবারের ‘প্যাড’ চালানোর অভিযোগে এই টুলু মন্ডলকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ও সিবিআই জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইছে । এই টুলু আবার নাকি তৃণমূল কংগ্রেসের বীরভূম জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ বলে এলাকায় জোর প্রচার রয়েছে।

অন্যদিকে ওয়েস্ট বেঙ্গল মিনারেল ডেভেলপমেন্ট এন্ড ট্রেডিং কর্পোরেশন লিমিটেডের উদ্যোগে গত ১১ মার্চ ময়ূরাক্ষী নদীগর্ভ থেকে পলি ও বালি তুলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রক্ষা করার উদ্দেশ্যে একটি টেন্ডার করা হয়। সেই টেন্ডার (আর এফ পি নং: এম ডি টি সি/ স্যাণ্ড/০০২/৫০৩, তাং: ১১/০৩/২০২২) মোতাবেক, সৌরভ কুমার রায় নামক এক ব্যক্তি ময়ূরাক্ষী নদী থেকে পলি ও বালি তোলার বরাত পান। সিউড়ি থানা এলাকার ময়ূরাক্ষী নদী গর্ভের পলি ও বালি তুলে তা জমা করে রেখে ওয়েস্ট বেঙ্গল মিনারেল ডেভলপমেন্ট এন্ড ট্রেডিং কর্পোরেশন লিমিটেডের কর্মকর্তাদের দিয়ে তা মাপজোক করানোর কথা বরাতের শর্তে ছিল। কিন্তু, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ – ময়ূরাক্ষী নদী থেকে বালি ও পলি পরিষ্কার করার বরাত পাওয়া ওই সংস্থার সরাসরি নদীগর্ভ থেকে বালি তুলে তা ১০ চাকা ও ১২ চাকা ডালা বডি ট্রাকে অত্যন্ত কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বীরভূম জেলাতে সক্রিয় রয়েছে একটি ‘প্যাড পার্টির’ দল। এই অসাধু ‘প্যাড পার্টির’ দলের লোকজনেরা রীতিমতো নদীগর্ভ থেকে উঠে আসার রাস্তার ওপরে অফিস করে বসে তোলা আদায় করছে ও অবৈধ ‘প্যাড’ বিক্রি করছে ওইসব বালি বহনকারী ট্রাক গুলি থেকে। বাজারদর থেকে কম দামে বালি কিনতে পেয়ে স্বভাবতই কলকাতা ও বিভিন্ন জায়গার ট্রাক ও ডাম্পার গুলি সোজাসজি চলে যাচ্ছে ময়ুরাক্ষীর নদীগর্ভে যেখানে নদীগর্ভ পরিষ্কার করার নামে বালি লুঠের ব্যবসা চলছে। ওয়েস্ট বেঙ্গল মিনারেল ডেভেলপমেন্ট এন্ড ট্রেডিং কর্পোরেশন লিমিটেডের কোনো নিয়ম-কানুন মানা হচ্ছে না বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ। একটি সূত্র মারফত জানা গেছে এই সিন্ডিকেটের বালি মাফিয়ারা অন্য এলাকার বৈধ ঘাটের চালান দিয়ে ওই বালি গাড়ি গুলিকে পাচার করছে ও তার বদলে মোটা টাকা তোলা নিচ্ছে। প্রকাশ্য দিনের আলোতেই কয়েকশো লরি, ট্রাক ও ডাম্পার বালি বহন করে বীরভূম জেলা থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পাড়ি দিলও নজরে আসছে না কোনো প্রশাসনের আধিকারিকদের বলে অভিযোগ। সূত্র মারফত জানা গেছে এই বালি মাফিয়া সিন্ডিকেটের ‘অভিষেক’, ‘হুমায়ুন’, ‘পাঠক’, ‘রাজকুমার’ সহ আরো বেশ কয়েকজন এই অবৈধ বালি মাফিয়া সিন্ডিকেটের অংশ। সূত্র মারফত এও জানা গেছে এই অবৈধ বালি সিন্ডিকেটের মাথা ‘আলী’ নামক এক প্রশাসনের আধিকারিক। তিনি নাকি নিজের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে বীরভূম জেলাতে অবৈধ ‘প্যাড’ কারবারি ও অবৈধ বালি সিন্ডিকেট রাজ চালাচ্ছেন। সূত্র মারফত এও জানা গেছে ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা এক ব্যক্তির দ্বারা দুর্নীতিগ্রস্ত বেশ কয়েকজন এলাকার প্রশাসনিক আধিকারিক ও রাজনৈতিক নেতাদের মোটা টাকার বিনিময়ে এই অসাধু চক্র চালাতে সাহায্য করছেন।

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ও সিবিআই ইতিমধ্যেই বীরভূম জেলার অবৈধ বালি ও পাথর সংক্রান্ত তথ্যের খোঁজে হানা দিয়ে বেড়াচ্ছে বীরভূম জেলার বিভিন্ন জায়গায়। এত সবের এরপরও কোনভাবেই দমানো যায়নি অবৈধ বালি ও পাথর ব্যবসা বীরভূম জেলাতে। অবৈধভাবে নদীগর্ভ থেকে এভাবে বালি লুঠ হওয়ার খবর নিশ্চয়ই এখনো সম্ভবতঃ পৌঁছায়নি ওয়েস্ট বেঙ্গল মিনারেল ডেভেলপমেন্ট এন্ড ট্রেডিং কর্পোরেশন লিমিটেডের কর্মকর্তাদের কানে। আর যদি তাদের কানে একথা গিয়ে থাকে তাহলে কেনই বা তারা এখনো পর্যন্ত কোনো আইনি ব্যবস্থা নিলেন না সে বিষয়ে প্রশ্ন চিহ্ন রয়ে গেল ? রাজ্য সরকারের অধীন সমস্ত নদ ও নদী থেকে কয়েকশো কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ে হওয়ার কথা। কিন্তু, অবৈধভাবে বালি পাচারের ফলে ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে রাজ্য সরকারের রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাকে। রাজ্য স্তরের সকল প্রশাসনিক আধিকারিকরা কবে শীতঘুম থেকে জেগে এই অবৈধ কারবারে লাগাম লাগাবে সে দিকেই চেয়ে এখন বীরভূম জেলার আমজনতা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here