দুর্গাপুরে প্রাণঘাতী ছত্রাক ব্ল্যাক-ফাঙ্গাঁস রোগীঃ এক সপ্তাহেও স্বাস্থ্য দপ্তরকে জানায়নি দিশা হসপিটাল

0
2349

মনোজ সিংহ, দুর্গাপুরঃ- চোখের চিকিৎসা করাতে আসা রোগীর শরীরে প্রাণঘাতী ব্ল্যাক-ফাঙ্গাঁস ছত্রাকের হদিশ মেলার পাঁচ দিন পরেও, জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে পরিষেবা চালিয়ে গেল দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি চক্ষু হাসপাতাল- যা নিয়ে রীতিমতো চোখ কপালে উঠেছে জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসনের । বিশেষ সূত্রে পাওয়া খবরে জানা গেছে, দিশা আই হসপিটাল নামের ওই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানকে জবাব দিহি করতে বলা হতে পারে আগামী সপ্তাহেই। পাশাপাশি, জানতে চাওয়া হবে- বিরল ওই প্রাণঘাতী ছত্রাকের রোগী আসার পর সংক্রমণ রুখতে এখনো অব্দি ঠিক কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

উত্তর ও পশ্চিম ভারতের কয়েকটি রাজ্যে এ মাসের গোড়ায় প্রথম হদিশ মেলে ব্ল্যাক ফাঙ্গাঁসের, যার পোশাকি নাম মিউকরমাইকোসিস। দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা চোখ ও নাকে তীব্র সংক্রমণকারী ছত্রাকটির চলতি কোভিড পরিস্থিতিতে আচমকা উদয় হওয়ায় বিশেষ দুশ্চিন্তার কথা সমস্ত রাজ্যকেই জানিয়ে দিয়ে, পর্যাপ্ত সাবধানতার শলা দান করেন। পশ্চিমবঙ্গে এযাবৎকাল পর্যন্ত মারণ ছত্রাকটির উপস্থিতি টের না পাওয়া গেলেও, গত সপ্তাহে দুর্গাপুরের সিটি সেন্টারের দিশা হাসপাতালে চোখের ব্যথা ও ক্রমশ চোখ ফুলে যাওয়া উপসর্গ নিয়ে আসা দুই রোগীর শরীরেই প্রথম ব্ল্যাক-ফাঙ্গাঁস বা মিউকরমাইকোসিসের সন্ধান মেলে । ওই দুই রোগী দিশাতে এসেছিলেন বিহারের নওয়াদা এবং ঝাড়খণ্ডের দুমকা থেকে। আরেক আক্রান্ত রোগী ভাগলপুর থেকে টেলিমেডিসিন ব্যবস্থাপনায় ওই হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নেন। এই সংক্রমণগুলি দুর্গাপুরের হাসপাতালটির নজরে আসে ৭ থেকে ১৩ ই মে এর মধ্যে বলে ব্যারাকপুর থেকে হাসপাতালের চেয়ারম্যান দেবাশিষ ভট্টাচার্য জানান। তবে, দিশা সরকারিভাবে রবিবার দুপুর পর্যন্ত পশ্চিম বর্ধমান জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের কাছে কোন রিপোর্ট পাঠায়নি । জেলার উপ মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ কেকা মুখার্জি বলেন, ” আমরা লোকমুখে শুনেছি ওই চক্ষু হাসপাতালে দুটি ব্ল্যাক-ফাঙ্গাঁস বা মিউকরমাইকোসিসের রোগী মিলেছে । তবে ওরা এখনো আমাদের কাছে বিষয়টি জানায়নি।” জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের আরেক উপ মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ অনুরাধা দেব অবশ্য রবিবার বিষয়টি নিয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে , স্বাস্থ্য বিভাগ আগামী সপ্তাহেই দিশা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে কৈফিয়ৎ চাইবে বলে অন্য একটি সূত্র জানায়।

ব্ল্যাক-ফাঙ্গাঁস বা মিউকরমাইকোসিসের আক্রান্ত ওই দুই রোগীকে দিশা কর্তৃপক্ষ সিটি সেন্টারেরই হেলথ ওয়ার্ল্ড হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। জানা যায়, ওই দুই রোগী কোভিড থেকে সম্প্রতি সুস্থ হয়ে ওঠার পরেই তারা ব্ল্যাক-ফাঙ্গাঁস বা মিউকরমাইকোসিসের আক্রান্ত হন । প্রশ্ন ওঠে, তবে কি নিজেদের ব্যবসার কথা মাথায় রেখে সংক্রমক রোগের বিষয়টি পুরোপুরি চেপে রেখেছিলেন দুর্গাপুরের দিশা কর্তৃপক্ষ ? বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে দিশা’র ব্যারাকপুর সদরদপ্তর অবশ্য রোগীদের ব্যাপারটি কয়েকদিন পরেই প্রকাশ্যে আনে । কেন চেপে রাখা হলো স্পর্শকাতর বিষয়টি, জানতে চাওয়া হলে , দুর্গাপুর দিশা’র মুখ্য কার্যনির্বাহী ডাঃ পার্থ মণ্ডল বেশ রাগতঃ স্বরে বলেন, “আমাদের নিজস্ব পেশেন্টে রেকর্ডের ব্যাপারে আমরা অন্য কাউকে তথ্য দেবো কেন ?” ডাঃ মন্ডল সম্ভবত বিষয়টি ধামাচাপা দিতে প্রসঙ্গ বদলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে তিনি রবিবার জানান, “দুজন রোগীর শরীরে ব্ল্যাক-ফাঙ্গাঁস বা মিউকরমাইকোসিস মিলেছে। আমরা তাদেরকে হেলথ ওয়ার্ল্ড হাসপাতলে পাঠিয়েছি।”

এদিকে খোদ সিটি সেন্টারেরই একটি হাসপাতালে এক সপ্তাহ আগেই মারণ ছত্রাকের রোগীর হদিশ মেলায় রবিবার লকডাউনে গৃহবন্দী মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্য ও আশঙ্কা ছড়ায় । অনেকেই ঘন ঘন ফোন করেন হাসপাতাল এমনকি পুলিশকেও।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ অবশ্য রবিবারেই পরিষ্কার জানিয়ে দেয়- অযথা আতঙ্কের প্রয়োজন নেই, ভিন রাজ্যের দুই রোগীর দেহে ছত্রাকের সন্ধান মিললেও তাদের থেকে অন্য কারো সংক্রমিত হওয়ার কোনো তথ্য এখনও মেলেনি। এদিকে, হেলথ ওয়ার্ল্ড হাসপাতালে মুখ্য কার্যনির্বাহী, প্রবীর মুখার্জি বলেন, ” দিশা আমাদের এখানে দুজন ব্ল্যাক-ফাঙ্গাঁস বা মিউকরমাইকোসিসের রোগীকে পাঠিয়েছিল ঠিকই, তবে আর্থিক সঙ্গতি না থাকায়, তারা এখানে চিকিৎসা না করিয়ে নিজেদের রাজ্যে ফেরত চলে যায়।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here