বেকায়দায় পড়ে কখনো ছাত্রকে ‘পাগল’, কখনো ‘মাদকাসক্ত’ বলছে দুর্গাপুরের কলেজগুলি

0
2813

নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুরঃ- প্রতিবাদী ছাত্রকে ‘ড্রাগ অ্যাডিক্ট’, ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ তকমা দিয়ে পিঠ বাঁচাতে চাওয়া দুর্গাপুরের বেসরকারি কলেজটিকে ‘হৃদয়হীন’ আখ্যা দিল ভুক্তভোগী ছাত্রের পরিবার। বৃহস্পতিবার সকালে। পরিবারের দাবি, “কলেজের গাফিলতি আর অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে আমাদের ছেলে, তাই বলে আমার ছেলে মাদকাসক্ত? পাগল?”

শুধু ‘প্রতিবাদী’ কে-ই নয়, ভালবেসে শিক্ষিকাকে ‘মা’ বলে ডাকা ক্লাশ ওয়ান’র এক অবুঝ শিশুকেও ‘পাগল’ আখ্যা দিয়ে স্কুল থেকে সটান তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২০০৯ সালে। শহর দুর্গাপুরেই। এখানকার ইংরাজী মাধ্যম হেমশীলা মডেল স্কুলে ক্লাশ চলাকালীন শিক্ষিকাকে মা বলে সম্বোধন করেছিল ক্লাশ ওয়ানের ছাত্র অরিন্দম চক্রবর্তী। স্রেফ এই দোষে অরিন্দম কে ‘পাগল’ ঘোষনা করে ৯ জুন, ২০০৯ স্কুল ছাড়তে নির্দেশ দেয় অনাবাসী ভারতীয় রবীন্দ্রনাথ রায়ের চড়া ‘ফি’ নেওয়া ওই স্কুল। এর প্রতিবাদে স্কুলের ‘গার্জেন ফোরাম’ পথে নামলে ১৭ জুন দুর্গাপুরের দুই সি পি এম নেতার অঙ্গুঁলি হেলনে অভিভাবকদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এক সপ্তাহের জন্য পঠন পাঠন বন্ধ করে দেওয়া হয় স্কুলটি। এরই মাঝে ১২ জুন অরিন্দমকে আলাদা দু’জন মানসিক রোগের চিকিৎসকের কাছে দেখানো হয় অরিন্দমকে। দুই চিকিৎসকই অরিন্দমকে স্বাভাবিক সার্টিফিকেট দেওয়া সত্বেও ছাত্রটিকে স্কুল ছাড়া করে কর্তৃপক্ষ।

২০০৯-র অরিন্দম আর ২০১৯ এ সোমনাথ। গড় পড়তা বিষয়টা প্রায় একই রকম। বেকায়দায় পড়া স্কুল আর পরিস্থিতি সামলাতে নাজেহাল হওয়া কলেজ নিজের মুখ বাঁচাতে ছাত্রকে কখনো ‘পাগল’ তো কখনো আবার ‘ড্রাগ অ্যাডিক্ট’ মানসিক রোগী আখ্যা দিয়েছে। দুর্গাপুরে।

দুর্গাপুরের গোপালপুরের রাজেন্দ্রনাথ পলিটেকনিক কলেজের দুই ছাত্রী রিতু সিং এর বৈশাখী রায় প্রথম সেমিষ্টার পরীক্ষায় বসার অ্যাডমিট কার্ড না পেয়ে মঙ্গঁলবার সকালে আত্মহত্যার হুমকি দেয়। তাদের অভিযোগ, টাকা নিয়ে ভর্তি করে এক বছর পর কর্তৃপক্ষ জানায়, মাধ্যমিকে তাদের নম্বর কম ছিল, তাই পরীক্ষায় বসার অ্যাডমিট কার্ড দেয়নি রাজ্য সরকার। দুই ছাত্রী আত্মহত্যার হুমকি দেওয়ার ঘটনায় বিচলিত তাদের সহপাঠী সোমনাথ পান্ডা বিষয়টি সরাসরি সোস্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে। তাই নিয়ে বিস্তর চাঞ্চল্য ছড়ায়। এরপরই পরীক্ষা চলাকালীন আচমকাই সোমনাথকে অফিস রুমে ডেকে পাঠিয়ে তাকে হুমকি দেন কলেজের বরিষ্ঠ কিছু আধিকারিক। তাকে নাকি এই বলেও শাসানো হয় – “তিন বছর কলেজে থাকতে হবে। জয়ন্ত বাবু্র অনেক টাকা আছে। শেষ হয়ে যাবে”। জয়ন্ত চক্রবর্তী কলেজটির চেয়ারম্যান। ভয়ে আতঙ্কিত ছাত্রটি রাত্রে অতিরিক্ত মাত্রায় ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। খবর যায় দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের বরিষ্ঠ আধিকারিকদের কাছেও।

বুধাবার সকালে অচেতন অবস্থায় সোমনাথকে উদ্ধার করা হয়। দুর্গাপুর মহকুমা হাসপাতালে ছুটে যান কলেজের মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক মদন সরকার। সেখানেই মদন আচমকা সোমনাথকে ‘ড্রাগ অ্যাডিক্ট’ বলে বসেন। মদন অবশ্য বলেন, “ওর পরিবার থেকে জেনেছি, ছেলেটি ড্রাগ অ্যাডিক্ট। মানসিক সমস্যা আছে ওর। কোনো মেয়ের সাথে প্রেমের কিছু ব্যাপার আছে শুনেছি। ও কলেজের ভাবমূর্তি খারাপ করেছে”। মদনের এই অভিযোগের সটান জবাব দিয়েছেন সোমনাথের বাবা বিশ্বরূপ পান্ডা। বৃহস্পতিবার হাসপাতাল থেকে পরীক্ষা হলে পৌঁছে দেওয়ার পর বিশ্বরূপ বলেন- “আমার ছেলে যথেষ্ট দায়িত্ববান। নিজেদের দোষ ঢাকতে কলেজ এখন আমার ছেলেকে নেশাগ্রস্থ, অস্বাভাবিক বলে ফাঁসাতে চাইছে। নানা রকম চাপ দিচ্ছে। এদের হাতে ছেলেকে রেখে যেতে হবে, ভয় হচ্ছে ওরা আমার ছেলের কোন ক্ষতি করে দেবে না তো?” বিশ্বরূপের বাড়ি বাঁকুড়ার হীড়বাঁধে। তিনি ও সোমনাথের মা রুমা ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায়। তারা বলেন, “আমাদের ছেলে মানসিক রোগী নয়। রাত্রে মাঝে মধ্যে ঘুম আসে না বলে বাঁকুড়ার মেডিকেল কলেজ থেকে তাকে ০.২৫ মাত্রার ঘুমের ওষুধ দিয়েছে মাত্র। আমাদের ছেলে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৮০ শতাংশ নম্বর নিয়ে পাশ করে রাজেন্দ্রনাথ কলেজে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ভর্তি হয়”।

গোটা ঘটনায় বিচলিত পান্ডা দম্পতির প্রশ্ন- “আমার ছেলে তো আপনাদের দুর্গাপুরের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিল। কই, সেখানে রক্ত পরীক্ষায় তো ছেলে যে কোন মাদক সেবন করে, তেমন কোনো নমুনা মেলেনি? তাহলে ওই কলেজের এক আধিকারিক গায়ের জোরে, টাকার জোরে প্রমান – করবেন ছেলে নেশাগ্রস্ত”? আতঙ্কিত দম্পতি তাদের ছেলেকে গোপালপুরের সুকান্ত দত্ত’র বাড়ি থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা সোমনাথের ওপর আক্রমণ চালানো হতে পারে!

বৃহস্পতিবার বিকালে কলেজে তদন্তে আসেন দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের কাঁকসা থানার একটি দল। তারা কথা বলেন সোমনাথের ও তার বাবার সাথেও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here