কোকওভেন থানায় ডাক মাস্টারের ভূমিকায় আবার ফিরে এলো সেই বিতর্কিত মুকেশ, এলাকার মানুষ ফুঁসছেন

0
2528

অমল মাজি, দুর্গাপুর:- গত দুই বছর আগে কোকওভেন থানা এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি খুনের ঘটনায় তোলপাড় হয়ে ওঠে দুর্গাপুর। গ্যারেজ মোড় সংলগ্ন পেট্রল পাম্পের সামনে এক নেপালি যুবক বিষ্ণু থাপা’কে গুলি করে খুন করে দীপক সাউ নামে এক দুষ্কৃতী। মর্মান্তিক এমন ঘটনায় গর্জে ওঠেন এলাকার বাসিন্দারা। তাদের দাবি ছিল, খুনি দীপককে অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে। সেইসময় চরম বিপাকে পড়ে যায় পুলিশ মহল। একদিকে স্থানীয় মানুষদের বিক্ষোভ, অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদের চাপে কোকওভেন থানার ওসি অর্ঘ মন্ডল বিপাকে পড়ে যান। সেইসময় ওসি অর্ঘ মন্ডল প্রতিশ্রুতি দেন, যেভাবেই হোক তিনি খুনি দীপককে গ্রেফতার করবেন। সেই অনুযায়ী অর্ঘবাবু তদন্ত শুরু করেন। তদন্তে তিনি জানতে পারেন খুনি দীপক বিহার পালিয়ে গেছে।

সেইসময়, পুলিশের তদন্তে উঠে আসে এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন সকাল ন’টা নাগাদ পিসিবিএল সংলগ্ন গাড়ি পার্কিংয়ে যায় দীপক সাউ। সেখানে পার্কিংয়ে কর্মরত যুবকদের কাছে হুমকি দিয়ে কুড়ি হাজার টাকা দাবি করে দীপক। কিন্তু তারা টাকা দিতে অস্বীকার করে এবং বিশু গড়াই নামে এক কর্মী তথা করঙাপাড়ার বাসিন্দা দীপককে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয় বলে অভিযোগ। এরপর ওইদিনই বেলা এগারোটা নাগাদ বিশু গড়াই এবং বিষ্ণু থাপা দুইজনকে পেট্রল পাম্পের সামনে দেখতে পেয়ে যায় দীপক। সেইসময় বিশু গড়াইকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দীপক। কিন্তু গুলি লক্ষ্যভ্ৰষ্ট হওয়ায় অল্পের জন্য বিশু গড়াই বেঁচে যায়। তারপরই গুলি চালায় বিশু গড়াইয়ের সাথে থাকা বিষ্ণু থাপাকে লক্ষ্য করে। গুলি খেয়ে বিষ্ণু মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

বিষ্ণু থাপাকে খুন করেই দীপক সোজা চলে যায় কোকওভেন থানার ডাক মাস্টার মুকেশের কাছে| মুকেশের কাছে থেকে দশ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় বিহারে। অভিযোগ, সেইসময় দীপককে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল মুকেশ। প্রশ্ন ওঠে, খুন করে পালিয়ে যাওয়ার সময় দুষ্কৃতী দীপক তৎকালীন থানার ডাক মাস্টার মুকেশের সঙ্গে দেখা করেছিল কেনো ?

সেইসময় কোকওভেন থানার ওসি অর্ঘ মন্ডল চরম সমস্যায় পড়ে যান। দীপককে ধরতে জাল বিছান ওসি। তিনি তার পুলিশ ফোর্স সহ সোর্স নিয়ে বিহারে ছোটেন খুনি দীপকের বাড়ি এলাকায় (পাটনা, ভগবানপুর)। কিন্তু ওখানে গিয়ে অর্ঘবাবু জানতে পারেন, তার আসার খবর পেয়ে দীপক এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। অর্ঘবাবু হাল ছাড়ার পাত্র নন। তিনি পুনরায় ছোটেন বিহারে। কিন্তু তিনি দীপককে ধরতে অসফল হন। বারবার এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকায় ওসি অর্ঘবাবু হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন না, তিনি বিহারে পৌঁছানোর আগেই কিভাবে দীপক খবর পেয়ে যাচ্ছে।

তারইমধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের এবং রাজনৈতিক চাপে আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনার অর্ঘবাবুকে ট্রান্সফার করে দেন আসানসোল পুলিশ লাইনে । অর্ঘবাবুর মতো একজন দক্ষ অফিসারকে এইভাবে চলে যাওয়াটা এলাকার মানুষ মেনে নিতে পারেননি। সেসময় যদি ডাক মাস্টার মুকেশ খুনিকে ধরতে একটু সাহায্য করতো তাহলে হয়তো অর্ঘবাবুকে এইভাবে চলে যেতে হতো না। তার পরিবর্তে কোকওভেন থানায় ওসি হয়ে আসেন সন্দীপ দাস। তিনি ওসি’র দায়িত্ব নিয়েই ওই খুনের কেসের তদন্তে নেমে পড়েন। তিনিও খুনি দীপককের খোঁজে পুলিশ ফোর্স এবং সোর্স নিয়ে বিহারে ছোটেন। প্রথমবার তিনিও খুনিকে ধরতে অসফল হন।

এদিকে তৎকালীন সিআই চন্দ্রনাথ চক্রবর্তী একজন দক্ষ পুলিশ অফিসার ছিলেন। তিনি বুঝতে পারেন, অর্ঘবাবু বিহারে যাওয়ার খবরাখবর থানা থেকেই কেউ দিচ্ছে। তাই অর্ঘবাবুর মতো সন্দীপবাবুর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। তার সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ে ডাক মাস্টার মুকেশের উপর। সেই সন্দেহ অনুযায়ী ডাক মাস্টার মুকেশের ফোনে আড়ি পাতার ব্যবস্থা করেন। তারফলেই জানা যায়, মুকেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে খুনি দীপকের। ওসি অর্ঘবাবু বিহার যাওয়ার আগেই এখান থেকেই দীপককে ফোন করে তা জানিয়ে দিচ্ছিলো মুকেশ। এখনো তাই করছে ডাক মাস্টার মুকেশ। তাই পুলিশের জাল ফস্কে আগেভাগেই গা ঢাকা দিতে সমর্থ হচ্ছে দীপক।

সন্দীপবাবু মুকেশের সম্পর্কে সব কিছু জানতে পেরে, মুকেশকে চরম শাসানি দিয়ে ডাক মাস্টার থেকে সরিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, সন্দীপবাবুর ব্যক্তিগত গাড়িচালককে কেউ একজন জানিয়ে দেয়, মুকেশের দেওয়া কোনও প্রসাদ, মিষ্টি, খাবার সন্দীপবাবু যেন না খান। কারণ, মুকেশ সেইসব প্রসাদ বা খাবারে মধ্যে জড়িবুটি মিশিয়ে বশীকরণ করে ওসি-দের । বিষয়টি জানতে পেরে সন্দীপবাবু থানার ধারে পাশে আসা একেবারে বন্ধ করে দেন মুকেশকে ।

এখন (২৪/৭/ ২০২০) কোকওভেন থানায় নতুন ওসি মনোজিৎ ধাড়া আসার পর, পূর্বতন এক ওসি, যিনি কোকওভেন থানায় ওসি থাকাকালীন মুকেশের বশীকরণে মুগ্ধ ছিলেন, সেই পুলিশ অফিসারের হস্তক্ষেপে মুকেশকে আবার কোকওভেন থানার নতুন ওসি’র ধারে কাছে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে । এবং এলাকাতে টাকা তুলতেও দেখা যাচ্ছে । এছাড়া মুকেশ প্রকাশ্য বলে বেড়াচ্ছে, সে এখন কোকওভেন থানার ডাক মাস্টার । অনেককেই হুমকি দিতে শুরু করেছে মুকেশ ।

এদিকে শোনা যাচ্ছে, মুকেশের প্রশংসায় মুগ্ধ নতুন ওসি মনোজিৎবাবু । তাই অনেকের মনে প্রশ্ন, মুকেশ কি তার বশীকরণের দ্বারা এই নতুন ওসিকে বশ করে নিয়েছে ? অবশ্য পুলিশ মহলের বক্তব্য, মুকেশ যে কয়েকজন ওসি’র অধীনে ডাক মাস্টার ছিল, সেইসব ওসিদের এখান থেকে যাওয়ার সাথে সাথে ভালো কিছু হয়নি । অর্থ্যাৎ, এখান থেকে ট্রান্সফার হওয়ার সাথে সাথে অন্য কোথাও ভালো পোস্টিং পায়নি । সবারই লাইনে পোস্টিং হয় । মনোজিৎ বাবু কি সেই পথেই হাঁটছেন ?

এখন প্রশ্ন হল, কি কারণে এই বিতর্কিত মুকেশকে থানায় অগ্রাধিকার দেওয়া হল ? সে সূরা-সাকি সাপ্লাই দিতে পারে বলে ? সে একজন সূরা- সাকির সিদ্বহস্ত এবং দাগি জুয়াড়ি । তাকে প্রায় প্রতিরাতেই শ্যামপুর সংলগ্ন মাঝের মানাতে জুয়ার আসরে দেখা যায় । সে থানার সঙ্গে যুক্ত থাকলেই এলাকায় চুরি ছিনতাই বেড়ে যায় । সেইজন্য কি মুকেশের অগ্রাধিকার ?

এদিকে সেই পুলিশ অফিসার অর্ঘবাবু এখন এখানেই সিআই হয়ে এসেছেন কয়েক মাস হল । জানা গেছে, সিআই হয়ে আসার কয়েকদিনের মধ্যে মুকেশ গিয়েছিলো অর্ঘবাবুর সঙ্গে দেখা করতে । তখন অর্ঘবাবু মুকেশকে পাত্তা দেননি । এখন যদি মুকেশের এই থানায় যোগ দেওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন, তখন অর্ঘবাবু কি করবেন ?

অপরদিকে, মুকেশের এই থানার মধ্যে অগ্রাধিকার পাওয়াটা এলাকার মানুষ ভালো চোখে দেখছেন না । এই ব্যাপারটি কেউ মেনে নিতে পারছেন না । ক্ষোভে ফুঁসতে শুরু করেছেন এলাকার মানুষ । যেকোনো দিন মুকেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে সামিল হতে পারে এলাকার মানুষ ।

ওসি মনোজিৎ ধাড়া স্বীকার করে বলেন, হ্যাঁ, মুকেশকে থানার কাজ দেখাশোনা করার জন্য রাখা হয়েছে । এব্যাপারে ডিসিপি অভিষেক গুপ্ত বলেন, মুকেশের ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here