দলের ভেতরে জোর জল্পনা, মূখ্যমন্ত্রী দিলীপ ঘোষের বিকল্প বিধানসভা নির্বাচনে রঙ্গ বিজেপির নতুন মুখ রাজ্যসভার সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত

0
1211

বীরূপাক্ষ সেন

নবগঠিত রাজ্য কমিটিতে সবাইকে জায়গা করে দিয়ে যতই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সামনে ঐক্যের ছবিটা মেলে ধরার চেষ্টা করুন না কেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। তলে তলে কিন্তু ক্রমেই চওড়া হচ্ছে ফাটল। বিজেপির রাজ্য সংগঠনের ‘ঐক্যবদ্ধ’ ভাবমূর্তির অন্তরালে পুরোমাত্রায় চলছে ক্ষোভ-অসন্তোষ, পছন্দ-অপছন্দের ফিসফাস গুঞ্জন। বস্তুত, একুশের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই মুখর হচ্ছে দলের মধ্যে এই পরস্পর বিরোধিতা। একুশে বাংলার মসনদ দখলের উদ্দেশ্যেই যে ঝাঁপাতে চলেছে দল, সে কথা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। ফলে, ইচ্ছেমতো সম্পাদক মন্ডলী গড়ে তোলা নয়। বরং কেন্দ্রীয় কমিটির হস্তক্ষেপে চূড়ান্ত হল সবটুকু। অমিত শাহ তাঁর গত ৯ জুনের ভার্চুয়াল সভা থেকে স্পষ্ট বার্তাই দিয়ে দিয়েছেন দলীয় নেতা-কর্মীদের। কিন্তু আসন্ন ভোট যুদ্ধে বাংলায় দলের ‘মুখ’ বা সোজা কথায়, ভাবী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে কাকে প্রোজেক্ট করা হবে, তা নিয়ে স্পষ্টতই দ্বিধাবিভক্ত বঙ্গ বিজেপি। দলের অন্দর মহলের খবর, রাজ্য সভাপতি হলেও দিলীপ ঘোষকে সামনে রেখে বাংলার মসনদ দখলের স্বপ্ন দেখতে ঘোরতর আপত্তি দলের একটা বড় অংশের। এই অংশের শরিক, দলের বেশকিছু প্রথম সারির প্রভাবশালী নেতা। এঁরা চাইছেন একজন উচ্চশিক্ষিত, সর্বজনগ্রাহ্য ও সজ্জন ভাবমূর্তির কাউকে দিলীপবাবুর বিকল্প হিসাবে সামনে তুলে আনতে। এদিকে সময় থাকতে জেলায় দলীয় সংগঠনের সভাপতি নিয়োগ করে দিলীপ বাবুও সময়মতো নিজের প্রতিপত্তি ইতিমধ্যে এগিয়ে রেখেছেন। শুধু তাই নয়। জেলা সভাপতিরাও নিজস্ব লবি তৈরীর কাজে নিখুঁত ঝাড়াই-বাছাই করে ফেলেছেন লক-ডাউনের মধ্যেই। কোন কোন জেলায় অবস্থা এমনি যে, অফিসিয়াল কমিটির পরিধিতে জায়গা না পাওয়ায় বিক্ষুব্ধ শিবিরে রয়ে গেছেন একটি বড় অংশ। তারাও যে খুব অদক্ষ কিম্বা ইন-অ্যাকটিভ, তা নয়। এদের নিয়েই দুশ্চিন্তায় উচ্চ নেতৃত্ব। তাই নতুন মুখ নিয়ে এহেন ফর্মুলায় স্বস্থি নামিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দলের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রের খবর, নতুন বিকল্পের ব্যাপারে ডার্ক হর্স হয়ে উঠতে পারেন রাষ্ট্রপতি মনোনীত রাজ্যসভার সদস্য স্বপন দাশগুপ্ত।রাজ্য রাজনীতিতে স্বপনবাবু খুব পরিচিত নাম না হলেও জন্ম তাঁর কলকাতায় এবং ছাত্রজীবনের শুরুও এই বাংলাতেই। তাছাড়া বিশিষ্ট সাংবাদিক তথা প্রাবন্ধিক হিসাবে সুবিদিত এই বিদগ্ধ রাজ্যসভার সদস্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অত্যন্ত আস্থাভাজন। সূত্রের মতে, এমনই এক ব্যক্তিত্বকে দিলীপ-বিরোধী কুচকাওয়াজের ভরকেন্দ্রে রেখে এগোতে চাইছে দলের একটা বড় অংশ। এ হেন এক বিকল্প প্রস্তাব দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কানে পৌঁছে দিতে দিল্লি পাড়ি দেন মুকুল রায় সহ তাঁর অনুগামী কতিপয় নেতা। সূত্রের দাবি, রাজ্য বিজেপির এই শিবিরে আছেন মুকুল ঘনিষ্ঠ সব্যসাচী দত্ত থেকে শুরু করে বাবুল সুপ্রিয়, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, অর্জুন সিং, সৌমিত্র খাঁ, ভারতী ঘোষ, মাফুজা খাতুন, খগেন মুর্মুর মতো নেতৃবৃন্দ। দিল্লিতে মুকুল রায়, সব্যসাচী দত্ত প্রমুখ বঙ্গ নেতারা স্বপন দাশগুপ্তের সঙ্গে কয়েক প্রস্থ আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে। শুক্রবার রাতে অমিত শাহর সঙ্গেও তাঁর বাসভবনে গিয়ে মুকুলরা দেখা করেন বলে সূত্রের খবর। বৃহস্পতিবার দিল্লি মিশন শেষ করে শনিবার দুপুরেই কলকাতায় ফিরেছেন তাঁরা। স্বপন দাসগুপ্তের ঘনিষ্ঠ সূত্রের মতে, দলের প্রয়োজনে বাংলায় সক্রিয় রাজনীতিতে আসতে তাঁর কোনও আপত্তি নেই বলেই জানিয়েছেন তিনি। তবে সংসদের আসন্ন বাদল অধিবেশনের আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় বাংলা থেকে আরও নতুন মুখ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে যে খবর বাতাসে ভাসছে, তার সঙ্গেও মুকুলের দিল্লিযাত্রার যোগ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলা থেকে দলের অভূতপূর্ব সাফল্যের সুবাদে মিলেছে ১৮ সাংসদ। তবু কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় রাজ্য থেকে ঠাঁই হয় মাত্র দুই প্রতিমন্ত্রী। আসানসোলের সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় এবং রায়গঞ্জের দেবশ্রী চৌধুরী। বাংলায় নির্বাচনের আগে এই সংখ্যাটাই বাড়িয়ে রাজ্যের মানুষকে একটা বার্তা দিতে চাইছেন গেরুয়া শিবির। মোদি মন্ত্রিসভায় বাংলা থেকে কারা আসতে পারেন তা নিয়ে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জল্পনা। জানা গেছে, বনগাঁর সাংসদ শান্তনু ঠাকুর থেকে বাঁকুড়ার সাংসদ ডা. সুভাষ সরকার। রয়েছেন মহিলা মোর্চার নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায় ও ঝাড়গ্রামের আদিবাসী সাংসদ কুনার হেমব্রমের নাম। তবে, এই দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকা মুকুল রায়কে তড়িঘড়ি কয়লামন্ত্রক দেবার সিদ্ধান্তে রাজ্য রাজনীতিতে রীতিমত আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সদ্য গঠিত বিজেপির রাজ্য কমিটিতে মুকুল ঘনিষ্ঠদের জায়গা করে দিয়ে তাঁকে মন্ত্রিত্ব দিয়ে আপাত দিল্লিতে ব্যস্ত রাখার একটা পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রক সামলানোর অভিজ্ঞতা আছে মুকুলের। সেই নিরিখে অন্য কোনও রাজ্য থেকে তাঁকে রাজ্যসভায় জিতিয়ে নিয়ে গিয়ে মোদি মন্ত্রিসভায় জায়গা করে দিলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে দলের এই পরিকল্পনার ব্যাপারে মুকুল রায় তো বটেই, মুখ খুলতে চাননি দিলীপ ঘোষও। অথচ, লক্ষনীয় বিষয় হলো, সম্পাদক মন্ডলী গড়ে একঝাঁক মুকুল ঘনিষ্ঠকে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তুলে নিয়ে যাওয়া। ফর্মুলা না-কি এমনি যে, দিল্লিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সভার কাজে মনোনিবেশের কারনে রাজ্য রাজনীতিতে সরাসরি মুকুলের হস্তক্ষেপের অভিযোগও থাকছে না। রাজ্য সংগঠন পরিচালনায় সভাপতির দক্ষতা ও কর্মকুশলতা প্রমানের সূযোগ সম্পূর্ণ খোলা রাখা হয়েছে। যদিও মূল কার্যনির্বাহী সমিতিতে প্রভাব বজায় রাখতে চানক্যের ঘুঁটি তৈরি। এক কথায়, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ‘বাংলার চানক্য’ মুকুলকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে চায় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। আর এইসঙ্গে বঙ্গ বিজেপির ঐক্যের ভারসাম্যটি যাতে কোনোভাবেই টলে না যায় সতর্ক নজর রয়েছে সেদিকেও। কিন্তু নির্বাচনমুখী বঙ্গ রাজনীতিতে কোন ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চান তিনি, সে ব্যাপারে নিজের হাতের তাস অবশ্য এখনই টেবিলে ফেলতে নারাজ মুকুল। এদিকে, দিলীপ ঘোষের অনুগত শিবিরের বক্তব্য, ‘দলের মধ্যে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা কারও থাকতেই পারে। কিন্তু যে যাই করুন, আসন্ন নির্বাচনে বাংলায় দলের মুখ কে হবেন, তা নিয়ে শেষ কথা বলবে দলের হাইকমান্ডই।’ এ নিয়ে বিজেপির এক সর্বভারতীয় নেতার মন্তব্য, ‘এ ব্যাপারে যথাসময়ে উপযুক্ত সিদ্ধন্তই নেবে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here