ভ্যাকসিন রথ রোধ করছে করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের প্রকোপকে

0
385

সংবাদদাতা, আসানসোলঃ- করোনার তৃতীয় ঢেউকে রোধ করার জন্য তিনি নিয়েছিলেন একগুচ্ছ পরিকল্পনা। যার মধ্যে অন্যতম বাড়ি বাড়ি গিয়ে করোনার টীকাকরণের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে মায়েদের বিশেষ করে আদিবাসী মায়েদের সচেতন করে তোলা। একইসঙ্গে মাস্ক – স্যানিটাইজার – হ্যান্ড ওয়াশ ও স্যোসাল ডিস্টেন্সের গুরুত্বকে তাদের সামনে তুলে ধরা। যে সমস্ত শিশু অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগছে তাদের পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো।

এবার তিনি নিলেন আরো বড়ো উদ্যোগ। শুধু সচেতনতা নয় ভ্যাকসিন রথ উদ্বোধনের মাধ্যমে বাস্তবে প্রতিটি মায়ের টীকাকরনকে সুনিশ্চিত করে পশ্চিম বর্ধমানের প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামগুলিকে সুরক্ষিত গ্রাম ( সেফ জোন) হিসাবে গড়ে তুলে করোনার তৃতীয় ঢেউকে রোধ করার এক অভিনব প্রয়াস নিয়েছেন ।তাঁর এই ভ্যাকসিন রথ ও সুরক্ষিত অঞ্চলের পাইলট প্রজেক্ট শুরু হয়ে গেলো জবার মালতী পাড়া, উপর জবা, বাউরি পাড়া ,মোড় পাড়া, কাঁঠাল পাড়া, স্কুল পাড়া সহ সংলগ্ন আদিবাসী এলাকায়।

করোনা রথ কী? সুরক্ষিত অঞ্চল বলতে তিনি কী বোঝাতে চাইছেন? কেনই বা এমন ব্যতিক্রমী ভাবনা তাঁর মাথায় এলো? এ বিষয়ে এই কর্মকাণ্ডের কান্ডারী রাস্তার মাস্টার তথা আসানসোলের জামুড়িয়ার তিলকা মাঝি আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দীপ নারায়ণ নায়ককে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন তাঁর এক বিরল অভিজ্ঞতার কথা। ইয়াশ ঝড় যে সমস্ত আদিবাসীদের কাঁচা বাড়িগুলিকে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তাদের সাহায্যের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে যখন সেটি পরিদর্শন করেন তখন কথায় কথায় আদিবাসী মায়েদের সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি জানতে পারেন গ্রামের প্রায় কোনো মায়ই ভ্যাকসিন নেয়নি।ভ্যাকসিন না নেওয়ার কারণটা ছিলো আরো বেশি বিস্ময়কর। আদিবাসী মা ঠুরকি মুর্মু,সন্তশি কোড়াদের ভ্যাকসিন না নেওয়ার কারণ ছিলো মৃত্যুভয়। তারপর থেকে কয়েক মাস ধরে তিনি আদিবাসী মায়েদের ভ্যাকসিন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও তার গুরুত্ব সম্বন্ধে সচেতন করেছেন। কিন্তু সমস্যাটা দাঁড়ায় ঠিক এরপর যখন মায়েরা ভীতি কাটিয়ে ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য আগ্রহী হয়। কিন্তু ভ্যাকসিন কোথায়? এরপর গর্ভবতী, প্রসূতি সহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়া মায়েদের ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করার জন্য যে সমস্ত আদিবাসী গ্রামগুলিতে তিনি পূর্ণাঙ্গ সার্ভে করেছিলেন ও কো-উইন এপে মায়েদের নাম নথিভুক্ত করেছিলেন তাদের ভ্যাকসিনকে সুনিশ্চিত করার জন্য তার তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন আখলপুর ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্বাস্থ্য আধিকারিকের কাছে জমা দেন।পরবর্তীকালে আধিকারিক তার কাজে সন্তোষ প্রকাশ করে ও তার গুরুত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে মায়েদের ভ্যাকসিনেশনের জন্য কুড়ি জুলাই দিনটি ধার্য করেন। এরপর আসে আরো বড়ো সমস্যা যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় তারা টাকা খরচ করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাবেন কীভাবে? এই করোনার পরিস্থিতিতে তাদের কাছে এক টাকার মূল্য এক লক্ষর সমান।তাদের এই জ্বলন্ত সমস্যাকে দূর করার জন্য রাস্তার মাস্টারের এই ভ্যাকসিন রথ , যাতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সকল মা সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে ভ্যাকসিন নিতে পারবেন ও পুনরায় গ্রামে ফিরতে পারবেন। তিনি আরো জানান এই ভ্যাকসিন রথ করোনার তৃতীয় ঢেউকে রোধ করার জন্য জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলি থেকে এভাবেই সকল মায়েদের টীকাকরণকে সুনিশ্চিত করবে এবং একটি গ্রামের সকল মা ভ্যাকসিনেট হলে সেই গ্রামটিকে সুরক্ষিত গ্রাম হিসাবে বিবেচনা করবেন।

আখলপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আধিকারিক ডা. অবিনাশ বেসরা , নার্স বিশাখা গরাই ও ফার্মাসিস্ট উত্তম কুমার মেট্যাকে তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। অন্যদিকে আধিকারিক ডা. বেশরা দীপনারায়ণবাবুর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন। মা কিরণি মেঝান, সূরজমণি সোরেনরা ভ্যাকসিন নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন ও সকল আদিবাসী মায়েদের ভীতি কাটিয়ে ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য একান্ত অনুরোধ করেন।এভাবেই পশ্চিম বর্ধমান জেলার জবা আদিবাসী অঞ্চলকে প্রথম সুরক্ষিত গ্রাম ও তিলকা মাঝি আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়কে রাজ্যে প্রথম বিদ্যালয় হিসাবে মায়েদের করোনার টীকা লাগিয়ে নজির সৃষ্টি করলেন রাস্তার মাস্টার ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here