কোভিড ডায়েরী/:-৩ সত্যম জানেন সত্যটাঃ আই.কিউ.সিটি’র পাড়া নির্যাতনে পিতৃহারা কোভিড ডাক্তার

0
7007

মনোজ সিংহ, মলানদিঘিঃ- ‘কোনো কৌশলই কি নেই- জীবনের একটি তারিখ যাতে সত্যি করেই মিথ্যে হয়ে যায়!’ হাসপাতালের অফিস চেম্বারে রাখা টেবিল-ক্যালেন্ডারটার দিকে তাকিয়ে গত দেড় মাসে বহুবারই এমন ভাবেন সত্যম। ডাঃ সত্যম রায়। সনকা কোভিড হাসপাতালের চিকিৎসক। তিনি যতবার এমন ভেবে অজান্তে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টেছেন, ২৫ জুলাই তারিখটা ততবারই নিষ্ঠুর হেসেছে। সময়টা এত নির্দয় কেন? যখনই ভেবেছেন, জবাব এসেছে অন্যভাবে, তার নিজের বা তার সতীর্থদের হাত ধরে, তখনই বুকের জমাট কান্না খানিকটা আনন্দাশ্রু হয়ে ঝরে পড়েছে দু’চোখ থেকে, কারন তিনি দেখেছেন বেঁচে ফেরার সব আশা খুইয়ে আসা মানুষগুলোর সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরার মিছিল। এই মিছিলের সামনে যে কথাটা কোনওদিনও বলতে পারবেন না সত্যম, সেটা আরো ভয়ঙ্কর সত্য।
‘এই লোকেদের ভালো করে ঘরে ফেরাতে গিয়ে খালি হয়ে গেছে তাঁরই ঘর।’ ২৫ জুলাই, ২০২০। পিতৃহীন হয়েছেন ডাঃ সত্যম রায়। শিক্ষিত, আধুনিক মানুষের পাড়ায় বাসা, তাও তার বাবার বুকে যখন মোচড় দিচ্ছে ব্যথা, দুয়ারে খিল এঁটে মুখ লুকিয়েছে গোটা পাড়া। কোভিড হাসপাতালের ডাক্তারের পরিবার গত ৫ মাস ধরে কার্যতঃ ‘অচ্ছুৎ’ ওই পাড়ায়। সংক্রমনের ভয়ে মৃত্যু যন্ত্রনায় কাতরাতে থাকা বৃদ্ধকে ঘর থেকে দু’পা দুরের হাসপাতালে পৌঁছে দিতে এগিয়ে আসেননি প্রতিবেশীরা। ওই ২৫ জুলাই, ২০২০। অসহায় পিতাকে বিনা চিকিৎসায় মরতে দেখলেন পাড়ায় ‘অচ্ছুৎ’ চিকিৎসক ছেলে। অতিমারির সময়ে সনকা কোভিড হাসপাতালে যিনি এবং যার সতীর্থ চিকিৎসক বন্ধুরা নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করে ‘মানুষ বাঁচাতে’ লড়ছেন জীবনপন, তাঁর বাবা’ই চলে গেলেন সমাজের বেপোরোওয়া অবহেলায়!
অথচ- ঘরের দু’পা দুরেই হাসপাতাল! একটু মানবিকতা হয়তো বাঁচাতে পারতো একটি জীবন। ডাঃ সত্যম রায় বাস করেন আই.কিউ.সিটি মেডিক্যাল কলেজের গা- লাগোয়া আবাসনে। যেখানে বসবাসের অন্যতম সুবিধাই হল নাকি হাতের তালুতে স্বাস্থ্য পরিষেবা। সেখানেই এম.সি.৩ পাড়ায় ডাঃ রায়ের বাস। চোখের জমাট অশ্রুবাস্প মুছে ডাঃ রায় বললেন, “কি হারালাম- শুধু আমি বুঝি। কোভিড-ডিউটি করার জন্য সমাজ আমায় এতবড়ো সাজা দিল!”। এই কোভিড হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ সুদীপ কুন্ডু’র পরিবারকে সইতে হয়েছে সামাজিক নির্যাতন। স্থানীয় বামুনাড়ার একটি আবাসনে তিনি ‘একঘরে’ হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কাঁকসা থানার পুলিশ আর আবাসন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে গত সপ্তাহে পরিস্থিতি খানিকটা স্বাভাবিক হয়েছে, বলে জানালেন ডাঃ কুন্ডু। সনকা কোভিড হাসপাতালের অনান্য চিকিৎসকেরাও কমবেশি সামাজিক বয়কটের শিকার। ডাঃ নিশান্ত কুমার, ডাঃ কৃষ্ণা রজক, ডাঃ করুণ কুমার, ডাঃ প্রশান্ত কুমার, ডাঃ সেখ আর.কাসিদেরা সব কিছু আর গায়ে মাখেন না। ডাঃ ওয়াই. ভেঙ্কটশ্বরালু , ডাঃ পঙ্কজ কুমার, ডাঃ এস.রাকেশ চন্দ্র’দের বুকেও রয়ে গেছে চাপা কষ্ট। তবে, তাদের কথায়, “একেকটা সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরা মানুষ আমাদের একেকটা কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। এসব কষ্ট তো আর কোনো মৃত্যুর চেয়ে বড় বেদনার নয়!” ।


“বেদনাটা আরো বেশি করে বুকে বাজে কেন জানেন? একটা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপনগরীতে ঘর, সবাই শিক্ষিত, বলেই জানতাম- কিন্তু আমার ওপর যে নির্যাতনটা ওঁরা করলেন, তাতে চিরকালের জন্য বাবা’কে হারালাম। এসব নিয়ে আর কার কাছে অভিযোগ করবো বলুন!”
কেউ হারালেন পিতা’কে, কেউ সামাজিক বয়কটের শিকার, কেউ কেউ সমাজের ‘ভয়ে’ পাড়ায় না ঢুকে, হস্টেলেই ‘স্বেচ্ছা-বন্দী’ পাঁচটা মাস। মারণ রোগ থেকে সুস্থ করার লড়াইটা চালাচ্ছেন যাঁরা, দলা পাকানো অসুস্থ মেঘে ঢাকা পড়ছে তাঁদেরই ঘর-পরিবার।

দায়’টা কার??

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here