কোভিড ডায়েরী/২:- অর্চনা, আরিফা, ভবানীরা’ই সনকার ‘রীনা ব্রাউন’

0
1111

মনোজ সিংহ, মলানদিঘিঃ- নিম্নচাপের অঝোর বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে ভাদ্রের মলিন বিকেল। মলানদিঘির জঙ্গলে ঠায় দাঁড়িয়ে, মাথা নুইয়ে অবিরাম ভিজে যাচ্ছে শাল, সোনাঝুরি, আকাশমনি। সনকা হাসপাতালের জানালা দিয়ে বাইরের পৃথিবীটাকে যেন কাকভেজা দেখায়, তখনই চোখ থমকে যায় পাশেই জল থৈ থৈ শিবপুর রোডে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সাইকেলে। ছোট্ট পুতুলের মতো একটি মেয়েকে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে ভিজছে তার বাবা। সিটে বসা পাঁচ বছরের শিশুকন্যা শূন্যে দু হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাইছে তার মা’ কে। বৃষ্টি ভেজা বাতাস ফুঁড়ে তার আকুতি যখন আছড়ে পড়ছে হাসপাতালের ঘরে, হস্টেলের খোলা জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজনের ভেজা চোখে তখন আরেক বৃষ্টি। নিঃশব্দ কান্নার বৃষ্টি। বুক ফেটে যায় অর্চনার, তবু কান্না চেপে, হাসি মুখে শিশুর দিকে যে অর্চনা হাত নাড়েন, তিনি মা । জানেন- রাস্তা আর হস্টেলের এই ২০০ মিটার পেরিয়ে মেয়েকে কোলে নেওয়া যাবে না এখনো। যেমন যায়নি গত পাঁচটা মাস। তাই নিয়ম করে ঠিক সময়ে হস্টেলের জানালায় দাঁড়িয়ে থাকেন ‘মা’ অর্চনা। বাকি সময়টা কোভিড হাসপাতালের ওয়ার্ডে যিনি ‘সপ্তপদী’ ছবির সেই রিনা ব্রাউন- একজন সচেতন, সহমর্মী সিস্টার।

কাঁকসা ব্লকেরই রূপগঞ্জের অর্চনা রুইদাস শিবপুর রোডে ধীরে ধীরে গড়িয়ে চলা সাইকেলের জল ছবি দেখতে দেখতে চোখ মুছলেন। বললেন “ওই আমার একমাত্র সন্তান। খুব ছোট তো তাই সব সময় খোঁজে আমাকে। কোভিড হাসপাতালের নার্স, তাই পাড়ায় ফেরা বারণ । এখন হস্টেলটাই আমার ঘরবাড়ি। তাও তো কপাল ভালো বলে মেয়েটাকে রোজ অন্ততঃ দেখতে পাই। বাকিরা তো সে সুযোগও পায়না । ওরা কেউ ঝাড়খণ্ডের, কেউ ওড়িষার।”


ওড়িষা’র ময়ূরভঞ্জ এর ভবানী মহান্ত, কেওনঝরের রানোজ মঞ্জুরি সাউ বা ঝাড়খণ্ডের গিরিডি থেকে আসা ব্রাদার রাহুল কুমার। পাঁচটি মাস কার্যতঃ দিনরাত এক করে যে লড়াইটা দিচ্ছেন সনকা কোভিড হাসপাতালে, করোনা যুদ্ধে দিগন্তের লাল আকাশে নীরবেই কেউ নিশ্চয় লিখে রাখছে তাদের নাম। দুর্গাপুর শহরের বেনাচিতির চন্দ্রানী সাহা, যাদব মন্ডল কাঁকসার জেমুয়া গ্রামের ইয়াসমিনা খাতুন, কলকাতার বেহালার মধুমিতা দেবনাথ বা হুগলির দাদপুর এর আরিফা খাতুনেরা ও যাদব মন্ডলরা, অর্চনার সন্তানের মুখ দেখেই ভুলে থাকেন ঘরের কথা। ওরা বললেন, “ওয়ার্ডে যারা ভর্তি আছেন ওরাও তো সন্তান পরিবার ছেড়ে রয়েছেন। ওদেরকে সুস্থ করে ঘরে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় মনে হয়- ওই একজন যাচ্ছে ঘরের লোকের কাছে । তখন সত্যিই খুব – খুবই ভালো লাগে । মনে হয় রোজ ৬ ঘন্টা পি.পি.ই কিট শরীর থেকে যে ঘাম নিংড়ে নিয়েছে , তার ফল এই জীবন ফিরে পাওয়া । ” এরই মাঝে রয়েছে আবার একটি নতুন, এক্কেবারে নতুন জীবনের কথা। যা নিয়ে খুশিতে উচ্ছল কোভিড হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স থেকে গ্রুপ ডি স্টাফ। গত কয়েক মাসের টানা উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ আর আশঙ্কার বিবর্ণ পরিবেশে হঠাৎ ঢুকে পড়ল এক রাশ টাটকা বাতাস। ২২ শে আগস্ট। ২১ বছরের এক মহিলা কোভিড আক্রান্ত রোগী কোমল সাউ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন আশঙ্কাজনক অবস্থায় । জীবন- মরণের সীমানা ছাড়িয়ে কোমল জন্ম দিলেন শিশুপুত্রের । কোভিড হাসপাতাল জুড়ে নবজাতককে ঘিরে ছড়িয়ে পড়ল দারুন উল্লাস। হাসপাতালের কোভিড ইনচার্জ ডাক্তার সুদীপ্ত কুন্ডুর কথায়, “ওই গর্ভবতী পেশেন্ট কে নিয়ে চিন্তায় ছিলাম আমরা সবাই। সুস্থ বেবি’র জন্ম হওয়ায় আমরা সকলেই স্বস্তি পাই। ”

হাসপাতালে এখন ভর্তি রয়েছেন ২০১ জন করোনা আক্রান্ত রোগী। যার মধ্যে ৪৬ জন লেভেল-৪ ও ১৪৮ জন লেভেল ৩ এর রোগী। হাসপাতাল সূত্রেই জানা গেল, ৩১ জন রয়েছেন অক্সিজেন সাপোর্টে এ । এদের লড়াইটা কঠিন । তবে অসম্ভব নয়। কারণ প্রশাসনকে পাঠানো দুর্গাপুরের সনকা কোভিড হাসপাতালের দৈনিক রিপোর্ট মোতাবেক, এখানকার রোগী মৃত্যু হার এখনো পর্যন্ত ১.৩৮ শতাংশ আর রোগীর সুস্থতার হার ৮৭.৭৩ শতাংশ। জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের এক শীর্ষ কর্তার মতে ” একজন করোণা আক্রান্ত রোগী সুস্থ হতে গড় এখনো ৬.৪৪ দিন সময় লাগছে।”

হাসপাতালটার গা ঘেষেই রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিকেল কলেজ। ভবিষ্যতের দেশকে যারা সাজাবে, চালাবে, দেবে নতুন দিশা, তাদের পাঠ -ভূমি মলানদিঘির এই শিক্ষাঙ্গন। সেই সুবাদেই দুর্গাপুরে সনকা হাসপাতালের গড়ে ওঠা। ভাবাই যায়নি , হিসেব কষে যার প্রফেশনাল জীবন গড়তে আসা- সেইটাই হয়ে দাঁড়াবে অতিমারির মৌসুমের ‘তীর্থভূমি’। সেখানে অর্চনা, মধুমিতা, ইয়াসমিনদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মানুষকে বাঁচানোর জব্বর ফাইটে প্রথম সারিতে উঠে আসা গ্রুপ-ডি কর্মী লালি বাউরী, শুভেন্দু হালদার, ময়ূর বাগদী, নমিতা রুইদাস, বাবুলাল বাগদীরা যে এভাবে লড়াইটা ভাগ করে নেবেন, গোড়ায় তা বুঝে উঠতে পারেননি সনকা হাসপাতালের কর্ণধার পার্থ পবি। তার কথায় , “আমাদের হাসপাতালটা কোভিড হাসপাতাল হওয়ার পর দেখলাম, সকলেই কেমন দায়িত্ববান হয়ে উঠেছেন। চ্যালেঞ্জটা ভাগ করে নিয়েছেন সকলেই। হাজার কষ্ট, যন্ত্রণা বুকে চেপে রেখে মানুষকে বাঁচানোর মহাযজ্ঞে শামিল সবাই।” পার্থ পবি যখন একথা বলছেন, অর্চনার ছোট্ট পরী তখন ফের সাইকেলে বাবার সাথে শিবপুর রোডের গড়ানে, সনকার হস্টেলের জানালায় যে দাঁড়িয়ে আছে তার মা।

আজ বৃষ্টি নেই, ঝকঝকে একটা বিকেল বেলা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here