ভোটের মুখে শিল্পশহরে অবৈধ বস্তি এলাকায় পাকা বাড়ি নির্মাণের হিড়িক

0
1367

নিউজ ডেস্ক, এই বাংলায়ঃ ভোট উৎসব আসন্ন, রাজ্য জুড়ে লোকসভা ভোটের প্রাক্কালে সাজো সাজো রব। সমস্ত রাজনৈতিক দলের মধ্যে চরম ব্যস্ততায় সরগরম রাজ্যের পরিবেশ। তা বেশ হয়েছে। ভোটের সময় সমস্ত রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থী নির্বাচন করবে, প্রচার করবে, ভোট যুদ্ধে জয়ের জন্য মরণপণ লড়াই চালাবে তাতে আর নতুন কী? নতুন আছে বৈকি। ভোটের আবহেই দুর্গাপুর জুড়ে আরও একশ্রেণির মানুষের দাপট বেড়েছে। একটু লক্ষ্য করলেই আপনাদের কাছেও বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে জলের মতো। সম্প্রতি লোকসভা ভোটের নির্ঘন্ট প্রকাশের পর থেকেই দুর্গাপুর জুড়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বস্তির ভেতরে স্থায়ী বাড়িঘর নির্মান। সে দুর্গাপুর স্টীল টাউনশিপ এলাকায় হোক বা শহরের স্টীল টাউনশিপ পার্শবর্তী এলাকায় হোক। একটু চোখ ফেরালেই নজরে পড়বে রাতারাতি গজিয়ে উঠছে নতুন নতুন পাকা বাড়ি। অবশ্যই দুর্গাপুর স্টীল প্ল্যান্ট অধিকৃত ও এডিডিএ অধিকৃত জায়গায় বেআইনিভাবে। এবার বোধহয় একটু একটু মনে পড়ছে। গত একমাসে দুর্গাপুরের কোনও বাসিন্দা যদি স্টীল টাউনশিপের নেহেরু স্টেডিয়াম ও তিলক রোড সংলগ্ন বস্তি এলাকা বা সি-জোন হয়ে ডেভিড হেয়ার রোড যাওয়ার রাস্তার পাশ দিয়ে যাওয়া-আসা করেছেন তারা খুব সহজেই ধরতে পারবেন এই প্রতিবেদন। কারণ মাত্র কয়েকদিনে নেহেরু স্টেডিয়াম সংলগ্ন ওই বস্তিতে রাতারাতি নতুন ঘর তৈরির হিড়িক পড়ে গেছে। ইতিমধ্যে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে ফ্লাই অ্যাশের ইট ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরী হওয়া বেশ কয়েকটি বাড়িও। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এরা আসলে কারা? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সদ্য গজানো ওই বস্তিগুলির দখল নিয়েছে বেশিরভাগই মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও তার আশেপাশের এলাকা থেকে উঠে আসা বেশ কিছু লোকজন। কিন্তু হঠাৎ করে ঠিক এইসময়ই দলে দলে দুর্গাপুরে আসার পেছনে কারণই বা কী? কী করেই বা বেআইনিভাবে হঠাৎ করে ডিএসপি বা এডিডিএ অধিকৃত জায়গায় পাকা বাড়ি তৈরীর অনুমতি পেয়ে যাচ্ছে এই বহিরাগতরা? সূত্র মারফৎ জানা গেছে, এইসমস্ত বহিরাগতদের বস্তি এলাকায় বসবাসের জন্য সম্পূর্ণ মদত জোগাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় ক্লাবগুলি। এখানে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক এতে তাদের আখেরে লাভ কী? আলবৎ লাভ আছে। কারণ সামনেই তো লোকসভা ভোট। আর নতুন লোক আমদানী মানেই নতুন ভোটার আর তার সঙ্গে ভোটের আগে প্রচার কার্য ও তার আনুসাঙ্গিক মোটা টাকা খরচের জন্য উপরি খোরাকি। জানা গেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-নেতৃত্বরা মোটা টাকার বিনিময়ে বেআইনিভাবে জায়গা দখল করে বাড়ি তৈরীর সুযোগ করে দিচ্ছে এইসমস্ত বহিরাগতদের। শুধু রাজনৈতিক নেতারাই নন, এর সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে আছেন ডিএসপির টাউন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ভবনের একাধিক কর্তা-ব্যক্তিরাও। এইসমস্ত বহিরাগতদের জন্য থাকার বন্দোবস্ত করে দিতে পারলেই তাদের পকেটেও ঢুকছে মোটা টাকা। বহুবার সাধারণ ইস্পাত নগরী বাসিন্দাদের তরফে উক্ত বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পরেও তারা বিষয়টি নিয়ে কোনোরকম আগ্রহ প্রকাশ করেন নি। গোটা বিষয়টি নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন তারা। আরও জানা গেছে, বস্তি এলাকায় আগত এইসব নতুন সদস্য যারা বিভিন্ন জেলা থেকে দুর্গাপুরে ঘাঁটি গেড়েছেন তাদের প্রত্যেকেরই নিজের নিজের জায়গায় ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড রয়েছে এবং সেখানে থাকাকালীন সেই জেলার সমস্ত সুযোগ-সুবিধাও তারা ভোগ করেছেন। এবার ভোটের মুখে নতুন ভোটার কার্ড নতুন বাসস্থান হলে অসুবিধার কী আছে। আর লোকসভা ভোটকে সামনে রেখে স্থানীয় বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতারাও ভোট ও মোটা টাকার লোভে এইসমস্ত বহিরাগতদের থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে ওই সমস্ত বস্তি এলাকায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেআইনী ঘর তৈরীই শেষ নয়, দুর্গাপুরের বিভিন্ন এলাকায় আগত ওই বহিরাগতরা পানীয় জলের প্রয়োজনে মাটির নীচ দিয়ে যাওয়া জলের পাইপ ড্রিল মেশিন দিয়ে ফুটো করে জলও বের করে নিচ্ছে, পাশাপাশি দুর্গাপুর ইস্পাত নগরীর বাসিন্দাদের নিজস্ব গাঁটের কড়ি খরচ করে নেওয়া বিদ্যুৎ চুরি করে ওই সমস্ত নতুন করে গজিয়ে ওঠা বস্তিগুলিতে পৌঁছে গেছে বিদ্যুতও। এবার তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, সবজেনেও প্রশাসন কেন নিশ্চুপ? উত্তর হল এক তো লোকসভা ভোটের আগে এদের খোঁচাতে চাইছে না কোনও রাজনৈতিক দলই আর দ্বিতীয়ত ভোটের আগে চূড়ান্ত ব্যস্ততা পুলিশ প্রশাসনের অন্দরে। কারণ ভোট চলাকালীন শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্ব যাদের ঘাড়ে রয়েছে তাদের এইসব দিকে লক্ষ্য রাখার এখন সময় নেই। ফলে এই সুযোগকেই পুরদমে কাজে লাগিয়েছে বহিরাগতরা। কিন্তু কে বলতে পারে, এই বহিরাগতরাই ভোটের সময় শহরে অশান্তির কারণ হবে না? কোথা থেকে এরা আসছে, এদের পরিচয় কি? কী করে এরা? এই বিষয়ে কোনও তথ্য কী আদৌ আছে প্রশাসনের কাছে? আর শুধুমাত্র ভোট পাওয়ার লোভে কী করে অজানা, অচেনা এই মানুষগুলোকে হঠাত করে শহরের বুকে বসবাসের ছাড়পত্র দিয়ে দিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলি তাও প্রশ্নাতীত। এই বস্তি নির্মানের ফলে ইস্পাত কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে গ্রিন বেল্ট হিসেবে চিহ্নিত করা জায়গাগুলি যেখানে কয়েকশো দামী দামী গাছ লাগানো হয়েছিল, এই কয়েকদিনে তাও নিশ্চিহ্ন হয়ে গড়ের মাঠে পরিণত হয়েছে। রাজ্য সরকারের তথা পুরসভার পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় শৌচাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং শুরু হয়ে গিয়েছে বেশ কয়েকটি জায়গাতে। কিন্তু এর সুযোগ শুধুমাত্র অবৈধভাবে দখল করা জমিতে বস্তিবাসীরাই ব্যবহার করছেন বরং সেই শৌচাগার নির্মানের অজুহাতে আরও বেশ কয়েকটি নতুন ঘরও বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। ভাবতেও অবাক লাগে, দুর্গাপুর ইস্পাত নগর প্রশাসন, দুর্গাপুর পুরসভা সবকিছু জেনেও কেন এখনও কোনও কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছেন না, কেনই বা সাধারণ ইস্পাতবাসী এইসব বস্তিতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বিল বহন করবেন? শহরের প্রধান সড়কগুলির পাশে এইধরনের বস্তি এলাকা গজিয়ে ওঠায় যেকোনো সময় সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন সাধারণ নগরবাসী, আর হচ্ছেনও। চ্যানেল এই বাংলায় এর পক্ষ থেকে ওইসব এলাকার কাউন্সিলারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারাও নিরুপায়, কারণ কিছু অসাধু নিচু স্তরের রাজনৈতিক নেতা ও ডিএসপি ইস্পাত প্রশাসনের কয়েকজন অসাধু আধিকারিকের জন্যই এইসমস্ত বস্তিগুলিতে বহিরাগতদের স্থায়ী বাড়িঘর বানানোর হিড়িক। ইস্পাত নগরীর বাসিন্দারা ভাবুন এবং এর প্রতিবাদের রাস্তা খুঁজুন।