“হুক্কা বার”-এর বিষাক্ত ধোঁয়ায় ছাত্র-জীবনে ঘনাচ্ছে অন্ধকার

0
1239

নিজস্ব প্রতিনিধি, দুর্গাপুরঃ এগোচ্ছে সময়, এগোচ্ছে সমাজ আর তার সঙ্গে এগিয়ে চলেছি আমরা, মানে দুর্গাপুর শহরবাসী। দুর্গাপুর শহর বলতে এখনও সকলের চোখে ধরা দেয় দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা আর তার সঙ্গে সবুজে ঘেরা আমাদের এই শহর। পশ্চিমবঙ্গের একাধিক বড় বড় শহরগুলির মধ্যে থেকেও আজও দুর্গাপুর শহর রাজ্যের মধ্যে এক অন্যতম জায়গা করে নিয়েছে, যার প্রধান কারণ হল চিরাচরিত শহরের বেড়াজাল থেকে বিচ্ছিন্ন আমাদের দুর্গাপুর আজও সবুজে ঘেরা আর কংক্রিটের মায়াজাল থেকে নিজেকে অনেকটাই আড়াল করে রাখতে পেরেছে বলে। কিন্তু তাসত্ত্বেও দুর্গাপুরের অগ্রগতি থমকে যায় নি। থমকে যায় নি দুর্গাপুরের গ্রিন সিটি এবং স্মার্ট সিটি হিসেবে আত্মপ্রকাশের স্বপ্নও। দুর্গাপুর পৌরনিগম এবং আসানসোল-দুর্গাপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটির যৌথ উদ্যোগে স্মার্ট সিটি হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে শহর দুর্গাপুর। কিন্তু এই শহর যখন আপন গতিতে নিজের লক্ষ্যে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে তখন এই দুর্গাপুর শহরের যুবসমাজ ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের অন্ধকারে। আর তাদের এই গতিতে এখনই লাগাম না দিলে দুর্গাপুর শহরের যুবসমাজ অদূর ভবিষ্যতে অচিরেই তলিয়ে যাবে নেশার জগতের অন্ধকারে, যার পরিণতি ভয়াবহ। এবার আসা যাক আসল ঘটনায়। দুর্গাপুর শহরজুড়ে ইদানীং বিভিন্ন ভিড়প্রবন এলাকাগুলিতে চোখ ফেরালেই নজরে পড়বে এক নতুন জিনিস। যার চলতি নাম “হুক্কা বার”। দুর্গাপুরের সিটিসেন্টারের অম্বুজা আবাসন এলাকা, জংশন মল এলাকা, বিগবাজার এলাকা, বিধাননগর, বেনাচিতি ও দুর্গাপুর স্টেশন সহ বিভিন্ন এলাকায় গেলেই ইদানীং চোখে পড়বে রঙিন ঝলমল আলোয় লেখা “হুক্ক বার”। কিন্তু কী এই হুক্কা বার? কি পাওয়া যায় এই হুক্কা বারের ভেতরে? বহু বছর আগে বিভিন্ন সিনেমা কিংবা সভ্রান্ত পরিবারে এইধরনের “হুক্কা” বা “গড়গড়া”র চল ছিল। সেই সভ্রান্ত পরিবারের সদস্যরা নিজেদের অবসর সময়ে তামাক বা ওই জাতীয় কোনও মশলা হুক্কায় ভরে তা সেবন করতেন। আধুনিক যুগের বিবর্তণের হুক্কাও অনেকটা সেইরকমই। যেখানে বিভিন্ন স্বাদের মশলা হুক্কায় ভরে তা পাইপ দিয়ে টেনে সেবন করা হয়। আর এই হুক্কার টানেই কি দিনের বেলা আর কি সন্ধ্যেবেলা স্কুল থেকে শুরু করে কলেজে পাঠ্যরত ছাত্র-ছাত্রীরা ছুটছে এই নেশার জগতে। অনেকেই হয়তো বলবেন হুক্কার মশলায় কোনও নিকটিন থাকে না তাই এই হুক্কা সেবনে শারীরিক কোনও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। কিন্তু এই তথ্য সম্পূর্ণ ভুল। বিশেষ এক সমীক্ষায় দেখা গেছে আধুনিক বিভিন্ন হুক্কা বারগুলিতে হুক্কার যে মশলা বা কয়েল ব্যবহার করা হয় তা মূলত চিন থেকে আমদানী করা হয় এবং এইসমস্ত জিনিস তৈরী করতে যে রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় তা শরীর কিংবা যুব সমাজের ফুসফুসের জন্য এক ধরণের মারণাস্ত্র। যার নিয়মিত সেবনে আমাদের ফুসফুসে যেমন ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে তেমনি মস্তিষ্কেও এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু তাই নয়, আজকাল বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, বার, চায়ের দোকান কিংবা হুক্কা বারের অন্দরে ঢুকলেই নজরে পড়বে মারণ ধোঁয়ার বিষাক্ত পরিবেশে ধুঁকছে স্কুল, কলেজের ছেলেরা, বাদ নেই মেয়েরাও। কেউ কি হলফ করে বলতে পারেন এই হুক্কা বারগুলিতেই অবৈধভাবে বিক্রি হচ্ছে না গাজা, চরস, নেশার ট্যাবলেটের মতো মারণ ড্রাগস? হয়তো হুক্কার মশলার আড়ালেই আজকের এই যুবসমাজ পরিবারের অজান্তেই সর্বনাশা ড্রাগসের নেশার জগতে প্রবেশ করছে, হয়তো এতদিনে নেশায় আসক্তও হয়ে পড়েছে। এর দায় কার? কি করে বিনা তদন্তে দুর্গাপুর শহরজুড়ে এহেন “হুক্কা বার”গুলি খোলার ছাড়পত্র পেয়ে যাচ্ছে ব্যবসায়ীরা? দুর্গাপুর পুরসভার বর্তমান দাপুটে মেয়র দিলীপ অগস্তি মহাশয়ই বা এবিষয়ে চুপ কেন? কেনই বা তিনি থাকতে দুর্গাপুর পুরসভার ট্রেড লাইসেন্স দফতরের তরফে এই ধরণের বেআইনি ব্যবসার অনুমোদন দিয়ে দেওয়া হচ্ছে? কেউ কী একবার ভেবে দেখেছেন এই সমস্ত হুক্কা বার থেকে সরকারী যে রাজস্ব পুরসভার কোষাগারে জমা হচ্ছে তার থেকেও কত বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে বর্তমান এই যুব সমাজের? নামমাত্র সরকারী রাজস্বের লোভে এই যুবসমাজের ভবিষ্যৎ আজ বিপন্ন। যেসমস্ত প্রশাসনিক আধিকারিকরা এইসমস্ত ব্যবসায়ীদের নেশাদ্রব্য বিক্রির কাজে মদত দিচ্ছেন তাঁরাও কি কোনোদিন খেয়াল রেখেছেন নিজের ছেলেমেয়েদের ওপর? টিউশন কিংবা কোচিং ক্লাসে যাওয়ার নাম করে তাদের সন্তানরা ঠিক কোথায় গিয়ে সময় কাটাচ্ছে সেই তথ্য কি তাদের কাছে আছে? সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি। সংসারের বোঝা টানতে গিয়ে আজকের দিনে বাবা-মা দুজনেই রোজগারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ছেন, সেই সুযোগেই বিভিন্ন বিত্তশালী পরিবারের বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সময় কাটাতে গিয়ে তাদের ছেলেমেয়েরাও সেই বিষাক্ত ধোঁয়ায় শেষ করছে নিজেদের জীবন। পুলিশ প্রশাসনই বা কেন নিশ্চুপ? যেখানে দুর্ঘটনা এড়াতে প্রত্যেক দিন রাস্তায় রাস্তায় “সেফ ড্রাইভ সেফ লাইফ” শ্লোগানের ঢাক পেটানো হয় পুলিশের তরফে তাদের চোখে কেন পড়ছে না এইসমস্ত অসাধু ব্যবসায়ীদের মাদকের কারবার? স্কুল-কলেজের পড়ুয়া কিংবা যুবক-যুবতীরা এইসমস্ত হুক্কা বার থেকে নেশাগ্রস্ত হয়ে দুরন্ত গতিতে বাইক নিয়ে ছুটছে, ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে মূলত এই পড়ুয়ারাই। কী লাভ তাহলে সাধারণ মানুষের কষ্টের উপার্জিত ট্যাক্সের টাকা খরচ করে “সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ” প্রকল্পের ঢাক পেটানোর? বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা গেছে, দুর্গাপুর শহর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এইসমস্ত হুক্কা বার থেকে প্রত্যেক মাসে মোটা টাকা মাসোহারা পৌঁছে যায় বিভিন্ন থানায় আর সেই কারণেই রাস্তার মোড়ে মোড়ে গাড়ি দাঁড় করিয়ে চালান কাটা হলেও এইসমস্ত অসাধু ব্যবসায়ীরা পুলিশের ছত্রছায়ায় তাদের মাদক দ্রব্যের ব্যবসা বাড়িয়েই চলেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে কোনও প্রধান সড়কের ৫০০ মিটারের মধ্যে মদের দোকানের লাইসেন্স দেওয়ায় নিষেধাজ্ঞা আছে, কিন্তু এইসমস্ত হুক্কা বার চালানোর বিষয়ে সরকারী কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই চ্যানেল এই বাংলায়-এর তরফে সমস্ত অভিভাবকদের জন্য এই সতর্কবার্তা। শত ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের সন্তানদের প্রতি দায়বদ্ধ হোন, তাদের গতিবিধির ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখুন। এটাই হয়তো আমাদের কাছে একমাত্র রাস্তা বর্তমান প্রজন্মকে নেশার অন্ধকার জগত থেকে সুস্থ সমাজে ফিরিয়ে আনার। তা নাহলে অদূর ভবিষ্যতে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে ভয়াবহ পরিণতি। চ্যানেল এই বাংলায় এর পক্ষ থেকে এই বিষয়ে তদন্ত চালাতে গিয়ে আমরা প্রায় ৫০টির ওপর হুক্কা বারের সন্ধান পেয়েছি। রাজ্যের প্রশাসন, দুর্গাপুর পৌরনিগম, আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট ও সমাজসেবী সংগঠনের কর্মকর্তাদের কাছে কাতর আবেদন চ্যানেল এই বাংলায় জানাই ভবিষ্যৎ যুবসমাজকে বাঁচাতে অবিলম্বে আওয়াজ তুলুন ও গর্জে উঠুন। বন্ধ হোক এই মারণ নেশার ব্যবসা, যাতে আমাদের ছেলে-মেয়েরা এক সুষ্ঠ পরিবেশে বেঁচে উঠতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here