চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস কী কালো টাকার উৎস?

0
1165

নিউজ ডেস্কঃ জীব মাত্রই মরণশীল। জন্ম যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে মৃত্যুও। আর এই জন্ম-মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই এই ধরা ধামে মনুষ্য জগত শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে হাজার হাজার বছর ধরে বিরাজ করে আসছে। কিন্তু যেহেতু সৃষ্টির অমোঘ নিয়ম “জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা রবে”, তাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের ক্ষেত্রেও এই একই নিয়ম কার্যকর। এই পৃথিবীতে কেউই অমর নন। কিন্তু তাসত্ত্বেও বর্তমান আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র এতটাই উন্নত যে বর্তমান পৃথিবীতে শুধুমাত্র চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির জন্যই মানুষের মৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে অনেকটাই। কিন্তু তাই বলে শুধুমাত্র চিকিতসাবিজ্ঞানের উন্নতি এর প্রধান কারণ নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে দক্ষ চিকিৎসক তথা ডাক্তাররাও প্রশংসার যোগ্য। মানুষ মাত্রই নিজের কঠিন সময়ে যেমন ভগবানের ওপর ভরসা করেন তেমনি এই চিকিৎসকদেরকেই আমরা ভগবানের আরেক প্রতিরূপ বলে মনে করি। এহেন ভগবানের প্রতিরূপ চিকিৎসকদের ছাড়া জীবন অতিবাহিত করা অসম্ভব। জনসংখ্যার দিক থেকে বর্তমানে ভারতবর্ষ পৃথিবীর বাকি দেশগুলির মধ্যে প্রথম সারিতেই রয়েছে। বর্তমানে ১৩০ কোটির দেশ এই ভারতবর্ষে কমবেশি প্রায় ৩৭০টি সরকারী ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে। যেখান থেকে প্রত্যেক বছরে প্রায় ৪৯ হাজার ৮০০ জন পড়ুয়া ডাক্তারি পাশ করেন। বিশ্বের আর কোনও দেশে প্রত্যেক বছরে এত পরিমাণ চিকিৎসক তৈরী হয় না। ২০১৬ সালের মেডিক্যাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ভারতবর্ষে বর্তমানে প্রায় ৯ লক্ষ ৮৯ হাজার অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসক রয়েছেন। কিন্তু তাসত্ত্বেও আশ্চর্যজনকভাবে আনুপাতিক হারে ভারতে প্রতি ৯২১ জন পিছু একজন চিকিৎসকই শুধুমাত্র রয়েছেন। এই পরিসংখ্যান থেকে পরিষ্কার, যে চিকিৎসকের অভাব এখনও রয়েছে ভারতবর্ষের জনগণের চিকিৎসার জন্য। এরই মধ্যে সরকার পরিচালিত হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলিতে নিয়োজিত রয়েছেন দক্ষ চিকিৎসক ও তারা নিরন্তর সাধারণ জনগণের সেবার উদ্দেশ্যে নিজেদেরকে উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু এমন অনেক চিকিৎসক রয়েছেন যারা সরকারী চাকরি পরিত্যাগ করে নিজ নিজ চেম্বার, ওষুধের দোকান, পলিক্লিনিক, প্যাথোল্যাব বা নিজ বাসভবনে দৈনন্দিন হাজার হাজার মানুষের চিকিৎসা করে চলেছেন নিরন্তর। যদি কোনও রোগী সরকারী বা বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি বা চিকিৎসা করান তার একটি আর্থিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। কিন্তু যেসমস্ত চিকিৎসকেরা নিজ নিজ চেম্বার, ওষুধের দোকান, পলিক্লিনিক, প্যাথোল্যাব বা বাসভবনে দৈনন্দিন হাজার হাজার মানুষের চিকিৎসা করেন তারা কেউ রোগী বা রোগীর পরিজনকে কোনোরকম আর্থিক লেনদেনের ক্যাশ মেমো বা রিসিট দেন না। স্বভাবতই যে পরিমাণ অর্থ তারা রোজগার করেন এই রোগী বা রোগীর পরিজনের কাছ থেকে তার কোনও লিখিত প্রতিরূপ বা হিসাব থাকে না। সামান্য একটা উদাহরণ দিলে একজন চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বার থেকে আসা মোটা টাকার হিসেব পরিষ্কার হয়ে যাবে। ধরে নেওয়া কোনও এক চিকিৎসক সপ্তাহে চার দিন কোনও চেম্বার, ওষুধের দোকান, পলিক্লিনিক, প্যাথোল্যাব বা বাসভবনে মোট ২০ জন রোগীর চিকিৎসা করেন এবং তাদের কাছ থেকে ভিজিট বাবদ মাথাপিছু ৩০০ টাকা করে সাম্মানিক নেন। তাহলে সেই চিকিৎসকের মাসে একটা চেম্বার থেকে মাসিক আয় দাঁড়ায় প্রায় এক লক্ষ টাকা। এবার ভেবে দেখুন এই এক মাসে একটা চেম্বার থেকে সেই চিকিৎসকের আয় যদি এক লক্ষ টাকা হয় তাহলে তার সমস্ত প্রাইভেট চেম্বারের ভিজিট বা সাম্মানিক সবমিলিয়ে সেই আয়ের পরিমাণ কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে? তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কি সত্যি সত্যি তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ছে? নাকি পুরোটাই কালো টাকা হিসেবে ঘরেরই কোনও আলমারিতে সঞ্চিত হচ্ছে বছরের পর বছর? চ্যানেল এই বাংলায় অনুসন্ধানে নেমে জানতে পেরেছে এই বিপুল পরিমাণ কালো টাকা এইসব চিকিৎসকেরা বিভিন্ন বেনামী সম্পত্তি বা জমি, স্বর্ণালঙ্কার ও সুদ খাটানোর কাজে ব্যবহার করছেন, যার প্রমাণ পাওয়া যায় শহরের কিছু নামী ব্র্যান্ডেড স্বর্ণালঙ্কার প্রস্তুতকারক সংস্থায় তাদের কেনা গয়নার হিসেব থেকে। বিভিন্ন সূত্র মারফৎ এও জানা গেছে দেশে ও বিদেশে এইসমস্ত চিকিৎসকদের বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট বা বাংলোও রয়েছে। এমনও অনেক চিকিৎসক রয়েছেন যারা বিভিন্ন ব্যাবসায়ীদের সঙ্গে শেয়ারে কিন্তু অলিখিত ভাবে একাধিক বেসরকারী হাসপাতাল ও নার্সিংহোম তৈরী করে সেখান থেকেও চুটিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন অথচ শহরের একাধিক সরকারী হাসপাতালগুলি ধুঁকছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের অভাবে। সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গরীব ও মধ্যবিত্ত রোগী ও তাদের পরিবার পরিজনেরা। একদিকে যখন দেশের মানুষ চিকিৎসার প্রয়োজনে হন্যে হয়ে বিভিন্ন সরকারী হাসপাতালে ঘুরছেন রোগীর জন্য একটি বেড পাওয়ার আশায় তখন একশ্রেণীর চিকিৎসকেরা লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করছেন, ভুলে যাচ্ছেন তাদের এমবিবিএস পাশ করে ডাক্তার হিসেবে নেওয়া শপথ বাক্যও। ভুলে যাচ্ছেন তারাও এই ভারতবর্ষেরই নাগরিক এবং সাধারণ মানুষের দেওয়া সরকারী ট্যাক্সের টাকাতেই তারা বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ডাক্তারী পাশ করেছেন। তাদেরও এখন ভাবার সময় এসেছে এবং তাদেরও প্রমাণ করতে হবে তারা দেশকে ভালবাসেন, দেশের মানুষকে ভালবাসেন ও একজন সৎ দেশপ্রেমিকও বটেন। বহু বছর আগে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে মহানায়ক উত্তম কুমার অভিনীত একটি অত্যন্ত শিক্ষামূলক চলচ্চিত্রের নাম “অগ্নীশ্বর” দেখার জন্য সেইসব চিকিৎসকদের প্রতি চ্যানেল এই বাংলায়-র কাতর আবেদন। দেশের শত্রু শুধু দেশের সীমার বাইরেই বাস করে না, করে দেশের ভেতরেও, আর এইসব শত্রুদেরকে চিহ্নিত করে অবিলম্বে তাদের কৃতকর্মের উচিত শাস্তি দিতে হবে। মনে রাখবেন আজও মানুষ চিকিৎসকদেরকে ভগবানের রূপ হিসেবে মেনে চলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here