ডিএসপি টাউনশিপে রাজনৈতিক দলের ঝান্ডা লাগিয়ে কোয়ার্টার দখল করে ভাড়া খাটানোর রমরমা ব্যবসা

0
2913

নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুরঃ সারা দেশজুড়ে চলছে করোনা আতঙ্ক। রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশকর্মী ও প্রশাসনের কর্তাদেরকে এই রোগের মোকাবিলায় শক্ত হাতে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। তার নির্দেশ মতন পুরো রাজ্য জুড়ে চলছে তৎপরতা। এরই মধ্যে কয়েক দিন আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন যে সমস্ত দুর্নীতিগ্রস্থ মানুষ তৃণমূল কংগ্রেস পরিচয় দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদেরকে অবিলম্বে চিহ্নিত করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী সেই নির্দেশমতো বিভিন্ন জেলার পৌরসভা ও পঞ্চায়েত গুলিতে বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতা নেত্রীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকায় তদন্ত শুরু হয়েছে। তাদের দেওয়া হয়েছে দলের পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশও। এর থেকে পরিষ্কার যে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে দুর্নীতিগ্রস্ত ঘুঘুর বাসা ভাঙতে উদ্যোগী হয়েছেন।

এদিকে শিল্প শহর দুর্গাপুরের সবথেকে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা তার নিজের টাউনশিপে আজ অতিথির মতন ব্যবহার পাচ্ছে বলে আভিযোগ। ডিএসপি টাউনশিপ মূলত ইস্পাত কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের জন্য আবাসন গুলি বন্টন করাছিল। কিন্তু কালের নিয়মে বহু শ্রমিক একসাথে অবসর নেওয়ায় প্রায় শতাধিক কোয়াটার খালি হয়ে পড়ে ছিল। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণী দুষ্কৃতীরা রাজনৈতিক দলের পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডে খালি থাকা ডিএসপি’র কোয়ার্টার গুলি দলীয় ঝান্ডা লাগিয়ে দখল করে রেখেছে । সেইসব দখল করে রাখা কোয়ার্টারগুলি তারা পুনরায় সাধারণ মানুষকে বা বহিরাগতদেরকে ভাড়া দিয়ে মোটা টাকা রোজগার করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার এ-জোন, বি-জোন, সি-জোন এলাকাতে মোট চার থেকে পাঁচটি তৃণমূল পরিচালিত দুর্গাপুর পৌর নিগমের ওয়ার্ড পড়ে। কমবেশি প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে এই ব্যবসা চলছে রমরমিয়ে। যে ওয়ার্ডে যে রাজনৈতিক দলের জোর বেশি, সেই ওয়ার্ডে সেই রাজনৈতিক দলের নাম করে দেদার কোয়াটার দখল করে তা বহিরাগতদেরকে মোটা টাকা ভাড়া দিচ্ছেন একশ্রেণী দুষ্কৃতিরা।

বেশ কয়েকদিন আগে এ নিয়ে তৃণমূলের ১ নম্বর ব্লকের আহ্বায়ক তথা ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি জয়ন্ত রক্ষিত-সহ আরও কয়েকজন তার ওয়ার্ডে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন। তিনি কথা বলেন দখল হওয়া সেইসব কোয়াটারগুলিতে থাকা মানুষদের সাথে। তিনি এবং তাঁর তদন্তকারী দলের কর্মীরা জানতে পারেন যে শুধু তাদের ওয়ার্ডে রয়েছে প্রায় ৮ টীর ওপর অবৈধ দখল করা কোয়াটার। যা কী না বহিরাগত লোককে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। তিনি জানতে পেরেছিলেন যে তাদেরকে এখানে রাখার বদলে মোটা টাকা নেওয়া হয় মাসিক ভাড়া হিসেবে । যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অপরাধ মূলক কাজ। যদিও জয়ন্ত বাবু এই অভিযোগগুলি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার কথা বলে ছিলেন। নিজের দলের নাম না করে তিনি বিরোধী বিজেপি দলের কর্মীদের উদ্দেশ্যে তার সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিয়ে ছিলেন এই কোয়াটার দখলের ব্যাপারটিতে।

অন্যদিকে বিজেপির জেলা সভাপতি লক্ষণ ঘড়ুই বলেন অভিযোগটি হাস্যকর। তৃণমূলের লোকজনেরাই গোটা টাউনশিপ জুড়ে বেআইনিভাবে কোয়াটার দখল করে তাতে দলীয় ঝান্ডা লাগিয়ে তা রীতিমতো ভাড়া দিয়ে ব্যবসা চালু করে দিয়েছে। আর নিজেদের দোষ ঢাকতে কোন কিছু না পেয়ে বিজেপির ঘাড়ে দোষ চাপানোর মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাতে খুব বেশি লাভ হবে না| কারণ এলাকার মানুষজন জানেন, কারা এই কোয়াটারগুলি দখল করেছে এবং কারা বহিরাগতদের কে ভাড়া দিয়ে এই কোয়ার্টারে বসবাস করার জন্য মোটা টাকা নিচ্ছেন।

তিনি আরো অভিযোগ করেন যে তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের কে এইসব ঘর ভাড়া দিয়ে দেদার রোজগার করছেন ও যেকোনো নির্বাচনের সময় তাদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে অসামাজিক কার্যকলাপের জন্য। তবে চ্যানেল ‘এই বাংলায়’ তদন্তে উঠে এসেছে যে টেগর প্লেসের(৬/৭)বাংলো কোয়ার্টাটি বিজেপির দলীয় পতাকা লাগিয়ে সেখানে অফিস করা হয়েছে। এই বিষয়ে লক্ষণ বাবুকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান তারা ডিএসপি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি চেয়েছিলেন এই ঘরটিতে পার্টি অফিস করার জন্য। সেই মোতাবেক দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার পক্ষ থেকে তাদেরকে মৌখিকভাবে অনুমতি দেওয়া হয়েছে ওই ঘরটিতে পার্টি অফিস করার জন্য। কিন্তু কোন রূপ অ্যালটমেন্ট অর্ডার বা লিখিত কাগজ তাদের কাছে নেই।

কোয়াটার নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক তার মধ্যেই ‘এই বাংলায়’র প্রতিনিধিরা যখন ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরছিলেন এইসব খবর জোগাড়ের তাগিদে, তখনই নজরে আসে দুর্গাপুরের ডিএসপি টাউনশিপ এলাকার আট নম্বর ওয়ার্ডের দিকে। এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাননীয় মৃগেন পাল মহাশয় তিনি আবার দুর্গাপুর পৌরনিগমের চেয়ারম্যানও। তার আট নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছে দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানায় কর্মরত বেশকিছু উচ্চ আধিকারিকের থাকার জন্য টেগর প্লেস বলে একটি জায়গা। সেই টেগর প্লেসেই একটি বাংলো(৬/২) ইতিমধ্যেই দখল করে তাতে দলীয় ঝান্ডা লাগিয়ে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে তৃণমূলের কার্যালয় করে বসে আছেন বেশ কয়েকজন তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থিত পরিচয় দেওয়া লোকজন। এখানে অন্য একটি বাংলোতে আইকর বিভাগকে দেওয়া হয়েছে তাদের অতিথি নিবাস করার জন্য। আর ঠিক তার সামনের বাংলোটি দখল করে নেওয়া হয়েছে দলীয় পতাকা ও মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর ছবি কাট-আউট লাগিয়ে। এই বিষয়ে পৌরনিগমের চেয়ারম্যান তথা ওয়ার্ড কাউন্সিলর মৃগেন পাল মহাশয় কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে যদি কেউ তা করেছে তার সঙ্গে তৃণমূল দলের কোনো যোগাযোগ নেই। সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এই কাজ করা হয়েছে। আমি ব্যাপারটি খোঁজ নিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেব ।”

চ্যানেল ‘এই বাংলায়’র পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তদন্তে উঠে এসেছে দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার আবাসনের মধ্যে প্রায় এক হাজারেরও বেশি, এমন আবাসন আছে যেখানে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের ঝান্ডা লাগিয়ে দখল করার পর বহিরাগতদেরকে মোটা টাকা দিয়ে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত বিষয় নিয়ে আমরা দুর্গাপুর ডিএসপি কারখানার মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক বিবি রায় মহাশয়কে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, “আমাদের অনেকগুলি আবাসন ইতিমধ্যে দখল হয়ে গিয়েছে। আমাদের টাউন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিপার্টমেন্ট চেষ্টা করে চলেছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেইসব ঘরগুলিকে যাতে দখল মুক্ত করা যায়।”

বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে কোনও দিনই তেমন গা করেননি তৃণমূল নেতৃত্ব সহ বাকি সব রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব। বহিরাগতদের জন্য এলাকার পরিবেশও খারাপ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ডিএসপি-র বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মীরা। তবে কী রাজনৈতিক কিছু বিধিনিষেধ আসছে যার জন্য সম্পূর্ণ করা যাচ্ছে না বা দখল মুক্ত করা যাছে না এইসব কোয়ার্টার গুলি?

চ্যানেল ‘এই বাংলায়’র পক্ষ থেকে আমাদের পরবর্তী প্রতিবেদনে আমরা আরও বেশ কয়েকটি কোয়াটার দখলের ঘটনার খবর করব ও আপনাদের কে জানাব সেই এলাকার কাউন্সিলরদের বক্তব্য এই বিষয়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here