মহামারীর ক্ষনে ব্রিটেনের দুর্গাপুজো

0
379

সুমনা আদক, লন্ডনঃ- বিশ্বজুড়ে অতিমারীর মধ্যে, সময় গড়িয়ে যাওয়ার সাথেই প্রকৃতিজুড়ে আগমনী বার্তা ‘মা আসছেন ‘। মায়ের কাছে এখন সবার প্রার্থনা শুধু একটাই অশুভের নাশ, মহামারী থেকে মুক্তি।
বাঙালির শারদআনন্দের রেশটা অনেককাল আগেই বঙ্গদেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছেছিলো প্রবাসে, তাই বাঙালির কার্নিভাল এখন আন্তর্জাতিক বললেও ভুল হবে না। দুহাজার বছরটাইতো উলটপুরাণ, পুজো মানে এতো আনন্দ এতো হুল্লোড়, উচ্ছাস, আবেগ এ বছরে সব বেরঙিন। দোকান থেকে শপিং মলে কেনাকাটার ব্যাস্ততা, ঠাসাঠাসি ভিড় ঠেলে রাত জেগে ঠাকুর দেখা , খাওয়াদাওয়া কোনটা মণ্ডপে কোন প্রতিমা ভালো, কে পাবে শারদসম্মান এবারে কোনোখানেই মাতামাতি নেই, এখন শুধু ভালোয় ভালোয় কেটে গেলেই হলো।

কলকাতার পাশাপাশি প্রবাসেও হুজুগটা অনেক কম, মোটামুটি ভাবে বলা যায় গোটা ইউনাইটেড কিংডম এ দুর্গাপুজোর সংখ্যাটা ষাটেরও বেশি, তবে এ বছরের হিসেবটা বলছে তাঁদের মধ্যে নাকি মাত্র বারো থেকে পনেরো টা পুজো সম্পন্ন হতে চলেছে এবারে। শোনা যাচ্ছে কিছু পুজো কমিটি নাকি আবার ডিজিটালের মাধ্যমে পুজো দেখার ব্যবস্থা করেছেন,কিন্তু বড়ো ছোট মিলিয়ে মোটের উপর অনেক পুজোই বন্ধ এখানে। যেটা ব্রিটেনের অনেক বাঙালির স্বপ্নভঙ্গ বলা চলে, বার্মিংহ্যাম, সাউথ লন্ডন, কেমব্রিজ,আবার্ডিন, কার্ডরিপ বাঙ্গালী কালচারাল এসোসিয়েশন, এদিকে স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ, গ্লাসগো এরকম আরো কিছু পুজো বন্ধের খবরটা অনেকের কাছে একেবারে বীণা মেঘে বজ্রপাতের মতো। আবার ওয়েলসের ঘট পুজো, জানান দেয় পুজো আসছে। তবে ক্যামডেনের পুজো উদ্যোগতারা এবছর উমার আরাধনায় ব্যাস্ত থাকবেন, ওনারা চেষ্টা করছেন শারদ উৎসবের সাথে বাঙালির সাবেকিয়ানায় কোনো ত্রুটি না হয়ে যেন ভালোভাবে সমাপ্ত হয় পুজোটা। হোক না ছোট “আদি শক্তি “ও তাদের মণ্ডপে উমায় আরাধনায় ব্যাস্ত থাকবেন এবারে। “মিডল্যান্ড পুজো কমিটি ” প্রবাসী সংঘ, ব্রিস্টলে পুজো হচ্ছে এবারে। এবারে ক্যামডেনের পুজো কমিটির প্রেসিডেন্ট ডঃ আনন্দ গুপ্ত জানান বাঙালির সারা বছরের একটাইবড়ো উৎসব, জনসমাগমের সীমাবদ্ধতার দিকটা বজায় রেখে এবছর আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি ভালোভাবে সম্পন্ন করার।


তবে ব্রিটেনের বেশিরভাগ পুজোতেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিন্তু ব্রাত্য নয়। অনেক পুজো কমিটি তাদের প্রমোশনটা এভাবেই সেরে নিয়েছেন। ব্রিটেনে লোকডাউন উঠে গেলেও এই সময়ে একে ওপরের সাথে সাক্ষাৎ হওয়াটা খুব একটা সহজ নয়, তাই বেশিরভাগ অনুষ্ঠানই সম্প্রচারিত হচ্ছে অনলাইনের মাধ্যমে, নিজের বাড়িতে যে যার মতো পারফরমেন্স করে সেগুলো টেলিকাস্টও হচ্ছে। কিছু পুজো কমিটি আবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা নিলেও সেখানে দশ জনের বেশি অংশগ্রহণ করতে পারবে না এমনটাই শোনা যাচ্ছে। কিছু পুজো উদ্যোক্তা আবার মনোরঞ্জনের জন্য কলকাতার নামি দামী শিল্পীদের দিয়ে তাদের সোশ্যাল মিডিয়ার পেজে একাধিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করেছে বারে বারে। আসলে বাস্তব এটাই যে এবছরের পরিস্থিতিই সবার মধ্যে এমন সামাজিক ব্যাবধানের প্রধান কারণ।
উলোটপুরানের বছরে উমার বোধন থেকে বিজয়াসম্মেলনী সবেতেই সেই বিষন্নতা। উৎসবের আমেজেও এক রোদনভরা বিষাদের সুর। এই তো গত বছরের স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গের পুজোর স্মৃতি গুলো এখনো কেমন সতেজ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায় পাতায়। আগের বছর এমন দিনের ব্রিটেনের প্রতিটা মণ্ডপএর ছবিগুলো মিলে গিয়েছিলো কখনো বাগবাজার সার্বজনীন কখনো আবার নাকতলার উদয়ন সঙ্গের সাথে, সাতসমুদ্র পার করে একটুকরো কলকাতা উঠে এসেছিলো শেতাঙ্গদের প্রাচীন শহরে। এতদিনের একফ্রেমে জড়িয়ে থাকা জীবন্ত স্মৃতিগুলোর ভিড়ে ২০২০ এবারের দুর্গাপুজোর ছবিগুলো একটু বেমানান লাগছে, যা দেখে প্রবাসী বাঙালিদের চোখের কোনায় চিক চিক করছে জল। তবে এবারটা যাই হোক, আশা শুধু একটাই আসছে বছর আবার হবে !!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here