‘সিল’ করা হল দুর্গাপুর ক্লাবঃ অতিমারিতে নিয়ম ভেঙে বার্থডে পার্টির পর করোনা আক্রান্ত গহনা ব্যবসায়ী

0
8490

মনোজ সিংহ, দুর্গাপুরঃ- কোভিড-অতিমারির মাঝেই সরকারি নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে একটি জন্মদিনের ‘জলসা’র অনুমোদন দিয়ে এবার কাঠগড়ায় শহর দুর্গাপুরের ‘এলিট’ দের অবাধ মেলা মেশার ঠিকানা ‘দুর্গাপুর ক্লাব’। আর এই আইন ভাঙা কে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ওই ক্লাবের পরিচালন সমিতির কয়েকজন কর্মকর্তা। কারন, এক শিশুর জন্মদিনের ওই ‘জলসা’র পরই, শিশুটির দাদু কোভিড আক্রান্ত হন। ওই ‘জলসা’য় গুচ্ছ গুচ্ছ আত্মীয়ের সমাগমও ঘটে দুর্গাপুর ক্লাবে।
ওই শিশুর পরিবার দুর্গাপুরের বেনাচিতির প্রভাবশালী সোনা-গহনার ব্যবসায়ী। শুক্রবারই ওই শিশুর দাদু’র কোভিড সংক্রমন নিশ্চিৎ হয় ও তাকে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সরকারিভাবে সিল করা হয় তার সোনা-গহনার শো-রুম। পরিবারের বাকি সদস্যদের লালারস পরীক্ষাও হয়। এই নিয়ে বিস্তর চাঞ্চল্য ছড়ায় বেনাচিতি, ভিড়িঙ্গী, সিটিসেন্টার সহ ইস্পাত নগরীতেও। কারন, সম্ভাব্য সংক্রমনের কেন্দ্রস্থল দুর্গাপুর ক্লাবে নিয়মিত যাতায়ত রয়েছে ইস্পাত কারখানার পদস্থ আধিকারিকদের, আর কর্মস্থলে সেই সব আধিকারিকদের সংস্পর্শে আসেন শ’য়ে শ’য়ে ইস্পাত কর্মী।


গত ১০ জুলাই বেনাচিতির সোনা-গহনা কারবারি পরিবারটি তাদের শিশুর জন্মদিনের পার্টির জন্য দুর্গাপুর ক্লাব ‘বুক’ করে। কোভিড-অতিমারির সময় কেবলমাত্র বিবাহ ও মৃতের পারলৌকিক ক্রিয়ার জন্য সীমিত লোকজন নিয়ে অনুষ্ঠান করার ছাড়পত্র দিয়েছে সরকার। কিন্তু, কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা- প্রভাবিত ওই ক্লাবে, সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কার প্রশ্রয়ে জন্মদিনের পার্টি করা গেল, এ নিয়ে খোঁজ নিচ্ছে পুলিশও। শনিবার দুর্গাপুর পুলিশের ডেপুটি কমিশনার অভিষেক গুপ্তা জানান, “ওই ব্যাপারে আমরা বিস্তারিত খোঁজ নিচ্ছি।” ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই ব্যবসায়ীর শো-রুম সিল করে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে সরকারি ইস্পাত কারখানার বড় বড় পদস্থ কর্তারা যে ক্লাবের মাথা, সেই ক্লাবে আইন ভাঙার কাজ ঘটল কি ভাবে? গোটা পরিস্থিতি আঁচ করে, শনিবার ক্লাবের সচিব অনুরাধা.এস আইয়ার তড়িঘড়ি একটি নোটিশ জারি- করে স্বীকার করে নেন এক সদস্য’র কোভিড সংক্রমনের কথা এবং শনিবারের ওই বিজ্ঞপ্তিতেই ফের অনির্দিষ্ট কালের জন্য ক্লাব বন্ধ করার কথাও বলা হয়। পাশাপাশি, দুর্গাপুর ক্লাবের সদস্যদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে আলাদা করে টেক্সট মেসেজে তিনি একথাও স্বীকার করেন, ‘কোভিড আক্রান্ত ওই সদস্য ও তার পরিবার গত সপ্তাহেই ক্লাবে স্বপরিবারে এসেছিলেন’। ওই বার্তাতেই তিনি জানান, “ক্লাবের যে সব কর্মচারী ওই পরিবারের সংস্পর্শে এসেছিলেন, তাদেরকে কোয়ারান্টাইনে পাঠানো হয়েছে। ক্লাবের এই সংকট কালে আপনারা ক্লাবের পাশে থাকবেন বলে আশা রাখি”।


মজার বিষয় হল, কর্তৃপক্ষ যে গত ৮ জন দুর্গাপুর ক্লাব খুলে দিয়েছিলেন, ষে কথা জানতেনই না ইস্পাত কর্তৃপক্ষের একাধিক শীর্ষকর্তা। যেমন নগর প্রশাসনের জেনারেল ম্যানেজার রজত সিনহা, দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিকদের আপ্ত সহায়ক অনিন্দ্য ঘোষ, ইস্কো ইস্পাত কারখানার জেনারেল ম্যানেজার শৈলেন্দ্র জয়াল (যিনি ক্লাবের পরিচালন কমিটি সদস্য) পষ্টাপষ্টি জানিয়ে দিয়েছেন, ক্লাব যে খুলে গেছে, তা তারা জানতেনই না।
এ দিকে, জন্মদিনের ওই পার্টিকে ঘিরে খোদ ইস্পাত মহলেই বিস্তর জল্পনা ছড়িয়েছে। যে দুজন ক্লাব কর্মচারীকে কোয়ারান্টাইনে পাঠানো হয়েছে, তাদের একজন ক্লাবের কিচেন সুপারভাইজার গৌতম কর্মকার ও অন্যজন ওয়েটার মোবারক হোসেন। তারা দু’জনেই ওই পার্টি প্রসঙ্গেঁ বলেন, ৪০ জনের খাবারের অর্ডার করা হলেও এসেছিলেন ৩৫ জন। আবার ক্লাব সচিব অনুরাধা পার্টির কথা সরাসরি উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেন, “আমাদের ওই সদস্য তার পরিবারের ১৫ জন সদস্য নিয়ে আসেন ও শুধুমাত্র কিচেন ব্যবহার করা হয়। কোনো পার্টি-ই হয়নি”। অনুরাধার কথাকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন নব্যেন্দু ঘোষও। সোনা-গহনার ব্যবসায়ী নব্যেন্দু’র সন্তানেরই জন্মদিনের পার্টি ছিল। তিনি জানান, “কোভিড পরিস্থিতি বলে বেশি কাউকে বলতে পারিনি। যে তিরিশজন এসেছিলেন, তারা সকলেই আমার পরিবারের লোকজন”। আবার ক্লাবের দ্বিতীয় কিচেন সুপারভাইজার রঞ্জিৎ মুখারজীও জানান, “ওই পার্টিতে ৩৫ জন ছিলেন”।


তা হলে? যারা ওই পার্টিতে সারভ করেছেন, তারা বলছেন সংখ্যাটা ৩০-৩৫, যার পার্টি তিনি বলছেন ৩০ জন ছিলেন, অনুরাধা কি লুকোতে সংখ্যাটা অর্ধেক করে ১৫ বলছেন? অনুরাধা আদৌ কিছু লুকোতে চাইছেন কিনা, তা অবশ্য তদন্ত সাপেক্ষ। তবে, বিষয়টি নিয়ে কি সম্পূর্ণ দায় এড়িয়ে থাকবে দুর্গাপুর ইস্পাত কর্তৃপক্ষ? এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ইস্পাত নগরী সহ গোটা শহর জুড়েই। কারন ‘দুর্গাপুর ক্লাব’ টি’র পরিচালক মন্ডলীতে রয়েছেন ইস্পাত কারখানার পদস্থ শীর্ষ কর্তারা এবং ক্লাবটি সংস্থার মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিকের বাংলো’র পাশেই অবস্থিত। আবার, ১৪ জুলাই, ২০২০ ডি.এস.পি.র পার্সোনাল বিভাগের বরিষ্ঠ প্রবন্ধক এ.চাটারজী পৃথকভাবে কারখানার কর্মীদের জন্য যে ‘কোভিড গাইডলাইন’ জারি করেন, তাতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, ডি.এস.পি.র কোনো কর্মী-আধিকারিকরাই যেন সরকার নির্দেশিত নিয়ম ভেঙে কোভিড -সংক্রমন সংক্রান্ত কোনো তথ্যই গোপন না করেন। তা হলে, অনুরাধা আইয়ার কি তথ্য গোপন করে ৩৫ জনের পার্টিকে ১৫ জনের বলে চালাচ্ছেন? বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক বেদবন্ধু রায় বলেন, “দুর্গাপুর ক্লাবের সাথে ডি.এস.পি.র কোনো সম্পর্ক নেই। ওদের পরিচালন কমিটি আলাদা। ওখানে কাজ কর্মের বিষয় নির্ধারন করেন ক্লাবের কমিটির লোকেরাই। কে পার্টি করল, কেন পার্টি হল তা ওনারাই বলতে পারবেন”।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here