সরকারি জমি দখল করে প্রোমোটারি কাণ্ডে তদন্তের নির্দেশ দুর্গাপুর প্রশাসনের

0
3798

স্টাফ রিপোর্টার, দুর্গাপুরঃ- গরিব গৃহবধূর ‘খাসজমি’ জবরদখল করে প্রোমোটারীর বিরুদ্ধে এবার মহকুমা প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেন নির্যাতিতা। নিজের একচিলতে বাসস্থান রক্ষার আর্জি নিয়ে স্থানীয় কিছু যুবকের প্রোমোটারী রুখতে হস্তক্ষেপ চাইলেন মহকুমা শাসকের। এনিয়ে শোরগোল পড়ে গেছে শহর দুর্গাপুরের বিধাননগর সংলগ্ন আঢ়া, কালীগঞ্জ, শিবতলা এমনকি পারদো মৌজাগুলিতে। চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এলাকার রাজনৈতিক মহলেও।

জেলা সি পি এম নেতৃত্ব যেমন বাস্তু জমিতে প্রোমোটারী থাবা প্রসঙ্গে সরাসরি দোষারোপ করেছেন শাসক তৃনমূল কংগ্রেসের এক শ্রেণীর নেতা ও তাদের ডাঁয়া-বাঁয়া থাকা কিছু যুবকের জমি দখলের গা জোওয়ারি প্রসঙ্গে, তৃনমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আবার পুরো বিষয়টিকেই একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও, তৃনমূল কংগ্রেসের এই দাবি কোনো শক্তপোক্ত ভিত্তিই নেই বলে দাবি এলাকার বেশিরভাগ মানুষের।

দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল সবুজে ঘেরা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ হওয়ার ফলে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলকে বেছে নিছ্ছেন তাদের বাসভূমি হিসেবে। আর ঠিক সেই কারণেই দুর্গাপুর ও তার আশেপাশের অঞ্চলগুলিতে গড়ে উঠছে একের পর এক আবাসন প্রকল্প। কার্যতঃ বিনা বাধায় আর ক্ষেত্র বিশেষে সরকারি নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই। এক দশক ধরে দুর্গাপুরে এই প্রোমোটারি ব্যবসা বেড়ে উঠেছে রকেটের গতিতে। কিন্তু এই নগর উন্নয়ন ও প্রোমোটারি ব্যবসার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে মাফিয়া গোষ্ঠী, একশ্রেণীর বাহুবলি, কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতা ও কিছু মস্তান গোছের সংগঠিত গোষ্ঠী। এরাই প্রোমোটারি ব্যবসায় দুর্গাপুরে মাফিয়া রাজ সৃষ্টি করেছে, বলে প্রায় সব মহলেরই অভিযোগ।

প্রসঙ্গত, দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল জুড়ে যেসব আবাসন প্রকল্প গুলি গড়ে উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে একাধিক বেনিয়মের অভিযোগ আছে। কোথাও ভূগর্ভস্থ জল টেনে তুলে নেওয়া হচ্ছে সাবমার্সিবল পাম্প বসিয়ে বিনা অনুমতিতে, কোথাও আবার সরকারি খাস জমি দখল করে আবাসন প্রকল্পের ভেতরে ঢুকিয়ে নেওয়া হচ্ছে সুকৌশলে, কোথাও বুজিয়ে ফেলা হয়েছে আস্ত পুকুর, কোথাও আবার বর্ষাকালীন জল যাওয়ার নিকাশির নালা অবরুদ্ধ করে তৈরি করা হচ্ছে পেল্লাই ফ্লাট বাড়ি। কোথাও আবার বেআইনিভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে গড়ে উঠেছে ঢাউস আবাসন প্রকল্প।

প্রসঙ্গত,গত ২০ জুন স্থানীয় কালিগঞ্জ মৌজায় বসবাসকারী এক গৃহবধূ রুবি বাউরী দুর্গাপুর মহকুমা শাসককে একটি লিখিত অভিযোগ জানান। সেই অভিযোগে তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন আর.এস. দাগ নম্বর – ১৪৪৭, মৌজা কালীগঞ্জের ওপর তার শ্বশুরবাড়িতে তিনি বসবাস করছেন দীর্ঘ কুড়িটি বছর ধরে। হঠাৎই একদিন কিছু স্থানীয় গ্রামের ব্যক্তি সহ বামুনাড়ার এলাকার তিন প্রোমোটার তাকে সাত দিনের ভেতর ঘর খালি করে দেওয়ার নির্দেশ জারি করে। পরে তিনি তার শাশুড়ি মায়ের কাছ থেকে জানতে পারেন যে ওই বাসস্থানের জমিটি ইতিমধ্যেই তার শাশুড়ি নাকি ডেভলপ ও প্রোমোটিং করার জন্য বিক্রি করে দিয়েছেন একটি গোষ্ঠীকে। তিনটি সন্তানের মা ওই অসহায় গৃহবধূ সদ্য ফের মা হয়েছেন । কোলে ২মাসের শিশু পুত্রকে নিয়ে তিনি এদিন দুর্গাপুর মহকুমা শাসকের দপ্তরে হাজির হন অভিযোগ জানাতে। মহকুমা শাসককে তিনি অভিযোগপত্রে স্থানীয় বামুনাড়া গ্রামের তিন যুবক দেবব্রত আচার্য, দেবরাজ সামন্ত, অয়নাভ রায়, দুলাল রুইদাস ও নেপো বড়ুয়া নামক ব্যক্তিরা তাকে তার বাসস্থান থেকে সাত দিনের ভেতর ঘর খালি করে কেটে পড়ার হুকুম জারি করে, বলে দাবি করেছেন। গৃহবধূ রুবি বাউরী মহকুমা শাসককে জানিয়েছেন তার স্বামী মানসিক ভারসাম্যহীন বলে তার ওপরে অকথ্য নির্যাতন করা হচ্ছে। অবিলম্বে তাকে তার বাসস্থান থেকে উৎখাত না করতে পারে ও দোষী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা যেন করেন মহকুমা শাসক। ওই গৃহবধূ রুবি বাউরী মহকুমা শাসককে অভিযোগ পত্র জমা দেওয়ার পর স্থানীয় নিউ টাউনশিপ থানার ওসির কাছে একটি অভিযোগও দায়ের করেন। তৎসহ স্পিড পোস্ট মারফত রাজ্যের মাননীয় নগর উন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, পশ্চিম বর্ধমান জেলা শাসক ও আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট পুলিশ কমিশনারকে আবেদন জানান তাকে রক্ষা করার তাগিদে বলে সূত্র মারফত জানা গেছে।

সিপিআইএমের জেলা কমিটির আহ্বায়ক পঙ্কজ রায় সরকার এ দিন এই ঘটনার বিষয়ে বলেন, “কালিগঞ্জ মৌজা, টেটিখেলা মৌজা ও আঢ়া মৌজায় একাধিক সরকারি খাস জমি লুঠ চলছে স্থানীয় কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় জেমুয়া পঞ্চায়েতের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিক সহ ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরের একাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের দ্বারা। তারা এইসব সরকারি জায়গা দখল করতে সাহায্য করছেন শুধু তাই নয়, সরকারি খাসজমি দখল করে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু বহুতল নির্মাণও হয়েছে ওই এলাকায়।” আগামী দিনে ওইসব এলাকার মানুষজনকে নিয়ে এই দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষজনদের খাসজমি লুঠের বিরুদ্ধে সজাগ করে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, দুর্গাপুর পশ্চিম কেন্দ্রের বিধায়ক ও স্থানীয় বিজেপি নেতা লক্ষণ ঘড়ুই জানান, “শুধু কালিগঞ্জ মৌজা, টেটিখেলা মৌজা ও আঢ়া মৌজাযই নয়, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সরকারি জমি বা পাট্টা দেওয়া জমিকে নির্বিচারে কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা দখল করে বিক্রি করছে ও মোটা টাকার বিনিময়ে প্রোমোটারি ব্যবসা করা লোকজনদের হাতে তুলে দিচ্ছে। আমরা বিরোধী দলের লোকজন বলে এলাকার কোন বিষয়ে আমাদেরকে ডাকা হয় না। তাই বাধ্য হয়ে আমাদের রাস্তা খোলা নেই প্রতিবাদের। তবে এই বিষয়ে আমরা আগামী দিনে বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে যথাযথ জায়গায়, যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।”

এদিকে, সরকারি খাস জমি দখলের বিষয়ে আসানসোল দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, “ওই কালিগঞ্জ মৌজা, টেটিখেলা মৌজা ও আঢ়া মৌজায় একাধিক জায়গায় আসানসোল দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদের অধিকৃত জমি রয়েছে। আমাদের কাছে অভিযোগ আছে যে সরকারি অধিকৃত বেশ কিছু জায়গায় কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ দখল করে ঘর বাড়ি বানানোর চেষ্টা করছে । বহুবার আসানসোল দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদ এর পক্ষ থেকে ওইসব এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে এবং একাধিকবার নোটিশও করা হয়েছে। ওইসব এলাকার জমি সংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে ইতিমধ্যেই আমরা রাজ্যের আরবান ডেভেলপমেন্ট মন্ত্রণালয়ে একটি বিস্তারিত রিপোর্টও পাঠিয়েছি। রাজ্যের আরবান ডেভেলপমেন্ট মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ পেলেই কড়া হাতে মোকাবেলা করা হবে ওই এলাকার জমি পুনরুদ্ধারে।”

এইসব বিষয় নিয়ে স্থানীয় জেমুয়া পঞ্চায়েতের তৃণমূল নেতা ও সমাজসেবী স্বাধীন ঘোষকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ওই জায়গা সম্বন্ধিত কিছু সংবাদ পরিবেশন হচ্ছে দেখেছি। আমরা খবর পেয়েছি যে ওই গৃহবধূ ইতিমধ্যেই দুর্গাপুর মহকুমা শাসককে এ বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন। দুর্গাপুরের মহকুমাশাসক আমাদের অভিভাবক। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস তিনি যথাযথ তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করবেন এবং তা সবাইকে মানতে হবে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এইসব বিষয় খবর সম্প্রচার হওয়ার পর আমরা নিজেরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে খবর নিয়ে জানতে পেরেছি এখন অব্দি আমাদের পঞ্চায়েত ও জেলা পরিষদে ওই জায়গায় বহুতল নির্মাণ করার কোনো আবেদন বা অনুমোদন দেওয়া হয়নি। স্বভাবতই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মহকুমা শাসক ও ভূমি ও ভূমি রাজস্ব বিভাগের আধিকারিকরা যথাযথ তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করবে বলে আমার বিশ্বাস।”

এদিকে সূত্র মারফত জানা গেছে দুর্গাপুর নিউ টাউনশিপ থানার পুলিশের কাছে অভিযোগ জমা পড়ার পরেই স্থানীয় নিউ টাউনশিপ থানার পুলিশ দ্রুততার সাথে ওই গৃহবধূর অভিযোগ খতিয়ে দেখে বিভিন্ন মাধ্যমে সত্য জানার চেষ্টা চালাচ্ছেন ও তদন্ত করছেন। এ বিষয়ে আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট এর ডিসিপি (পুর্ব) অভিষেক গুপ্ত জানান, “জমি সংক্রান্ত বিষয়ে ওই গৃহবধূ যে অভিযোগ করেছে তা আমাদের থানা স্তরে নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। তাই আমরা ভূমি ও ভূমি রাজস্ব বিভাগের বিএলআরও কে অনুরোধ করেছি চিঠি দিয়ে যাতে যথাযথ তদন্ত করে এই সমস্যার দ্রুত নিষ্পত্তি করেন। তার সাথে আমরা এও অনুরোধ করেছি বি এল আর ও কে যতদিন না এই ঘটনার সত্য উঘটনা হচ্ছে ততদিন কোনরকম নির্মাণকার্য ওই জমিতে যাতে না করা হয়।”

সূত্র মারফত জানা গেছে দুর্গাপুরের মহকুমা শাসক শেখর চৌধুরী ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে ভূমি ও ভূমি রাজস্ব বিভাগের উচ্চ আধিকারিকদের যথাযথ তদন্ত করে দ্রুততার সাথে এই সমস্যার সমাধান ও নিষ্পত্তি করার আদেশ জারি করেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here