দুর্গাপুর এখন প্রোমোটার মাফিয়াদের স্বর্গরাজ্য

0
1447

নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুরঃ- দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল সবুজে ঘেরা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ হওয়ার ফলে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলকে বেছে নিয়েছেন তাদের বাসভূমি হিসেবে। আর ঠিক সেই কারণেই দুর্গাপুর ও তার আশেপাশের অঞ্চলগুলিতে গড়ে উঠেছে একের পর এক আবাসন প্রকল্প। দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের যেকোনো রাস্তায় হাঁটলে এখন নজরে পড়বে একাধিক ব্যানার, পোস্টার ও হোডিং যেখানে দুর্গাপুরে একটি ফ্ল্যাট, জমি ও বাংলো কেনার বিজ্ঞাপন দেওয়া রয়েছে। এক দশক ধরে দুর্গাপুরে এই প্রোমোটারি ব্যবসা একশো গুণ বেড়েছে বলে দাবি করেছেন নগরবাসীরা। কিন্তু এই নগর উন্নয়ন ও প্রোমোটারি ব্যবসার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে মাফিয়া গোষ্ঠী, একশ্রেণী বাহুবলি, দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতা, দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ ও কিছু মাস্তান গোছের সংগঠিত সমষ্টি। এরাই প্রোমোটারি ব্যবসায় দুর্গাপুরে মাফিয়া রাজ সৃষ্টি করেছে।

প্রসঙ্গত, দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল জুড়ে যেসব আবাসন প্রকল্প গুলি গড়ে উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে একাধিক বেনিয়মের অভিযোগ আছে। কোথাও ভূগর্ভস্থ জল টেনে তুলে নেওয়া হচ্ছে সাবমার্সিবল পাম্প বসিয়ে বিনা অনুমতিতে, কোথাও আবার সরকারি খাস জমি দখল করে আবাসন প্রকল্পের ভেতরে ঢুকিয়ে নেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার বর্ষাকালীন জল যাওয়ার নিকাশির রাস্তা অবরুদ্ধ করে তৈরি করা হচ্ছে ফ্লাট বাড়ি। কোথাও আবার বেআইনিভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে আবাসন প্রকল্প চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ। এমনই এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠল দুর্গাপুরের বিধাননগর সংলগ্ন শংকরপুর বিবেকানন্দ পার্ক এলাকায়।

গতকাল বিবেকানন্দ পার্ক এলাকার একটি আবাসন প্রকল্পের মালিক বলপূর্বক স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়ির গাঘেঁষে ১১০০০ কেভি’র একটি বৈদ্যুতিক লাইন (ওভারহেড লাইন) নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন আবাসন প্রকল্পে বলে অভিযোগ। স্থানীয় মানুষজন এই বৈদ্যুতিক লাইনের লাইন বসানোর প্রতিবাদ জানালেও কর্ণপাত করেনি আবাসন প্রকল্পের মালিকগণ বলে অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, “এই আবাসন প্রকল্প যখন তৈরি হচ্ছিল তখন ওই আবাসন প্রকল্পের মালিক জানিয়েছিলেন যে, তিনি এলাকায় তার আবাসনে মাটির নিচ দিয়ে ইলেকট্রিকের লাইন নিয়ে যাবেন। কিন্তু সাধারণ বাসিন্দাদের অন্ধকারে রেখে তারা রাতারাতি পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ পর্ষদ-এর কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকের যোগসাজশে ওই এলাকার আবাসিকদের ঘরের গা ঘেঁষে ১১০০০ কেভি’র, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ পরিবাহী তার ও ট্রান্সফরমার বসানোর কাজ শুরু করার চেষ্টা করেছিলেন।”

বিবেকানন্দ পার্ক এলাকার সাধারণ বাসিন্দারা গতকাল এ বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং বিদ্যুতের খুঁটি পোতার কাজ বন্ধ করে দেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, “এ বিষয়ে দুর্গাপুর মহকুমা শাসক সহ একাধিক আধিকারিককে অভিযোগ জানানো হয়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত ওই আবাসন প্রকল্পের মালিককে কোনভাবেই আটকানো হয়নি।” এই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ পরিবাহী তার তাদের আবাসন গা ঘেঁষে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্থানীয় কিছু মানুষের বক্তব্য, “আবাসন প্রকল্পের মালিক স্থানীয় এক দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা যিনি কিনা এলাকায় সিন্ডিকেটের ব্যবসা চালান তার সক্রিয় সহযোগিতায় সাধারণ মানুষের অসুবিধা করে এই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ পরিবাহী তার সাধারণ মানুষের আবাসন গা ঘেঁষে নিয়ে যাচ্ছেন।” শুধু তাই নয়, সাধারণ এলাকাবাসীদের আরও অভিযোগ, “একশ্রেণীর দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ ও একজন বাংলা বৈদ্যুতিক চ্যানেলের সাংবাদিকের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রেখে এই আবাসন প্রকল্পের মালিক মোটা টাকার বিনিময়ে সাধারণ মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করছেন। ওই এলাকাতে একটি শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের গা ঘেঁষে এই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ পরিবাহী তার নিয়ে যাওয়ার ফলে শিশুদের জীবন বিপন্ন হবে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিমত।” স্থানীয় বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, “একশ্রেণীর দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা, পুলিশ ও এক সাংবাদিক ওই আবাসন প্রকল্পের মালিকের কাছ থেকে মোটা টাকার বিনিময়ে সাধারণমানুষ-এর অসুবিধার এই অভিযোগ বিভিন্ন মহলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।”

এলাকাবাসীর এই সমস্ত অভিযোগ নিয়ে যখন ওই আবাসন প্রকল্পে যাওয়া হয় তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন ওই আবাসন প্রকল্পের সুপারভাইজার মৃত্যুঞ্জয় ঠান্ডার। এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি জানান, “অবিলম্বে এ বিষয়ে সদর্থক ভূমিকা নেওয়া হবে যাতে এলাকাবাসীর কোন অসুবিধা না হয়।” স্থানীয় সূত্র মারফত জানা গেছে, এই আবাসন প্রকল্পটি জনৈক রাজীব নামক এক প্রোমোটারের। ‘চ্যানেল এই বাংলায়’ পক্ষ থেকে বহুবার তার নম্বরে ফোন করলেও তার সাথে যোগাযোগ করা যায়নি। এই অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অবাক করার বিষয় হল কী করে এক শ্রেণীর মানুষ নিজেকে অর্থবান হওয়ার লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন ? এই সব প্রোমোটার মাফিয়ার স্বর্গরাজ্য বানিয়ে ফেলেছে দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলকে। দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে নিরব ও চুপ প্রশাসন কর্তারা থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সাংবাদিকরা।

আবাসন প্রকল্পের সুপারভাইজার মৃত্যুঞ্জয় ঠান্ডার

সবথেকে বড় প্রশ্ন চিহ্ন জেগেছে আসানসোল দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদ, দুর্গাপুর নগর নিগম, ফায়ার ব্রিগেড, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ, ভূমি ও ভূমি রাজস্ব বিভাগ, রাজ্য বিদ্যুৎ বিভাগের আধিকারিকদের এইসব প্রকল্পগুলিতে নজরদারি ও অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে। আদৌ কি রাজ্য সরকারের অধীনস্থ এইসব বিভাগগুলি দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল জুড়ে একাধিক প্রোমোটারদের মাফিয়া রাজ রোধ করার পেছনে সদিচ্ছা আছে , এ প্রশ্ন এখন লাখ টাকার ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here