ব্যাবসায়ীকে হুমকি দিলেন এক তৃণমূল কাউন্সিলর, “বোরো চেয়ারম্যান কে? মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে কেনো দান করেছেন? যা দেওয়ার আমাকেই দিতে হবে”

0
6817

নিজস্ব সংবাদদাতা,দুর্গাপুর:- মুখ্যমন্ত্রীর করোনা ত্রাণ তহবিলে আর্থিক দান করে হুমকির মুখে পড়লেন এক ব্যাবসায়ী। আর ওই ব্যাবসায়ীকে হুমকি দিলেন একজন তৃণমূল কাউন্সিলর।
এমন ঘটনায় তোলপাড় তৃণমূলের অন্দরমহল তথা দুর্গাপুরে রাজনৈতিক মহল। প্রশ্ন উঠছে, এমনটা কিভাবে সম্ভব? তৃণমূল যখন রাজ্য শাসন ক্ষমতায় আসীন, ঠিক তখন সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের বিরোধিতা করছেন দুর্গাপুরের এক তৃণমূল কাউন্সিলর।
ঘটনায় প্রকাশ, সগর ভাঙা জোনাল সেন্টারের ‘চ্যাটার্জি গ্লাস হাউস’ নামে এক দোকানের মালিক মুখ্যমন্ত্রী করোনা ত্রাণ তহবিলে আর্থিক দান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সেই অনুযায়ী ২৯ নং ওয়ার্ডের সেক্রেটারি সজল নন্দীকে জানান এবং ৪ নং বোরো চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। সজল নন্দী ওই ব্যাবসায়ীকে ৪ নং বোরো চেয়ারম্যান চন্দ্রশেখর ব্যানার্জির কাছে নিয়ে যান। সেখানে( ২০/৪/ ২০২০)ওই ব্যাবসায়ী এবং তার ছেলে সজল নন্দীর উপস্থিতিতে বোরো চেয়ারম্যান চন্দ্রশেখর ব্যানার্জির হাতে ৫ হাজার টাকার একটি চেক তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলের উদ্দেশ্যে।

এদিকে গত ১৪/৫/২০২০ তারিখ দুপুর ১২ টা নাগাদ জোনাল সেন্টারে স্থিত ওই ব্যাবসায়ীর কাছে যান ২৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুনীল চ্যাটার্জি। সুনীলবাবু ওই ব্যাবসায়ীকে বলেন, ৫-১০ কুইন্টাল চাল দিতে। তখন ওই ব্যাবসায়ী কাউন্সিলরকে জানান, তিনি ইতিমধ্যে বোরো চেয়ারম্যান চন্দ্রশেখর ব্যানার্জির হাতে ৫ হাজার টাকার চেক তুলে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে। ব্যাবসায়ীর মুখে এমন কথা শুনে প্রচন্ড রেগে যান কাউন্সিলর সুনীলবাবু। তখন ওই ব্যাবসায়ীকে সুনীলবাবু বলেন, চেয়ারম্যান চন্দ্রশেখর ব্যানার্জি কে? চন্দ্রশেখর এই ওয়ার্ডের কেউ নয়। এরপর তিনি আরও বলেন, মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে কেনো দান করেছেন? এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আমি। আমার ওয়ার্ডে ব্যবসা করে খাচ্ছো, অতএব যা দেওয়ার আমাকেই দিতে হবে। না হলে ব্যবসা করতে পারবে না।
এরপরই সজল নন্দীকে ফোন করে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেন, তুই কেনো চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে গিয়েছিলি? পাশাপাশি আপত্তিকর, অসম্মানজনক, অশালীন ভাষায় কুটক্তি করে সজল নন্দীকে হুমকি দিয়ে বলেন, আমাদের ওয়ার্ডের টাকা কেনো বাইরে যাবে? তোকে দল থেকে বের করে দেবো। শেষে গালাগাল দিয়ে ফোন কেটে দেন কাউন্সিলর।

এখন প্রশ্ন, কেনো একজন ব্যাবসায়ী মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে দান করার জন্য এই রকম অসম্মানজনক, অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়বেন? মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে দান করা কি অপরাধ? নন- রেশনিং মানুষদের দেওয়ার জন্য ৪ নং বোরো অফিস থেকে ওই কাউন্সিলর প্রচুর চাল পেয়েছেন। তাসত্বেও কেনো তিনি দোকানদার-ব্যবসাদারদের কাছে চাল চেয়ে বেড়াচ্ছেন? এতো চাল নিয়ে তিনি কি করছেন?

এসম্পর্কে সজল নন্দী বলেন, কাউন্সিলর আমাকে ফোন যে হুমকি দিয়েছেন তার সমস্তটাই আমার ফোনে রেকর্ড আছে। এই সমস্ত অভিযোগ আমি লিখিত ভাবে বোরো চেয়ারম্যান চন্দ্রশেখর ব্যানার্জি এবং দুর্গাপুর মেয়র দিলীপ অগস্তিকে জানিয়েছি।
সজলবাবু আরও বলেন, আমাকে দল থেকে তাড়ানোর উনি কে? উনাকে দেখে আমি তৃণমূল দল করি না। তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জির উপর আস্থা এবং তার অনুপ্রেণায় আমি তৃণমূল দল করি। আর সেই দলনেত্রীর নির্দেশ মেনেই মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে এক ব্যাবসায়ী দান করেছেন। এক্ষেত্রে আমি কি অপরাধ করলাম?

এইদিকে ওই ব্যাবসায়ী ঘটনার সমস্ত বিবরণ সরাসরি বোরো চেয়ারম্যান চন্দ্রশেখর ব্যানার্জিকে জানিয়েছেন। এ সম্পর্কে চন্দ্রশেখরবাবু বলেন, সমস্ত বিষয়টির সম্পর্কে আমি অবগত। মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে দান করার ব্যাপারে সুনীলবাবু বাধা দিতে পারেন না। এটা উনি গর্হিত কাজ করেছেন। তাই ওই কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে যা ব্যবস্থা নেওয়ার মেয়র সাহেব নেবেন।

অপরদিকে সগর ভাঙা ২৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের বক্তব্য, যাদের রেশন কার্ড নেই তারাতো সিটিসেন্টারে রেশন অফিসে গিয়ে জানাচ্ছেন। রেশন অফিস থেকে তাদের প্রত্যেককেই একটি করে স্লিপ দেওয়া হচ্ছে। সেই স্লিপ নির্দিষ্ট রেশনশপে দেখালেই ফ্রীতে নির্দিষ্ট পরিমান (৫ কেজি ) চাল পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া এলাকাতে বহু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, বহু ক্লাব এবং অনেকে ব্যক্তিগতভাবে এলাকার গরিবদের চাল, ডাল, সয়াবিন,তেল, মসলা, বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী দান করেছেন এবং এখনো করছেন।
এছাড়া বোরো চেয়ারম্যানের ‘স্বপ্ন উড়ান’ প্রকল্পের উদ্যোগে ২৯ নং ওয়ার্ডেই ডিএমসি’ র অভিনন্দন লজে ‘কমিউনিটি কিচেন’ এর মাধ্যমে এলাকার গরিব অসহায় মানুষদের ঘরে ঘরে ফ্রীতে রান্না করা ভাত, ডাল,সবজি / ডিমেরকারী পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছে। এটা চলছে বিগত প্রায় এক মাস ধরে। প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার বাড়িতে খাবার পৌঁছানো হচ্ছে। তাহলে ২৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুনীলবাবুর এতো চালের কি প্রয়োজন ?

অনেকের অভিযোগ, বোরো অফিস থেকে ২৯ নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলরের কাছে আসা প্রচুর পরিমানে চালের হিসাবের গরমিলের হাত থেকে বাঁচতে ইতিমধ্যে তিনি তার পেটোয়া লোকজনকে দিয়ে ডান হাতে-বাঁ হাতে সই করিয়ে নিচ্ছেন। এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে অবশ্যই তিনি চাল চুরি করছেন বলে অভিযোগ এলাকাবাঁশীর। অবশ্য সগর ভাঙায় বিজেপি পক্ষ থেকে বারবার এই চাল চুরির অভিযোগ উঠছিল। সেই অভিযোগ কি এবার সত্যি বলে প্রমাণ হতে চলেছে ?

সজল নন্দী কি কাউন্সিলরের এই চাল চুরির বিষয়টি জানেন? আর সেটাই ধামা চাপা দিতেই কি কাউন্সিলর আগেভাগে সজলবাবুকে দল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে রাখলেন ? এছাড়াও সুনীলবাবু ওই জোনাল সেন্টারে স্থিত একটি রঙের দোকানের মালিকের কাছে ও ৫ কুইন্টাল চাল চেয়েছেন। তাই প্রশ্ন উঠছে, কাউন্সিলর সুনীলবাবু সগর ভাঙা এলাকায় এ পর্যন্ত কত ব্যাবসায়ী ও দোকানদারের কাছ থেকে হুমকি দিয়ে চাল নিয়েছেন? আর সেইসব বিপুল পরিমান চাল যাচ্ছে কোথায়? এই নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া খুব দরকার। তাহলেই জানা যাবে, এতো বিপুল প্রমাণ চাল নিয়ে কাউন্সিলর কি করলেন? এমনই অভিমত এলাকাবাসীর।

শুধু তাই নয়, তৃণমূলের একাংশের বক্তব্য, সুনীলবাবু একজন তৃণমূল কাউন্সিলর হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশকে অমান্য করছেন কি করে? বোরো চেয়ারম্যানের সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে কেনো নেমেছেন সুনীলবাবু ? তিনি প্রকাশ্য বলে বেড়াচ্ছেন, বোরো চেয়ারম্যান পদ থেকে খুব তাড়াতাড়ি চন্দ্রশেখর ব্যানার্জিকে তাড়াবেন। এই সমস্ত বিষয় চন্দ্রশেখরবাবু অবশ্যই জানেন তাসত্বেও দল কেনো সুনীলবাবুর বিরুধ্যে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি?

অন্যদিকে বহালতবিয়তে নিজের দম্ভে রয়েছেন সুনীলবাবু। এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, হ্যা বলেছি, তাতে কি হয়েছে। আমার ওয়ার্ডে এইসমস্ত বরদাস্ত করবো না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here