পানাগড় শিল্পতালুকের গ্লোবাস স্পিরিট লিমিটেড বিরুদ্ধে নেশনাল গ্রীন ট্রিবুনালের তদন্ত কমিটি গঠন

0
455

মদ কারখানার দুষিত বর্জ্য জলে, দুষিত হচ্ছে চাষ জমি। পানাগড় শিল্পতালুকে মদ কারখানার দুষিত জলে বিপন্ন খড়ি নদী ও সেচ ক্যানেল, দুর্গন্ধে ওষ্ঠাগত প্রান গ্রামবাসীদের ।

দেব লাহা, দুর্গাপুর:- পানাগড় শিল্পতালুকে মদ কারখানার ( Globus Spirits Limited,CGR3+GFX, Kota Gram, West Bengal 713169 ) দুষিত জলের বিরুদ্ধে অবশেষে নেশনাল গ্রীন ট্রিবুনাল এর তদন্ত কমিটি গঠন হল। গত ২৭ শে জুলাই নেশনাল গ্রীন ট্রিবুনাল, ইস্টার্ন জোন বেঞ্চ, কলকাতা , ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে এক সমাজসেবী সংগঠনের আবেদনে সাড়া দিয়ে পানাগড় শিল্পতালুকের মদ কারখানা থেকে যে দূষিত জল বের হচ্ছে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার আদেশ দেন। এদিন মাননীয় বিচারপতি বি.অমিত সথেলেকার, জুডিশিয়াল মেম্বার ও মাননীয় শ্রী শৈবাল দাশগুপ্ত এক্সপার্ট মেম্বার অবিলম্বে এই অভিযোগের তদন্ত করার নির্দেশ দেন ও একটি কমিটি গঠন করেন। এদিন নেশনাল গ্রীন ট্রিবুনাল বেঞ্চের মাননীয় বিচারপতিরা সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড, রিজিওনাল অফিস কলকাতার সিনিয়র সাইন্টিস্ট ও পশ্চিমবঙ্গ পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড কলকাতার সিনিয়ার সাইন্টিস্ট, এনভারমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ার এর যৌথ কমিটি তৈরি করার নির্দেশ দেন এবং অবিলম্বে পানাগড় শিল্পতালুকে মদ কারখানার দুষিত জলের সম্বন্ধিত অভিযোগ খতিয়ে দেখে রিপোর্ট জমা দিতে বলেন।

গত ১৬ই জুন ‘চ্যানেল এই বাংলায়’ এই ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে একটি সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছিল। সেই সংবাদ পরিবেশনের পর দুর্গাপুরে অবস্থিত অল ইন্ডিয়া আন্টি করাপশন অর্গানাইজেশন নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পক্ষ থেকে ওই সংস্থার এক কর্মকর্তা সুব্রত মল্লিক তার উকিল সাহেব ব্যানার্জিকে দিয়ে নেশনাল গ্রীন ট্রিবুনাল, ইস্টার্ন জোন বেঞ্চ, কলকাতায় একটি কেস রুজু করেন।

মামলাকারী সংস্থার কর্মকর্তা সুব্রত মল্লিক ও তার উকিল সাহেব ব্যানার্জির অভিযোগ “ওই এলাকার আসে পাসে গ্রামে যারা বসবাস করে তাদের লিভার, কিডনি, এবং হাঠ এর সমস্যা হচ্ছে, ছোট ছোট বাচ্চাদের শারীরিক সমস্যা হচ্ছে ও শিশুদের মধ্যে স্বাভাবিক শারীরিক গঠনে হচ্ছে না। পানাগড় শিল্পতালুকে মদ কারখানার ( Globus Spirits Limited,CGR3+GFX, Kota Gram, West Bengal 713169 ) দুষিত জলের দুর্গন্ধে আর কেনেলের মধ্যে দিয়ে জল যাবার জন্যে এলাকার টিউবওয়েল গুলির ও পুকুরের খাবার জলেও জীবাণু ঢুকছে এখাকার সাধারণ গ্রামবাসীদের শরীরের মধ্যে বলে অভিযোগ । ” মামলাকারী সংস্থার কর্ণধার আরো বলেন, “ওই এলাকায় এই সমস্যার ফলে আমাদের সংস্থার উদ্যোগে একটি মেডিকেল টিম ও খাবার জল সরবরাহ সবার আগে প্রশাসনকে দিতে অনুরোধ করেছিলাম। পশ্চিমবঙ্গ পরিবেশ দপ্তরকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম যাতে অবিলম্বে ওই নোংরা জলের জায়গায় একটি সেন্সর বসিয়ে দূষণের মাত্রা মাপা হয় এবং এলাকার মাটি পরীক্ষা করে অবিলম্বে ওই সংস্থাকে যথাযথ আইনে ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় তা আর হয়ে ওঠেনি, তাই বাধ্য হয়ে নেশনাল গ্রীন ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে হয়েছে।”

এদিকে পানাগড় শিল্পতালুকে নেশনাল গ্রীন ট্রিবুনাল এর তদন্ত কমিটি গঠনের এই খবর জানাজানি হতেই স্থানীয় কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়। স্থানীয় গ্রামবাসীদের অভিযোগ ওই মদ কারখানা থেকে এলাকার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ,দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল কংগ্রেস নেতা ও কর্মীরা মোটা টাকা মাসিক তোলা হিসেবে পেত। এবার মাননীয় নেশনাল গ্রীন ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের আদেশের পর তারা এখন ভীত ও সন্ত্রস্ত। এদিন ওইসব দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল কংগ্রেস নেতা কর্মীরা সাধারণ গ্রামবাসীদের ভয় দেখিয়ে যাতে তদন্ত কমিটিকে প্রভাবিত করা যায় সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ।

উল্লেখ্য, লকডাউনের জেরে অনেকটাই কমছিল পরিবেশ দুষন। তার মধ্যে অন্যদিকে তখন মদ কারখানার ( Globus Spirits Limited,CGR3+GFX, Kota Gram, West Bengal 713169 ) বর্জ্য জলে বিপন্ন ঐতিহাসিক খড়ি নদী। নষ্ট হচ্ছে সেচ ক্যানেল ও চাষজমি। দুষিত হচ্ছে জলাশয়। সেচ ক্যানেলে চাষের জলের বদলে বইছে দুষিত জল। দুর্গন্ধে ওষ্ঠাগত প্রান গ্রামবাসীদের। এমনই নজিরবীহিন দুষিত জলে আক্রান্ত বুদবুদের মাড়ো, ভীড়সিন, সহ একাধিক গ্রামের বাসিন্দারা। অভিযোগ জানিয়েও সুরাহা না হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে গ্রামবাসীরা।

পানাগড় শিল্পতালুকে রয়েছে বেসরকারী মদ তৈরীর কারখানা ( Globus Spirits Limited,CGR3+GFX, Kota Gram, West Bengal 713169 )। বছর ছয়েক ধরে ওই কারখানা উৎপাদন শুরু হয়েছে। উৎপাদন শুরু হতে মাত্রারিক্ত দুষনে জেরবার আশপাশের কোটা, চন্ডীপুর, নতুনগ্রাম, মাড়ো সহ ১০ টির বেশী গ্রামের বাসিন্দারা। কারখানার মদ তৈরীর সময় পচা দুর্গন্ধে অতিষ্ট এলাকাবাসীরা। তবে বেশী আক্রান্ত মাড়ো গ্রামের বাসিন্দারা। কারখানার বর্জ্য জল মিশছে পার্শবর্তী খড়ি নদী ও এমসি-৩ সেচ ক্যানেলে। আর ওই সেচ ক্যানেল মাধ্যমে মাড়ো গ্রামের একাধিক পুকুরে মিশছে। শুধু তাই নয় আশপাশের চাষজমিতে ওই নোংরা জল পড়ে জমির উর্বরতা নষ্ট করছে। দু- বছর আগে গ্রামবাসীদের ক্ষোভের মুখে দুষিত জল ছাড়া বন্ধ হয়েছিল। বছর ঘুরতেই আবারও কারখানার বর্জ্য নোংরা জল ছাড়া শুরু হয়েছে। তাও আবার সেচ ক্যানেলে। আর ওই সেচ ক্যানেল থেকে খড়ি নদীতে দুষিত জল মিশছে। একই সঙ্গে আশপাশের চাষজমি, পুকুর ও জলাশয়ে।

উল্লেখ্য, খড়ি নদী পূর্ব বর্ধমানের মাড়ো গ্রামের উত্তর দিক হতে নির্গত হয়ে বুদবুদ, গলসীর মধ্যে দিয়ে ভাতার থানার কর্জনা-আড়া হয়ে মন্তেশ্বর এলাকায় ঢুকেছে। মন্তেশ্বরের দেনুড় ছুঁয়ে কাটোয়ার শ্রীবাটি সিঙ্গি ঘুরে পূর্বস্থলীর নিমদহ দিয়ে ঢুকে নাদনঘাট হয়ে হাতিপোতা গ্রামের কাছে ভাগীরথীতে মিশেছে। মাড়ো গ্রামের খড়ি নদীর উৎপত্তি স্থলে রয়েছে খড়্গেশ্বরী মায়ের মন্দির। প্রতি পৌষ সংক্রান্তিতে পুজো, নাম কীর্তন ও প্রসাদ বিতরণ করা হয়। একইরকম মেলা অনুষ্ঠান হয় খামারগ্রামে। পৌষমেলায় নামকীর্তনের পাশাপাশি কবিগান, বাউলগান, টুসুগান ইত্যাদি হয়, নদীতে ভাসানো হত ফুলমালা সাজিয়ে নতুন হোলা। বর্তমানে মদ কারখানার বর্জ্য জলে বিপন্ন খড়ি নদী। ওই দুষিত বর্জ্য জলে এখন আর কেউ স্নান করতে পারে না। পচা দুর্গন্ধে অতিষ্ট নদী তিরবর্তী গ্রামবাসীরা। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা জানান,” গত একবছর ধরে কারখানার নোংরা জল খড়ি নদী, সেচ ক্যানেল ও চাষজমি, জলাশয়ে মিশে দুষিত করছে। জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হচ্ছে। আবার পুকুর জলাশয়ে মেশা কালো দুষিত জল পান করলেই গবাদি পশু অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রায় দু’শ একরের বেশী দুই ফসলি চাষজমি নষ্ট হওয়ার পথে।” বাসিন্দারা জানান,” গ্রামের মাঝে সেচ ক্যানেল। আর ওই ক্যানেল দিয়ে কারখানার দুষিত জল বয়ছে। দুর্গন্ধে অতিষ্ট। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই ওই দুষিত জল বাড়ীতে ঢুকবে। করোনার মাঝে দুষিত জল নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে এলাকায়।” পানাগড় শিল্পতালুকে নতুন শিল্পে মাথায় হাত পড়েছে এলাকাবাসীর। প্রশ্ন, কারখানার বর্জ্য দুষিত জল সেচ ক্যানেলে কেন ফেলা হচ্ছে? এরকম একটি দুষন সৃষ্টিকারী সংস্থাকে কৃষিপ্রধান এলাকায় কারখানার তৈরীর ছাড়পত্র কিভাবে দেওয়া হল? কেনই বা দুষন দফতর নজরদারি করছে না ?

মানকর পঞ্চায়েত প্রধান তথা মাড়ো গ্রামের বাসিন্দা মঙ্গলা রুইদাস জানান,” ওই কারখানা ( Globus Spirits Limited,CGR3+GFX, Kota Gram, West Bengal 713169 ) দুষিত জলে গোটা গ্রাম আতঙ্কে। বহুবার কারখানা কর্তৃপক্ষকে প্ররিশ্রুত না করে দুষিত জল ফেলা বন্ধ করার জন্য নোটিশ করেছি। কিন্তু গুরুত্ব দেয়নি।” যদিও এসব বিষয়ে কোনরকম মুখ খুলতে চায়নি অভিযোগ ওঠা কারখানা কর্তৃপক্ষ।” দুর্গাপুর আঞ্চলিক দুষন দফতর জানিয়েছি। এরকম কোন অভিযোগ আসেনি। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে। দুর্গাপুর সেচ দফতরের আধিকারিক সঞ্জয় মজুমদার বলেন,” সেচ ক্যানেল কিম্বা নদীতে দুষিত জল ফেলা যায় না। সেরকম কোন অনুমতি নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here