করোনাকে ভয় পেলে ক্ষতি, আর ভয় না পেলে ক্ষতির সম্ভাবনা কম

0
628

অমল মাজি

পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যু।
এখনো পর্যন্ত সারা দেশে করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে মারা গেছেন হাজার হাজার মানুষ | পশ্চিমবঙ্গেও মারা গেছেন বহু জন। আর সংক্রমিত হাজার হাজার মানুষ ।

বিশ্বের সব গণমাধ্যম প্রতিমুহূর্তে করোনাভাইরাসের খবর প্রকাশ করে যাচ্ছে। ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ সহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও করোনা ভাইরাসের খবরে আগ্রহ মানুষের।
অর্থাৎ, এই সময়ে করোনা ভাইরাস মানুষের চিন্তার প্রধান বিষয়।

জিতেন রায় নামে জনৈক ব্যক্তি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তাঁর দুই ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলে নবম শ্রেণিতে, ছোটটি পঞ্চম শ্রেণিতে। স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা ঘরে বন্দী। কিন্তু চাকরির কারণেই জিতেনবাবুকে রোজ বাড়ি থেকে বের হতে হচ্ছে। তিনি খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছেন |

এই জিতেনবাবুর মতোই প্রায় প্রত্যেকেই বেশ চিন্তিত। তবে করোনাভাইরাসের থেকে বাঁচার জন্য নিয়ম মেনে মাস্ক পড়ছেন। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধুচ্ছেন। জিতেনবাবু বলেন, যেভাবে মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে, সেই খবরে আমি খুব চিন্তিত। ভয় পাচ্ছি, আমিও যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যাই। আমার বাচ্চারাও যদি করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়। অনেকেই বলছেন, ভাই, আমি কিছু ভাবতে পারছি না। করোনা ভাইরাস নিয়ে একটা অজানা ভয় আমার মধ্যে কাজ করছে।

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস নিয়ে এমন ভয় বা আতঙ্ক অনেকের মধ্যেই রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই ভয় বা আশঙ্কা অস্বাভাবিক কিছু নয় বলে মনে করেন মনোরোগ চিকিৎসকরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা বলছে, করোনাভাইরাস নিয়ে সৃষ্ট বিশ্ব মহামারির এই সময়ে আতঙ্কিত হওয়া, ভয় পাওয়া, অবসাদে ভোগা, রেগে যাওয়া, হতাশ হয়ে যাওয়া, এগুলো অতি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। মানুষ আতঙ্কিত হবে। ভয় পাবে। উদ্বিগ্ন হবে। তাদের আচরণের পরিবর্তন অবশ্যই হবে।

তাহলে করোনা ভাইরাস নিয়ে এই ভয়, আতঙ্ক, এমন পরিস্থিতিতে মানুষ কী করবে?

উত্তরে চিকিৎসকরা বলছেন, আমরা যদি আতঙ্কিত হই, আমরা যদি মানসিক চাপে ভুগতে থাকি, আমরা যদি ভয় পাই, উদ্বিগ্ন হই, তাহলে আমাদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমতে থাকবে। এমনিতেই আতঙ্কিত বা ভয় পেলে আমাদের শরীরের বিভিন্ন ট্রান্সমিটারে একটা তারতম্য ঘটে। তাতে স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । ফলে যিনি আতঙ্কিত হবেন, উদ্বিগ্ন হবেন, যার মধ্যে মানসিক চাপ বেশি থাকবে, তিনি কিন্তু সহজে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকবেন।

ভারত সহ সারা বিশ্বে করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের একটা বড় অংশ বৃদ্ধ মানুষ। ‘করোনাভাইরাস নিয়ে অনলাইনে, পত্রিকায়, টেলিভিশনে সর্বশেষ সব খবর আমরা জানতে পারছি । করোনা ভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। ঘরে আমাদের বৃদ্ধ বাবা মা রয়েছেন । আমাদেড় বাচ্চারা আজ ঘরে বন্দী। তবে চাকরির কারণে পুরুষ মহিলারা ঘরের বাইরে যাচ্ছেন। তাদের ভয় হয়, যদি আমরাও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হই। অনেকের মধ্যে এই ভয় কাজ করছে।

মনোরোগ চিকিৎসকরা মনে করেন, করোনা ভাইরাস নিয়ে যে বাস্তবতা, সেটা মেনে নিতে হবে। চিকিৎসকদের বক্তব্য, করোনা ভাইরাস সম্পর্কে আমাদের তেমন কোনো ধারণা নেই। যে জিনিসটা আমরা আসলে জানি না, সেই জিনিসটা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। আর এই অনিশ্চয়তা থেকেই আমাদের মধ্যে একধরনের ভয় হয়। ভয়টা আতঙ্কের রূপ নিতে পারে। যখন মানুষের করার কিছু থাকে না, তখন কিন্তু মানুষের মধ্যে একধরনের অসহায়ত্ব তৈরি করে। অসহায়ত্ব মানুষের মধ্যে একধরনের মানসিক চাপ তৈরি করে। ব্যক্তি বিশেষে একেকজনের মানসিক চাপ একেক রকমের হতে পারে । কারও হয়তোবা সামান্য ভয় লাগছে, কেউ হয়তোবা শঙ্কার মধ্যে আছে, অনেকে সাংঘাতিক আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছেন।

চিকিৎসকরা বলছেন, যখনই উদ্বেগ, ভয় মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে, তখন আমাদের মস্তিষ্ক বডি (শরীর) থেকে কিছু নিউরো কেমিক্যাল মোবিলাইজড করে। এটা যদি ক্রনিক হয়ে যায়, তখন আমাদের মধ্যে কিছু উপসর্গ তৈরি হয়। আমাদের যে ইন্টারনাল অর্গান সিস্টেম আছে, যেমন: ফুসফুস, লিভার, কিডনি, সেটাকে কিন্তু ইফেক্ট করতে পারে । অনেকের মাথাব্যথা হতে পারে। কারও আবার মাথা ঘোরাতে পারে । কারও ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ঠিক মতো ঘুম হচ্ছে না। অনেকের শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এই শারীরিক সমস্যাগুলো তাঁদেরই বেশি হবে, যাঁরা আগে থেকে উদ্বেগপ্রবণ। এর ফলে মেন্টালও ইফেক্ট হয়। শারীরিক উপসর্গের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক উপসর্গও দেখা দেয়। অনেকে খিটখিটে হয়ে যাবে। অল্পতে রেগে যাবে। মনোরোগ চিকিৎসকরা মনে করেন, করোনা ভাইরাসের এই কঠিন সময়টা আমাদেরকে মেনে নিতে হবে। আমরা যদি এটা মেনে না নিই, তাহলে কিন্তু আমরা এটা ফেস করতে পারব না।

এই করোনা পরিস্থিতি নতুন একধরণের একটা চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ আমাদেরকে মোকাবিলা করতে হবে। জীবনের কোনো কিছুই কিন্তু স্থায়ী না। যত দুঃসময় আসুক, এগুলো স্থায়ী না। এই পরিস্থিতি কিন্তু শেষ হবেই । করোনা ভাইরাস চলে গেলে অর্থনৈতিক মন্দা আসতে পারে। সেটাও কিন্তু চিরস্থায়ী নয়। সেখান থেকেও কিন্তু আমাদের বেরিয়ে আসার সুযোগ আসবে । এই বিশ্বাস কিন্তু আমাদের মধ্যে রাখতে হবে। এই পরিস্থিতি আমরা কোনোভাবে এড়িয়ে যেতে পারব না। আমরা যদি খুব আতঙ্কগ্রস্ত হই, উদ্বিগ্ন হই, তাতে আমাদের কোনো লাভ নেই। এটা আমাদেরকে বুঝতে হবে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here