মানবিকতার অনন্য নজির- গহনা বিক্রি করে কুকুরদের খাওয়াচ্ছেন গৃহবধূ

0
697

সংবাদদাতা, কল্যাণীঃ- দীর্ঘ সময় ধরে লকডাউন চলছে পুরো দেশজুড়ে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে যে লকডাউন চলছে এই সময়ে রাস্তার কুকুররা অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। মুষ্টিমেয় কতগুলি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এগিয়ে আসছেন তাদের খাওয়ানোর জন্য। কিন্তু আমাদের এই দেশের প্রতিটি রাজ্যের প্রতিটি জেলার প্রতি এলাকার এত সারমেয়র তুলনায় সংস্থা গুটি কয়েক মাত্র। তাই কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয় আপনার আমার পাড়ার এলাকার সকল সারমেয়দের প্রতিদিন খাওয়ানো। এই দায়িত্ব তাই আমাদেরকেই বহন করতে হবে স্বেচ্ছায়। ভুলে যাবেন না কুকুর মানুষের প্রকৃত বন্ধু। আর এই পৃথিবী শুধু আমাদের একার নয় এই পৃথিবী তাদেরও। তারা আমাদের ওপরই সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। তাই আমাদের ও উচিত একটু মানবিক হওয়া একটু সহৃদয় হওয়া। প্রতিদিনই মানুষের বাড়িতে কিছু না কিছু খাবার বেঁচে যায় যেগুলো আমরা হয়তো নর্দমায় বা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে থাকি। এই বেঁচে যাওয়া খাবার গুলো ফেলে দেওয়ার পরিবর্তে আমরা যদি কোন সারমেয়ের মুখে তুলে দিই তাহলে একটি জীবন বেঁচে যাবে এবং এরকম একটি মহৎ উদ্যোগের ফলে সৃষ্টিকর্তার আপনার উপর সদয় হবেন। আমরা আমাদের কর্ম অনুসারী ফল ভোগ করি। প্রত্যেকটা মুহূর্তে আমরা সৃষ্টিকর্তা মহান ঈশ্বরের কাছে কিছু না কিছু চেয়ে থাকি। কারণ তার কাছে আমরা অসহায়। আর অসহায় বলেই আমরা তাঁর কৃপা পাওয়ার আশায় বসে থাকি। ঠিক যেমন ভাবে আমরা মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে অসহায় ঠিক ততটাই অসহায় ঐ সারমেয়গুলিও। ভেবে দেখতে গেলে আমাদের থেকেও বেশি অসহায় তারা কারণ তারা দুটো খাবার পাওয়ার জন্য আমাদের ওপর নির্ভরশীল। এখন আপনি ভেবে দেখুন আপনি যদি আপনার সাধ্যমত বাড়ির বেঁচে যাওয়া পাতের ফেলে দেওয়া খাবার টুকু ও ঐ অসহায় ক্ষুধার্তের মুখে তুলে না দেন তাহলে আপনি কিভাবে আশা করেন মহান সৃষ্টিকর্তা আপনার প্রতি সদয় হবেন?

গোটা বিশ্ব করো না আতঙ্কে ভুগছে। দিনকে দিন করোনার সংক্রমণ বেড়ে চলেছে। বিশ্বজুড়ে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে লক্ষাধিক। কত মানুষ করোনার কবলে পড়ে মারা যাচ্ছেন। কত মানুষ অসহায়ের মতো বরণ করছেন মৃত্যু। এখন এই মুহূর্তে আমাদের প্রত্যেকটি মানুষের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরছে কেন সৃষ্টিকর্তা আমাদের কাতরডাক শুনছেন না? কেন তিনি আমাদের কৃপা করছেন না? কেন তিনি আমাদের এই সংকটময় অবস্থা থেকে রক্ষা করছেন না? আমাদের মন থেকে বিশ্বাস ক্রমশ উঠে যাচ্ছে তার প্রতি‌।এখন আপনি বলুন তো আপনি কি সত্যিই এমন কোনো কাজ করেছেন যাতে সৃষ্টিকর্তার মনে হয় আপনার জীবনটা এই সৃষ্টির জন্য মঙ্গল?আপনি কি সত্যি এমন কোন সহৃদয় তার পরিচয় দিয়েছেন যাতে সৃষ্টিকর্তার মনে হয়েছে তার সৃষ্টির জন্য আপনার জীবন টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?মানুষ ক্রমশ এতটাই অমানবিক হয়ে উঠছে যে ক্ষুদার্ত পশুপাখিদের খাবার দেওয়ার পরিবর্তে আঘাত করছে মারধর করছে! কিছুদিন আগেই দেখা গেলো একটি হনুমানকে পেরেক যুক্ত লাঠির আঘাত করে মেরে ফেলা হলো। তার একটিই অপরাধ ক্ষুধার্ত অবস্থায় সে অন্য একজনের বাড়ির সীমানায় প্রবেশ করেছিল! কিন্তু সব মানুষই এমন আমানবিক নন! মানবতা এখনও বেঁচে আছে!তাই তো প্রায়ই ভাইরাল হওয়া ছবিতে দেখা যায় একজন ভিখারিনী ভিক্ষার অন্ন থেকে রাস্তার কুকুরদের খাওয়াচ্ছেন! নিজের পাওয়া বিস্কুটের প্যাকেট থেকে নির্দ্বিধায় রাস্তার কুকুরদের বিস্কুট বিলিয়ে দিচ্ছেন একজন পাগল! বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার কুকুরদের খাবার খাওচ্ছেন পুলিশ!নিজের হাত খরচের টাকা জমিয়ে নিজের এলাকার এবং পার্শ্ববর্তী কতগুলি এলাকার কুকুরকে লকডাউনে খাওয়ানোর দায়িত্ব নিয়েছেন একজন ছাত্রী! কতটুকু সাধ্য তাদের কিন্তু তাদের সাধটা অনেক বড়! প্রতি মুহূর্তে মানবিকতার পরিচয় দিয়েও চলেছেন এই মানুষগুলি।কারোর প্রতি কোন অভাব অভিযোগ না করে নিজেদের নিজেদের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। আর আমরা ঘরে বসে টিভির চ্যানেল ঘোরাচ্ছি আর ওপরওয়ালার দিকে তাকিয়ে অভিযোগ করে চলেছি! রাস্তার কুকুরদের খাওয়ানোর কথা উঠলেই চতুরতার সাথে এড়িয়ে যাচ্ছি। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বাড়ির পাশের অসহায় দীন দুঃখী মানুষটাকে দু’মুঠো খাবার দিতে পারিনা।‌পাতে বেঁচে যাওয়া খাবার ডাস্টবিনে ফেলে দিই অথচ মৃতপ্রায় কুকুরদের মুখে তুলে দিই না। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলি -আমি কেন আর ও তো অনেকেই আছে! আবার আমরা আশা করি ওপরওয়ালা আমাদের বাঁচবেন!

অনেক তো হলো অভাব-অভিযোগ ছেড়ে এবার একটু নিজের কাজ করুন- মানবতার কাজ যে কাজ আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে -অমর করে রাখবে এই পৃথিবীতে। কিছুদিন আগেই বর্ধমানের গোদা খন্দকরপাড়া এলাকাতে কেরোসিন ঢেলে শাবক-সহ মা সারমেয়টির গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন একজন মহিলা। কলকাতার এনআরএস হাসপাতালে সারমেয় শাবকদের হত্যার নৃশংসতা দেখেও সকলে শিউরে উঠেছিলেন। কিন্তু আজ আর অমানবিক নৃশংস ঘটনা নয় আজ আপনাদের কে বলবো একটা মানবিকতার কথা-নদীয়ার কল্যানীর বাসিন্দা নীলাঞ্জনা বিশ্বাস এর কথা। ইনি ছোট থেকেই ছিলেন -পশু প্রেমী। ছোটবেলায় নিজের এলাকার নিজের পাড়ার কুকুরদের খাইয়েছেন। আর আজ তিনি একজন সমাজ সেবিকা, গৃহবধূ। আজ এই লকডাউনের মধ্যে নিজের সোনার গয়না বিক্রি করে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে রাস্তার প্রায় ৫০০টি সারমেয়কে প্রতিদিন দুপুরে খাওয়াচ্ছেন। সারমেয়দের খাওয়ানোর পাশাপাশি তাদের চিকিৎসার জন্য ও তিনি ব্যয় করেন অর্থ। তার পরিবারের লোক থেকে শুরু করে পাড়া প্রতিবেশী সকলের বিরোধীতাকে উপেক্ষা করেও তিনি এই অবলা অসহায় দের জন্য নীরবে করে গেছেন। কল্যাণী শহরের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুধার্ত সারমেয়দের জন্য খাবার নিয়ে পৌঁছে যান তিনি। এতবড় একটি কর্মযঞ্জে স্বামীকে পাশে পাননি। পাশে পেয়েছেন ছেলে আশুতোষ‌ ও ভাসুরের মেয়ে তানিয়াকে। সারমেয়দের জন্য এই সকল কাজ তিনি বহু বছর ধরে করে চলেছেন শুধু নিজের ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে। কিন্তু এর বিনিময়ে তিনি কিছুই চাননি। প্রচারের আলোয় আসতে ও চাননি তিনি। তার নিবেদন একটিমাত্র-প্রচার নয়, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন সবাই এই পথ কুকুরদের দিকে।

আশা করি সকলেই‌ বুঝতে পারছেন মানবিক হ‌ওয়ার জন্য সবসময় ধনী হতে হয় না,সদিচ্ছা থাকলে নিজের হাতখরচের টাকা জমিয়ে,বাড়তি খরচ কমিয়ে এই কাজগুলি করাই যায়।আর আপনি হয়ত পাঁচশোটা কুকুরকে খাওয়াতে পারবেন না কিন্তু আপনি চাইলৈই আপনার এলাকার একটি কুকুরকেও দুবেলা দু মুঠো খেতে দিতে পারেন। এই সামর্থ্য আমাদের প্রত্যেকের ই কম বেশী আছে। কিন্তু ইচ্ছার অভাব!তাই ওপর ওয়ালার কৃপা পার্থনা করার আগে চলুন না আমরা নিজেরাই একটু দয়ালু হ‌ই। একটু মানবিক হ‌ই। আমাদের কাজ টুকু আমরা করি। স্বামীজি বলেছিলেন -জীবের সেবা করাই হলো প্রকৃত ঈশ্বরের সেবা। আর আমরা দীন,দুঃখী, হতদরিদ্র,অসহায়,প্রতিবন্ধী মানুষ এবং এই সকল পথের অবলা প্রাণীদের ভুলেই ঈশ্বরের করুণা পেতে চাইছি!আশ্চর্যের কথা নয় কি?

সকলেই লকডাউন বিধি মেনে চলুন। সুস্থ থাকুন।ভালো থাকুন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন।মানসিক দূরত্ব যেন না হয়।অপ্রয়োজনে বাইরে বেড়োবেন না।আর বাইরে বেরোলে অবশ্য ই মাস্ক পড়ুন‌।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here