করোনা ত্রাসের মাঝেই ভিড়ে গিজগিজ করছে সিটি সেন্টারের পাড়ায়ঃ অবৈধ নেশা মুক্তি কেন্দ্র গুলি

0
1487

নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুরঃ- সারা দেশ তথা আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গও চলছে লকডাউন। করোনা ভাইরাস আতঙ্কে এখন মানুষ গৃহবন্দী। ইতিমধ্যে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্র সরকারের আদেশে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সমস্ত স্কুল-কলেজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলিকে। অনেক লোকের জমায়েত আছে এমন প্রতিটি জায়গাতে জোর নজরদারি চালাচ্ছে রাজ্য প্রশাসন।

এরইমধ্যে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ দুর্গাপুরের অভিজাত এলাকা সিটি সেন্টারের মানুষজনের। বাসিন্দাদের অভিযোগ সিটি সেন্টারের ঘনবসতি এলাকাতে চলছে বেশ কিছু নেশা মুক্তি কেন্দ্র। সিটিসেন্টার জুড়ে বসতবাড়ির নিচের তলাটিকে ভাড়া নিয়ে চলছে এই বেশ কয়েকটি নেশা মুক্তি কেন্দ্র। এই নেশা মুক্তি কেন্দ্র গুলির প্রত্যেকটিতে কোথাও ২৫ জন কোথাও ৩৫ জন করে রোগী রয়েছেন বলে অভিযোগ। সিটি সেন্টারের বাসিন্দাদের অভিযোগ পেয়ে আমরা খোঁজ খবর নিতে শুরু করি এই নেশা মুক্তি কেন্দ্র গুলির।

‘এই বাংলায়’ নিউজ পোর্টাল এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় “ইশান ফাউন্ডেশন” নামক এক সংস্থার কর্ণধারের সাথে। “ইশান ফাউন্ডেশন” নামক এই সংস্থাটি ১১২ মৌলানা আজাদ রোড, সিটি সেন্টারে অবস্থিত। সংস্থার কর্ণধার প্রতীপ মুখোপাধ্যায় ও শুভম ভট্টাচার্যী। ওই বাড়িটিতে গ্রাউন্ড ফ্লোরে ২,৫০০ স্কয়ার ফুট জায়গা জুড়ে ভাড়া নিয়ে বছর দুই ধরে রয়েছেন তারা। সংস্থার কর্ণধার প্রতীপ মুখোপাধ্যায় জানান এই সংস্থাটি শুরু করেছেন তারা মূলত গাঞ্জা ,মদ ও ড্রাগস এর সঙ্গে জড়িত যে সব ব্যক্তিরা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন তাদের মুক্তির জন্য। দুর্গাপুর তথা আশেপাশের অঞ্চলের প্রায় ২৫ জন রোগী রয়েছেন এখন তাদের কাছে। এই লকডাউন অবস্থাতে যে ২৫ জন রোগী তাদের কাছে রয়েছেন তাদের খাওয়া-দাওয়া থেকে ওষুধপত্রের সমস্ত কিছুর বন্দোবস্ত করে রেখেছেন তারা, বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে তাদের। তাদের কাছে থাকা ২৫ জন রোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়নি। তবে তিনি জানিয়েছেন তারা নিজেদের উদ্যোগে একজন ডাক্তার বাবু কে ডেকে এনে ১০ দিন আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছেন কিন্তু তার কোন প্রমান তাদের কাছে নাই। প্রশ্ন হল এই করোনা ভাইরাসের সময় কেন তারা রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে যোগাযোগ করে রোগীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাননি, তবে উত্তর পাওয়া যায়নি।

এই সংস্থাটি “ট্রাস্টি বোর্ড” রেজিস্ট্রেশন অনুসারে চালাচ্ছেন তারা, কিন্তু তাদের কাছে দুর্গাপুর পুরসভার পক্ষ থেকে দেওয়া ট্রেড লাইসেন্স, স্বাস্থ্য দপ্তর বা সমাজ কল্যাণ দপ্তর এর কোন রকম ছাড়পত্র নেই বলে জানা গেছে । স্বভাবতই প্রশ্ন থাকে কি করে এতগুলি মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন তারা। কেনইবা পুলিশ প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের নজরে এখনো পর্যন্ত আসেনি তাদের এই কর্মকাণ্ড করোনা ভাইরাসের কঠোর নিষেধাজ্ঞার সময় ঐ।

সংস্থার কর্ণধার প্রতীপ মুখোপাধ্যায় জানান প্রতি মাসে প্রতি রোগীর কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে বসতবাড়িতে কি করে একটি সংস্থা বাণিজ্যিক কাজ করার অনুমোদন দিল দুর্গাপুর পুরসভা। কি করেই বা বিনা ট্রেড লাইসেন্স কাজ করছেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কেন খোঁজখবর নেওয়া হয়নি গাদাগাদি করে থাকা এই রোগীদের । প্রশ্ন অনেক কিন্তু উত্তর নেই একটিরও।

এমনই আরেকটি সংস্থা রয়েছে ৫৯ নম্বর, প্রণবানন্দ এভিনিউ, সিটি সেন্টারে , সংস্থার নাম “রেস্কিউ ফাউন্ডেশন”। দুর্গাপুরের সি.এম.ই.আর.আই সেন্ট্রাল স্কুলের বিপরীতে এই সংস্থাটি চলছে প্রায় বছর তিনেক ধরে। এই সংস্থার কর্ণধার অভিজিৎ ভাওয়াল জানান তাদের এখানে এখনো পর্যন্ত ৩৫ জন নেশাগ্রস্ত রোগী আছেন। এই সমস্ত রোগীদের খাওয়া এবং পরিচ্ছন্নতার দিকে তারা সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন। এখানো বসতবাড়ির নিচের তলাটিকে পুরো ভাড়া নিয়ে চলছে এই সংস্থাটি। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সিটি সেন্টারে কি করে বাণিজ্যিক কাজের জন্য বসত বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। সংস্থার কর্ণধার জানান “সোসাইটি” রেগিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অনুসারে তারা এই সংস্থাটি খুলেছিলেন। তাদের কাছে মূলত রোগী আছেন বাঁকুড়া, বীরভূম, আসানসোল ,মুর্শিদাবাদ ও দুর্গাপুর সংলগ্ন এলাকা থেকে। তাদের কাছেও দুর্গাপুর পুরসভার পক্ষ থেকে দেওয়া ট্রেড লাইসেন্স, স্বাস্থ্য দপ্তর বা সমাজ কল্যাণ দপ্তর এর কোন রকম ছাড়পত্র নেই বলে জানা গেছে। তাদের কাছে থাকা ৩৫ জন রোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়নি। জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর কে তারা কোনরকম যোগাযোগ করেননি বা প্রয়োজন মনে করেননি।

এমত অবস্থায় স্বভাবতই সিটি সেন্টারের সাধারণ বাসিন্দারা আতঙ্কে ভুগছেন এইসব নেশাগ্রস্ত রোগীদের কারণে। তাদের বক্তব্য কখন কোন লোক এখানে আসছে যাচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই, নেই কোনো পর্যাপ্ত পরিকাঠামোও। তাও কি করে এরা এখানে এই ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন জানি না। সিটি সেন্টার এলাকার বিশিষ্ট সমাজসেবী পরিমল অগস্তি কে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান ” বহুবার এই সম্বন্ধে সংশ্লিষ্ট পুরসভা ও বিভিন্ন মহলে অভিযোগ করেছেন কিন্তু তার ফল এখনো কিছু হয়নি।” তিনি আরো বলেন ” এই সমস্ত নেশা মুক্তি কেন্দ্র গুলি সম্পূর্ণভাবে অবৈধ ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চলছে। অবিলম্বে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর , জেলা প্রশাসন ,পুলিশ প্রশাসন ও দুর্গাপুর পৌরসভা কে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করছি , অন্যথা কোন একদিন বড় বিপদের সম্মুখীন হতে হবে সিটি সেন্টারের সাধারণ নির্দোষ বাসিন্দাদের।” সাধারণ সিটি সেন্টার বাসীদের আরো অভিযোগ যারা এই সংস্থাগুলি খুলেছেন বা তাদের কর্ণধারা তারা নিজেরাও একসময় নেশাগ্রস্ত ছিলেন এবং কোন না কোন নেশা মুক্তি কেন্দ্র থেকে তারা নিজেদেরকে সুস্থ করে আবার ফিরে এসেছেন দুর্গাপুরের এই সুস্থ পরিবেশ কে অসুস্থ করার লক্ষ্যে।

এদিকে বিষয়টি নজরে আসতেই দুর্গাপুর পুরসভার মেয়র পারিষদ (স্বাস্থ্য) রাখি তেওয়ারি বললেন “এই বিষয়টি আমার নজরে আসতেই ডেকে পাঠায় ওই দুই সংস্থার কর্ণধার কে, কিন্তু তারা এই ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। এখন করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউন চলছে, এমত অবস্থায় তাদেরকে আদেশ দিয়েছি অবিলম্বে একজন ডাক্তারকে দিয়ে প্রত্যেকটি রোগীকে আলাদা আলাদা করে পরীক্ষা করে তারপর সেই রিপোর্ট আমার দপ্তরে জমা দিতে।” তিনি বললেন ” বিষয়টি গুরুত্ব বুঝে দুর্গাপুর পুরসভার মেয়র সাহেবকে জানিয়েছি। মেয়র সাহেব এই সময় লকডাউন চলাকালীন কোনো বড় পদক্ষেপ নিতে চাইছেন না। কিন্তু লকডাউন উঠে গেলেই পুরসভা , জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হবে যথাযথ আইন মেনে। যে সমস্ত বাড়িওয়ালারা এই সমস্ত সংস্থাকে মোটা টাকার লোভে ভাড়া দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে পুরসভার পক্ষ থেকে।” রাখি তেওয়ারি ইতিমধ্যে দুর্গাপুর পুলিশ প্রশাসনকে এই সংস্থা গুলির কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে অবগত করেছেন বলে জানিয়েছেন। এখন শুধু দেখার সময় , প্রশাসনের পক্ষ থেকে কি পদক্ষেপ নেওয়া হয় , এই সমস্ত অবৈধ নেশা মুক্তি কেন্দ্র গুলির বিরুদ্ধে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here