রমরমিয়ে চলছে বালির অবৈধ প্যাড কারবার, ঘনঘন পরিবর্তন হচ্ছে প্যাড

0
859

সংবাদদাতা, বর্ধমান:– লকডাউন মিটতে না মিটতেই ফের জোর কদমে শুরু হয়ে গেল বালি পাচারের জন্য অবৈধ প্যাড। করোনা উদ্ভুত পরিস্থিতি সৃষ্টির আগে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া এবং হুগলী জেলার জন্য আলাদা আলাদা ভাবে প্যাড চালু করে একটি সিণ্ডিকেট। যে সিণ্ডিকেটের জাল কলকাতা থেকে জেলাস্তরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়ানো রয়েছে। সাম্প্রতিককালে বেঙ্গল (ইষ্ট) স্যাণ্ড ব্লক ওনার্স, পার্টনারস এণ্ড ওয়ার্কাস এ্যাসোসিয়েশনের নামে রমরমিয়ে চলতে থাকে এই প্যাডের কারবার। যে প্যাডে লেখা ছিল ডেভেলপমেণ্ট ফাণ্ড। সরাসরি ওই প্যাড বা কুপনে ১২০টাকা করে নেওয়ার কথা লেখা থাকলেও বাস্তবে নেওয়া হতে থাকে কয়েক হাজার টাকা করে। অবৈধ এই প্যাডের রমরমা কারবার নিয়ে খবর প্রকাশিত হতেই নড়েচড়ে বসে জেলা প্রশাসনও। শুরু হয় প্রশাসনিক অভিযান। এর ফলে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় গোটা কারবার। প্রশ্ন ওঠে যে সংগঠনের নামে ওই প্যাড বা কুপন চালু করা হয়েছে ডেভেলপমেণ্ট ফাণ্ডের নামে তাঁদের আসল ভিত্তি কি? প্রশ্ন ওঠে কিসের ডেভেলপমেণ্ট ফাণ্ড? এই টাকায় কাদের এবং কিসের উন্নতি করা হবে? কিন্তু কোনো উত্তর মেলেনি। কারণ এই প্যাডের কারবারীরা থাকেন সবসময়ই পর্দার অন্তরালে। কার্যত সমস্ত রাজনৈতিক দলের মদতেই এবং পৃষ্ঠপোষকতায় এই বালির সিণ্ডিকেট রাজের কারবার নতুন কিছু নয়। দীর্ঘকাল ধরেই এই ট্রাডিশান চলে আসছে। এদিকে, চলতি বছরের শুরুতেই আচমকাই এই প্যাডের কারবার বন্ধ হয়ে যায়। তারই মধ্যে করোনার আবহে বন্ধ হয়ে বালিঘাট। সম্প্রতি লকডাউন উঠতেই ফের শুরু হয়েছে বালির কারবার। কিন্তু আবার পরিবর্তন ঘটানো হল প্যাডের। একেবারে বাম আমল থেকেই বালি ও কয়লার জন্য যে প্যাড চালু ছিল তা ছিল ঠাকুর দেবতার ছবি, ফুলের ছবির মত বেশ কিছু সাংকেতিক ছবি সম্বলিত কুপন বা প্যাড। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রীতিমত আধুনিক সাজে ফিরে এসেছে প্যাডের গঠন। চাঁদার বিলের ঢঙেই আপাতদৃষ্টিতে কোনো গলদ খুঁজে পাওয়া যাওয়ার কথাও নয় নয়া এই প্যাডের। এদিকে, লকডাউনের পর নতুন করে বালিঘাটগুলি চালু হতেই আবার মাথা চাড়া দিয়েছে বালি মাফিয়ারা। শুরু হয়েছে নতুন করে প্যাডের কারবার। নয়া চালু এই প্যাড থেকে উধাও হয়ে গেছে সেই সংগঠনের নাম। পরিবর্তে এসেছে (ডবলু.বি) স্যাণ্ড ব্লক ওনারস এণ্ড ওয়ার্কাস (ডেভেলপমেণ্ট) নামের প্যাড। ডেভেলপমেণ্ট ফাণ্ডের জায়গায় স্থান নিয়েছে শিলামপুর থেকে হুগলী। প্যাড বা এই কুপনে নেই কোনো টাকার অংক। রয়েছে দুধরণের প্যাড – একটি ৬ চাকার জন্য এবং অন্যটি ১০ চাকার জন্য। জানা গেছে, বর্ধমান থেকে হুগলী এই প্যাডে ৬ চাকার জন্য নেওয়া হচ্ছে ৩৩০০ টাকা এবং ১০ চাকার জন্য ৪৩০০ টাকা। একেবারেই বাধ্যতামূলকভাবে ট্রাক চালকদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে টাকা আদায় করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, প্যাডের এই কারবারের ঘটনায় ইতিমধ্যেই বাঁকুড়া সহ কয়েকটি জায়গায় ক্ষোভ উস্কে উঠেছে। সম্প্রতি বর্ধমানের কয়েকটি বালিঘাটের কর্মীরা সমবেতভাবে এই প্যাডকারবারীদের ধরতে হানা দেবারও চেষ্টা করেন। কিন্তু লাভ হয়নি। জানা গেছে, বর্ধমানের পালসিটে, গলসী ও বুদবুদে আসানসোলের নাম্বারকৃত চারচাকার গাড়িতে রীতিমত মাসলম্যান নিয়ে এই বালি মাফিয়ার হাজির থাকছেন। রাস্তায় বালির গাড়ি আটকাচ্ছেন তাঁরা। গাড়িতে প্যাড না থাকলে জোরজবরদস্তি তাঁদের প্যাড নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। প্যাড নিতে অস্বীকার করলে তাঁদের নানাভাবে অত্যাচারও করা হচ্ছে। ফলে ভয় ও আতংকে গাড়ি চালকরা বাধ্য হচ্ছেন প্যাড নিতে। শুধু এটাই নয়, জানা গেছে, প‌্যাড কারবারীরা প্রতিটি বালিঘাটেই লোক নিয়োগ করে রেখেছে। স্থানীয় যুবকদের এই কাজে নিয়োগ করে তাদের প্রায় মাসিক ১০ হাজার টাকা করে বেতনও দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি বালিঘাটেই স্থানীয় যুবকদের পাশাপাশি একজন করে বালি মাফিয়াদের লোকও হাজির থাকছেন। বালিঘাট থেকে গাড়ি উঠলেই তাঁরা প্যাড দিচ্ছেন। এত কিছুর পরেও কেউ যদি ফাঁক ফোকর দিয়ে গলে যায় তাহলে রাস্তায় বালি মাফিয়াদের চেকিং টিম তাদের ধরছেন। জানা গেছে, এই টিমের কারও নাম রাজকুমার, কারও নাম কাজল প্রভৃতি। যদিও এই নামগুলি তাঁদের আসল নাম নাকি পোশাকী নাম – তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে। এই মাফিয়া টিমের কেউ কেউ কালো রংয়ের বোলেরো গাড়িও ব্যবহার করছেন। সঙ্গে থাকছে বাউন্সারের টিম। ফলে সবমিলিয়ে ভয়ানক আতংকের মধ্যেই কাটাচ্ছেন বালি বহনকারী গাড়ি চালক থেকে গাড়ির মালিকরাও। কারণ এভাবে তোলাবাজির টাকা দিতে গিয়ে আখেরে বালির দামে তার প্রভাব পড়ছে। সাধারণ মানুষের ওপর গিয়ে চাপছে বালির অতিরিক্ত দাম। শুধু এটাই নয়, একইসঙ্গে এই প্যাড নামক অবৈধ কারবারে টাকা দিতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারী নির্দিষ্ট মাপের তুলনায় বেশি বালি লোড করে নিয়ে যাচ্ছেন গাড়ি চালকরা। ফলে দ্রুত রাস্তা, নদীবাঁধ ভেঙে তছনছও হয়ে চলেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here