‘কুঁজ’ আসলে গরু – বচনের গোপন পাসওয়ার্ড

0
606

সুবর্ণ ন্যায়ধীশ:- কুঁজ। সাদামাঠা দু’ অক্ষর। তবে, চন্দ্রবিন্দু, উ-কার মিলেমিশে গোড়াতেই কেমন যেন অষ্ট্রবক্র ভাব!

এই বাঁকাচোরা গড়ন নিয়ে যুগ যুগ ধরে লুকিয়ে থাকে কুঁজ। প্রকাশ্যে আসায় বিস্তর লজ্জা তার। কিন্তু, আর তার লুকিয়ে থাকা হল না। রাজ্য রাজনীতি সরগরম করে ‘কুঁজ’ এখন প্রকাশ্যে। সমস্ত লজ্জা ছুঁড়ে ফেলে কুঁজই এখন বাঙালীর বিষম তুলেছে। মনে রাখা ভাল – কুঁজ থেকেই কিন্তু কুঁজোর উৎপত্তি । অর্থাৎ, যার কুঁজ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি প্রকট সে কুঁজো। একজন কুঁজো চিরটাকালই নিজের পিঠের অবাঞ্চিত বর্ধিত, প্রকট দৈহিক পিন্ডকে আপ্রান আড়ালে রাখার চেষ্টা করে। ঢিলে ঢালা জামা অথবা শক্ত বক্ষ – বন্ধনী দিয়ে নিজেকে ‘সোজা’ রেখে বাইরে আসার প্রচেষ্টা কুঁজোদের অনন্তকালীন উপায়। কারন? কোনো যুক্তি থাক বা না থাক – একজন কুঁজোকে দুনিয়ার সর্ব দেশে, সব সমাজে খাটো চোখে দেখা হয় – ব্যঙ্গঁ করা হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর ভিক্টর মারি হুগো’র কালজয়ী উপন্যাস – “দ্য ম্যান হু লাফস”র বিকৃত দর্শন চরিত্র ‘ কোয়াসি মোদো’ সহজে ভোলার নয়! জাষ্ট পিঠে অস্বাভাবিক একটি কুঁজের দরুন নিতান্ত ভাল মানুষ, কঠোর পরিশ্রমী হয়েও তার উপস্থিতি ফরাসী সমাজে বিরক্তি আর ব্যঙ্গেঁর বিষয় ছিল। তার উপকার নিয়েও তাকে উপহাস করতো সকলে।

আর বাংলায়? শতাব্দী প্রাচীন ব্যাঙ্গাত্মক শ্লেষ তো রয়েছেই কুঁজ-কেন্দ্রিক। কোনো দুর্বল, অসমর্থ বা অসম কেউ যখন কোনো আকাশ চুম্বি কিছুর স্বপ্ন দেখেন, তাকে তখন তির্যক শ্লেষ শুনতে হয়- “কুঁজোর আবার চিৎ হয়ে শোওয়ার শখ!!”

অনাদিকাল ধরে কুঁজের এহেন দশার মাঝেই বাঙলার রাজনীতিতে বেশ গরিমা নিয়েই ফিরে এসেছে কুঁজ। তবে, কোনো কুঁজো লোকের কুঁজ নয়। বেশ ‘হাম্বা’ ‘হাম্বা’ ডাক ছাড়া গরু’র কুঁজ। কারন ওই কুঁজ নাকি আসলে জ্যান্ত সোনার খনি। রাজ্য বিজেপি’র সভাপতি দিলীপ ঘোষের নবতম গবেষনার ফসল এটি। সোমবার ‘ ঘোষ ও গাভী কল্যান সমিতি’র সভায় এসে, গরু নিয়ে কিঞ্চিৎ বেশি আহ্লাদিত হয়ে দিলীপ বলে ফেললেন,” বিদেশী গরুরা আসলে গরু-ই নয়। ওরা একধরনের জন্তু। ওরা হাম্বা হাম্বা ডাক দিতেও জানেনা। আমাদের দেশের গরু আমাদের ‘গো-মাতা’ আর বিদেশি গরু হল আন্টি।” এখানে থেমে গেলেও তবু চলতো, আবেগের তাড়নায় ঘোষ সমাজকে তৈলমর্দন করতে গিয়ে উনি বলে বসলেন “ওদের গরুর দুধ সাদা আর আমাদের গরুর দুধে হলদে রঙ আছে। আসলে দেশি গরুর দুধে সোনা থাকে। গরুর পিঠের কুঁজেই থাকে সোনা। গায়ে রোদ পড়লে, কুঁজ থেকে ওই সোনা স্বর্ণনালী বেয়ে গরুর দুধের সাথে বাইরে আসে”।

দিলীপের এই গরু-উবাচ নিয়ে সারা রাজ্য তোলপাড়। হাসাহাসি চলছে সর্বত্র। একটি রাজনৈতিক দলের রাজ্য প্রধানের এ হেন ” বৈজ্ঞানিক” গবেষনার ফল নিয়ে বিদ্দজনেরা কটুক্তি করতেও ছাড়ছেন না। প্রশ্ন – কুঁজে আস্ত সোনার খনি নিয়ে মাঠে ঘাটে চরে বেড়ায় গরু, আর দেশের কোলারে স্বর্ণ খনিতে দিন – রাত ঘাম ঝরানো মজুরেরা বেকারই তবে বেগার খেটে মরে।

গেরুয়ারা গরু নিয়ে বড্ড ব্যস্ত! কেউ বলছেন গরু খুব উপকারী প্রানী, বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড নেয় আর অক্সিজেন ছেড়ে বাতাস পরিশোধন করে। কেউ বলছেন গরুর মূত্রই হল ক্যান্সারের মতো মারন রোগ সরানোর মহৌষধী! সব ভুলভাল কথাবার্তা জেনেও কেন তারা এসব কথা বলেন?

আসল বিষয় হল- আজগুবি, অবাস্তব কথা বলে গুঁতোগুঁতি করে কোনওভাবে চর্চায় ঢোকাই হল উদ্দেশ্য। কেউ তর্ক বাঁধালেই- গরু, মসুলমান, পাকিস্তান বিষয়ে সহজে ঢুকে পড়া যাবে। বিজেপি’র গরুর রচনা আসলে এটাই। যার পাসওয়ার্ডটাই হল গরু। কারও সাথে গরুর দুধে সোনার তত্ব নিয়ে তর্ক জুড়ুন, নীট ফল হবে এই – গেরুয়া-গুনী আপনাকে হয় ‘পাকিস্তানের দালাল’ নয়তো ‘মোল্লা’ চিহ্নিত করবেন। তাই, উঠতে – বসতে, কথায়, বার্তায় আস্ত গরু-ই এনাদের পাসওয়ার্ড। সেই পাসওয়ার্ড এর লিংকই হল কুঁজ!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here