ডিজেলে নয়, অভিযোগ কেরোসিনেই চলছে যাত্রীবাহী বেসরকারি বাস

0
2953

নিজস্ব প্রতিনিধি, দুর্গাপুরঃ বর্তমান সরকারের আমলে রান্নার গ্যাস সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় আজকাল বাড়িতে বাড়িতে আর কেরোসিনের প্রয়োজন খুব একটা চোখে পড়ে না। গরীব বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার কিংবা যেসমস্ত গ্রামগুলিতে এখনও পর্যন্ত বিদ্যুতায়ন হয়ে ওঠেনি সেইসমস্ত গ্রামে সন্ধ্যার পর কেরোসিনের লম্ফ জ্বললেও তা খুবই অপ্রতুল। কিন্তু কেরোসিনের ব্যবহার গৃহস্থের বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গেলেও এই কেরোসিনই এখন বিভিন্ন বেসরকারি বাস মালিকদের অন্যতম ভরসা। কারণ, আসানসোল, বরাকর, রানীগঞ্জ, দুর্গাপুর, বর্ধমান ও বাঁকুড়ার প্রায় ১৫০টিরও বেশি বাস আছে। যার মধ্যে প্রায় অর্ধেকের বেশি বেসরকারী বাস এখন আর ডিজেলে চলে না, চলে কেরোসিন তেলের সাহায্যে। শুনতে অবাক লাগলেও এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে একাধিক বেসরকারী বাস মালিকদের বিরুদ্ধে। সূত্র মারফত জানা গেছে, আগে যে সংখ্যক বেসরকারি বাস শহরের বিভিন্ন প্রান্তের পেট্রোল পাম্পগুলিতে ঢুকত গত কয়েক বছরে সেই বাসের পরিমাণ অনেকটাই কমেছে। এর প্রধান কারণ অবশ্যই বাজারে পেট্রোল-ডিজেলের দামবৃদ্ধি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাস মালিকের কাছে এবিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, যে হারে ডিজেলের দাম বাড়ছে তাতে সৎপথে ব্যবসা চালানো দুরুহ ব্যাপার। তিনি জানান, বাজারে লিটার প্রতি কেরোসিন তেলের দাম ৫০ টাকা, সেখানে এক লিটার ডিজেলের জন্য খরচ করতে হয় ৬৯ টাকা। তাই খরচ বাঁচাতে ৩০ লিটার কেরসিনের সঙ্গে ১ লিটার মবিল মিশিয়ে তা বাস চালানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। তার এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাওয়া হয় এই কেরোসিন ব্যবহারে বাসের ইঞ্জিনের কোনও ক্ষতি হয় না? এর উত্তরে তিনি জানান, দীর্ঘদিন কেরোসিন ব্যবহারের ফলে ইঞ্জিনের ক্র্যাঙ্ক ও পিস্টন খারাপ হয়ে যায়, কিন্তু ইঞ্জিনের কাজ করিয়ে যা খরচ হয় কেরোসিন ব্যবহার করলে সেই খরচ পুষিয়ে যায়। সেই বাস মালিকের কাছে প্রশ্ন করা হয়, বেআইনিভাবে কেরোসিন তেল ব্যবহার করায় যে দূষণ হচ্ছে তা থেকে পুলিশ প্রশাসন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নজর এড়িয়ে কী করে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা? এর উত্তরে তার নির্লিপ্ত জবাব, আমাদের বাস মালিক সংগঠন আছে এবং আমাদের ওই সমস্ত বিষয়গুলি দেখার জন্য বেশকয়েকজনকে রাখা হয়েছে যারা এইসমস্ত প্রশাসনিক বিষয় “ম্যানেজ” করে নেন। এরপর ওই বাস মালিক আমাদের কাছে পাল্টা প্রশ্ন করেন এইবিষয়ে সংবাদমাধ্যম এত খোঁজখবর কেন নিচ্ছে? তার প্রশ্নের উত্তরে খবর করা হবে জানালে বেশ একপ্রকার জোর গলায় চেঁচিয়ে ওঠেন তিনি। তার অভিযোগ, গত ১০ বছরেরও বেশী সময় ধরে অন্দ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু সহ বাইরের রাজ্য থেকে যে ট্রাকগুলি এরাজ্যে ডিম ও মাছ নিয়ে ঢোকে তারা ৫০-৫০%(শতাংশ) ডিজেল ও কেরোসিন ব্যবহার করে গাড়ি চালান। পশ্চিমবঙ্গের কোনও পেট্রোল পাম্প থেকে তারা তেল ভরেন না, বরং ট্রাকে রাখা ব্যারেল ব্যারেল কেরোসিন তেল ব্যবহার করেই তারা শয়ে শয়ে কিলোমিটার রাস্তা যাতায়াত করে। তাহলে তারা যদি নিজেদের লাভের হার বজায় রাখতে কেরোসিন ব্যবহার করতে পারে তাহলে আমরা ছোট-খাটো পরিবহণ ব্যবসায়ী, আমরা করলেই দোষ! বাসে ডিজেলের বদলে কেরোসিন তেল ব্যবহার প্রসঙ্গে কয়েকজন বাসযাত্রীকে প্রশ্ন করা হলে তারা জানান, বাসে ভিড় থাকলে কেরোসিন তেলের পোড়া কটু গন্ধ নাকে লাগে, মাঝে মাঝে সেই গন্ধে অসুস্থতাবোধও করেন কিছু কিছু যাত্রী। বাস যাত্রীদের বক্তব্য, সব জেনেও প্রতিবাদ করার কোনও উপায় নেই, কারণ একদিকে কাজে যাওয়ার ব্যস্ততা অন্যদিকে বাস চালক ও কন্ডাক্টরদের অভব্য আচরণ সীমা ছাড়িয়েছে। তাই নিজের সম্মান বাঁচাতে চুপ করে থাকাই ভালো বলে মনে করেন তারা। এইসমস্ত অভিযোগ নিয়ে দুর্গাপুরের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পরিষদের আধিকারিক শ্রী বিপ্লব বৈদ্যর সাথে যোগাযোগ করে সমস্ত ঘটনা জানাতেই তিনি অবাক হলেন। তার একটাই বক্তব্য, যদি এমনটা হচ্ছে তাহলে তা ভয়ানক রকম অপরাধ। এর জন্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নির্দিস্ট ধারায় উল্লেখ আছে। তবে সবার আগে রাজ্যের মোটর ভেহিক্যালস দফতরকে এগিয়ে আসতে হবে ঘটনার তদন্তে। প্রয়োজন হলে কীরূপ দূষণ ওইসব যানবাহনগুলি থেকে নির্গত হচ্ছে তা পরীক্ষা করে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ দেখবে ও পুলিশ প্রশাসন ও মোটর ভেহিক্যালস দফতরকে সহযোগিতা করবে। এরপরেই আমরা দুর্গাপুরের ভারপ্রাপ্ত রাজ্য মোটর ভেহিক্যালস দফতরের আধিকারিক ARTO-র কাছে এই ঘটনাটি জানালে, তিনি সমস্ত ঘটনা শুনে আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি জানান, এ তো সরাসরি মোটর ভেহিক্যালস আইনের উলঙ্ঘন। খুব তাড়াতাড়ি আমরা একটি তদন্ত দল তৈরি করে সমস্ত বেসরকারি যাত্রীপরিবহণ বাসগুলিকে পরীক্ষা করব ও যত দূর সম্ভব এই বেআইনি কাজ বন্ধ করার জন্য তৎপর হব। চ্যানেল এই বাংলায়-এর প্রশ্ন একটাই, একদিকে যখন গ্রিন সিটি, সবুজায়ন, সেফ ড্রাইভ, সেভ লাইফ নিয়ে এত মাতামাতি রাজ্য প্রশাসনের তখন কেনই বা এতদিন ধরে চলে আসা এই বেআইনি কাজের খবর প্রশাসনের নজরে আসল না? কোনও সাধারণ ব্যক্তির কাছে যদি মোটর সাইকেলের পলিউশন সার্টিফিকেট না থাকে তাদের কাছে চালান কাটার জন্য রাস্তার মোড়ে মোড়ে একাধিক পুলিশকর্তা হাজির থাকেন, কিন্তু তাদের নাকের ডগার ওপর দিয়ে যখন শয়ে শয়ে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা করা এই বেসরকারি পরিবহণ বাসগুলি দিনের পর দিন পলিউশন সার্টিফিকেট ছাড়ায় যাত্রী নিয়ে যাওয়া-আসা করছে তার বেলায় পুলিশ প্রশাসনের কোনও হুঁশ নেই। আমরা আশা করব, রাজ্য পুলিশ প্রশাসন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ, রাজ্য মোটর ভেহিক্যালস দফতর তাদের নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে ওই যাত্রীবাহী কেরোসিন তেল ব্যবহারকারী বাসগুলির বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেবেন।