লড়াই করা দেবদত্তা করোনা ‘যোদ্ধা’ নন, মারা যাওয়া দেবদত্তা ই ‘অমর শহীদ’

0
818

*সবর্ণ ন্যায়ধীশঃ

করোনা- যোদ্ধা বলে সন্মান জানিয়ে সারা দেশ ডাক্তারদের জন্য তালি, থালি সব বাজিয়ে ছিল, মোমবাতি জ্বালিয়ে ছিল ঘরে ঘরে। চার মাস পরও নিজের নিজের চেম্বারে সেই সব বীর যোদ্ধাদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সেই সব বীরে রা ঘরে বসে বউ-ছেলের সাথে লুডো খেলছেন আর সমাজের কাছে ‘প্রভূ’ সেজে চিকেন চিবোতে চিবোতে দেখছেন কেমন করে বিনা চিকিৎসায় এখানে ওখানে মুড়ি মুড়কির মতো মারা যাচ্ছে রোগীরা। এরা নাকি যোদ্ধা!
আরেক দল যোদ্ধা এই করোনা আবহে ই চীনের পেরেকের খোঁচা খেয়ে অসহায় মৃত্যু বরন করলেন গালোওয়ান উপত্যকায়। শহীদের মৃত্যু।
এরই মাঝে আরেকটা যোদ্ধা শ্রেনী নীরবে “সেবা” দিয়ে গেলেন যাকে বলে ফোর ফ্রন্টে দাঁড়িয়ে। তাদের কেউ করোনা-যোদ্ধা বলল না। বরং পান থেকে চুন খসলেই, তাদের নামে, তাদের প্রশাসনিক প্রধানের নাম ধরে ধরে নেপথ্যে বাছাই করা গালাগালি এখন সমাজের ওপর তলা, নীচ তলার স্বাভাবিক রীতি। দেবদত্তা রায়ের কোভিডে মৃত্যুর পরও সেইসব নীরব যোদ্ধাদের নিয়ে ওপর তলা-মাঝের তলার মাথাব্যাথা কতটুকু? এ রাজ্যের বিরোধী দলগুলোও ‘ডি’ গ্রেড ছবির মতো সস্তা ডায়লগ বাজিতে বাজার গরম করতে চায়, দেবদত্তা দের নিয়ে ভাবার সময় নাই।
চন্দননগরের ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট দেবদত্তা রায় ঘরে ফেরা পরিযায়ী শ্রমিকদের আপ্যায়নের দ্বায়িত্বে ছিলেন। সংক্রমিত হলেন। চলেও গেলেন। দুর্গাপুরের দুই ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট সঞ্জয় সুব্বা, প্রবীর সিনহা কোভিড আক্রান্ত হয়েছিলেন। সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছেন দু’জনেই। ভালো কথা। কিন্তু, ভুললে চলবে না, সুব্বা’ও ছিলেন পরিযায়ী শ্রমিক-আপ্যায়নের প্রথম সারিতে। হার্ড ইম্যুনিটি বেশি থাকায় ও হাসপাতালের পরিষেবা ভালো থাকায় উনি এখন ঘরে, আর ঠান্ডা ঘরে দেবদত্তা!


মালদা, পশ্চিম বর্ধমান, হুগলী, উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া য় প্রশাসনের আধিকারিক আমলা’রা প্রায়শঃই কোভিড আক্রান্ত হচ্ছেন। দেবদত্তা’র আচম্বিতে অকাল মৃত্যুতে রাজ্য জুড়ে হৈ চৈ। এর আগে এদের নিয়ে গলাবাজি করেনি কেউই, পরন্তু, প্রশাসনিক নূন্যতম এুটি দেখলেই রে-রে করে তেড়ে এসেছে সবাই। ভাবখানা এই যে- এই অফিসারটিকে এই মত্তকায় অপদস্থ করতে পারলেই বুঝি নবান্নের আট তলার চেয়ারটা ধরে টান মারা গেল। অশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিতরা যখন রাজনীতির সামনের সারিতে দাপাদাপি করে, সেই বিনাশকালে এমন বিপরীত বুদ্ধিই কাজ করে।
ভাবুন, দেবদত্তা যখন রেল স্টেশনে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক শ্রমিক স্পেশাল থেকে ঘরে ফেরা পরিযায়ীদের সামলাচ্ছেন, তখন কোন পরিযায়ীকে জলের বোতল ছোটো দেওয়া হয়েছে, বা কোয়ারান্টাইন সেন্টারে যাওয়ার গাড়ীটা কতটা নড়বড়ে তা নিয়েও লাঞ্জিত হতে হয়েছে হয়তো! ‘পরিযায়ীদের সাথে গরু-ছাগলের মতো ব্যবহার করছেন’ এমন কথাও শুনতে হয়েছে দেবদত্তা বা তার সতীর্থ ‘আমলা’ দের। আজ যখন তিনি চলে গেলেন, রাজনীতির শকুনেরা আকাশে তিন চক্কর মেরে, বাতাস বদলে শব দেহের পাশে বসে নতুন সুরে মায়া কান্নার সুর ভাঁজা শুরু করে দিলেন। এদেরকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ সরকার। কেউ কেউ হয়তো দু’দিন বাদে বলবেনও- ‘এদেরকে মরতে ফোর ফ্রন্টে পাঠিয়ে নিজেরা ঠান্ডা ঘরে বসে থাকছে মন্ত্রীরা’।
ডান-বাম-অতি বাম-অতি ডান, শিক্ষা-দীক্ষার বালাই নেই বেশিরভাগ ওস্তাদের। এদের কাছে লড়াই করা দেবদত্তা করোনা যোদ্ধা নন, মারা যাওয়া দেবদত্তা ‘অমর শহীদ’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here