মকর সংক্রান্তির কিছু জানা ও অজানা ইতিহাস

0
1346

নিউজ ডেস্কঃ পৌষ বা মকর সংক্রান্তি। বছরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যে এও এক অন্যতম। মূলত এই বিশেষ দিনে ভোরবেলায় পূণ্যস্নানের মধ্যে দিয়েই এই মকর সংক্রান্তি উদযাপিত হয়। এই মকর সংক্রান্তি নিয়ে বহু জানা-অজানা তথ্য রয়েছে। যার কিছু এখানে তুলে ধরা হল।

১। পৌষ সংক্রান্তির গ্রাম-বাংলার অনেক জায়গায় উঠোনে মড়াই-এর পাশে ‘লক্ষ্মী’র পুজোর প্রচলন রয়েছে। এই বিশেষ দিনে বাড়ির উঠোনে গোবরজল দিয়ে ধুয়ে করে পবিত্র করে তোলা হয়। ধানকাটার সময় যে ‘পৌষ তোলা’র চার-পাঁচ গুচ্ছ ধানগাছ বাড়িতে আনা হয়েছিল, সেই ধানের গাদা নামিয়ে মাথায় বহন করে নামানো হয় উঠোনে। গোটা উঠোন জুড়েই আলপনা, আঁকা হয় লক্ষ্মীর নানান গয়না; চাষের সমস্ত উপকরণ গরু, লাঙল, জোয়াল, মই রাখা হয় উঠোনে। পুজো শেষ হলেই ঠাকুর তোলা যায় না। রাতে লক্ষ্মীপেঁচা বা শেয়ালের (দক্ষিণ দামোদর অঞ্চলে শেয়াল লক্ষ্মীর বাহন বলে কথিত) ডাক শুনে উঠোন থেকে লক্ষ্মীকে ঘরে তোলা হয়। গভীর রাতে লক্ষ্মী তুলে উঠোন নিকিয়ে ঘুমতো যান গৃহিনীরা।
২। পৌষ সংক্রান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি লোকাচার হল ‘আওনি-বাউনি’ বা ‘আউরি-বাউরি’। এটি আগের দিন পালিত হয়। তবে দক্ষিণ দামোদর অঞ্চলের নাম ‘চাঁউনি-বাউনি’ বা ‘চাউড়ি-বাউরি’ যা পৌষপার্বণের দু’দিন আগে ‘মচ্ছিমূলো’ খেয়ে পালিত হয়।
৩। পৌষ সংক্রান্তির আগের রাতে রাঢ় তথা পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় ‘টুসু জাগরণ’ হয়। টুসু উত্‍সবের শুরু অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে। পৌষ সংক্রান্তির ভোরে সূর্যোদয়ের আগে টুসু বিসর্জন দেওয়া হয়। কারণ সূর্যের সঙ্গে টুসুর ভাসুর-বুয়াসি বা ভাদ্র-বউ সম্পর্ক। যেহেতু চৌডল ব্যবহার করলে সূর্যদেব দর্শিত হন না, তাই সুদৃশ্য চৌডলে টুসু ভাসান যায়।
৪। তুষ-তুষলীর ব্রতিনীরা এই দিন মাস-কালীন ব্রতের শেষে জমিয়ে রাখা তুষ-গোবরের গুলি মাটির হাঁড়িতে রেখে আগুন ধরায়। তারপর তা ভাসিয়ে দেয় নদী বা পুকুরের জলে। একাধিক ব্রতিনীর ভাসানো অগ্নিশিখা বহনকারী হাঁড়ি বায়ুচালিত হয়ে ঘাট-ঘাটলার কিনারে কিনারে চড়ে বেড়ায়।
৫। বাংলার কোনো কোনো স্থানে এদিন ‘ধর্মের পিঠে’ উত্‍যাপিত হয়। এই লোকানুষ্ঠানটি ধর্ম বা সূর্য পূজার অঙ্গ। বাড়ির উঠোন সকালে গোবর জলে নিকিয়ে নতুন কলকে নিয়ে পিটুলির ৫টি গোলাকার ছাপ দেওয়া হয়। ছাপ পড়ে গোয়ালে, গবাদিপশুর দেহে, গোলায়, ঢেঁকিশালে এবং ঘরের মধ্যে। গৃহস্থের সামগ্রিক কল্যাণ কামনাই এই লোকানুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য।
৬। দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় এদিন বত্‍সরান্তের কৃষিকাজ সমাপনান্তে খামার খুঁটিকে কেন্দ্র করে উত্‍সবের আয়োজন হয়। একে ‘মেহি পূজা’ বলে, কারণ ‘মেহি’-র অর্থ খুঁটি। এই খুঁটি ঝাড়াই-মাড়াই সহ নানান কাজের সাক্ষী, গরু বাঁধার স্থান। তাই মেহি পূজা বা খামার পূজা হল এক কৃতজ্ঞতার অনুষ্ঠান, ধন্যবাদাত্মক চিন্তন। খুঁটিকে কেন্দ্র করে আঁকা হয় নানান কৃষি উপকরণের আলপনা, পরিষ্কার করে সাজানো হয় সেইসব উপকরণ। কৃষক-পুরুষ শেয়ালের ডাক শুনে পুজোয় বসেন। পুজো শেষে নতুন ধানে ভরা মান মরাইতে তুলে সে বত্‍সরের মত কৃষিকার্যের সমাপ্তি হয়।
৭। পৌষ সংক্রান্তিতে গ্রহণ করা হয় দধি সংক্রান্তির ব্রত। এ দিন সেই ব্রতের সূচনা, প্রতি সংক্রান্তিতে তার আচরণ এবং পরের বছর এই দিনেই ব্রতের প্রতিষ্ঠা বা সমাপ্তি। এই দিন দধি দ্বারা বিষ্ণু ও লক্ষ্মীকে স্নান করিয়ে দধি ও ভোজ্য ব্রাহ্মণকে দান করা হয়। শোনা হয় ব্রতকথা।
৮। পৌষপার্বণ পিঠেপুলির অনুষ্ঠান। এজন্য চাল কোটা হয় ‘বাউড়ি’-র আগের দিন। চাল গুঁড়ো, ভেজা চাল সর্বদা উঠোন-ঘর করতে হলে তা পাত্রে ঢেকে, তুলসি পাতা আর শুকনো লঙ্কা দিয়ে নিয়ে যেতে হয়, নইলে তা ভূতে পায় বলে প্রচলিত।
৯। গুজরাতে এদিন পালিত হয় ঘুড়ি উত্‍সব। এর প্রতীকি তাত্‍পর্য অসীম। আপন আকুতি দেবতার কাছে নিবেদনের নান্দনিকতায় রং-বেরঙের ঘুড়ির রূপ ধারন করে তারা আকাশে ওড়ে। তেলেগু গৃহস্থেরা এদিন গৃহের পুরাতন সামগ্রী বিক্রি করে বা আগুন ধরিয়ে ‘বন-ফায়ার’ করে। পাঞ্জাবীদের মধ্যেও এই প্রথা প্রচলিত আছে। অন্ধ্রপ্রদেশ-তেলেঙ্গানায় গবাদিপশুকে এদিন নানান সামগ্রী ভোজন করানো হয়। গুজরাটে তাদের গায়ে আঁকা হয় নানান রং। এই দিনে জ্ঞান ও বিদ্যার দেবী সরস্বতীকে স্মরণ-মনন করে মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি দেন গুজরাটি পন্ডিতেরা। অধ্যাত্মিক মনন ও অভ্যাসে এই দিনটি তাই মান্যতা পেয়ে এক সর্ব ভারতীয় উত্‍সবের মর্যাদা লাভ করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here