“মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা” কোভিড মৃতদেহ সৎকারের নামে দেদার তোলাবাজি বীরভানপুর মহাশ্মশানে

0
680

নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুর:- সারা দেশজুড়ে করোণা আক্রান্তের রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে, পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে মৃত্যুর হারও । রোজই লাফিয়ে লাফিয়ে কোভিড রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলার পাশাপাশি জেলাজুড়ে হাসপাতালগুলিতে শয্যা সংকট তীব্রতর আকার ধারণ করেছে। চড়া দামে বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোমগুলিতে শয্যার কালোবাজারিরও অভিযোগ উঠেছে। এমতা অবস্থায় শ্বাসকষ্টের উপসর্গে ভুগতে থাকা রোগীরা আসু প্রয়োজনীয় অক্সিজেন টুকুও পাচ্ছেন না। দুর্গাপুর মহকুমা হাসপাতালের মর্গে জায়গা নেই, বেহাল দশা সরকারি হাসপাতালে ৷ চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে মহকুমা হাসপাতালে । বেসরকারি হাসপাতালের দশাও তাই । শ্মশানে লাইন, হাসপাতালে শয্যা নেই ৷ প্রতিদিনই করোণা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে শিল্পাঞ্চলে । এমতো অবস্থায় দুর্গাপুরের একমাত্র ইলেকট্রিক চুল্লি রয়েছে বীরভানপুর মহাশ্মশানে । স্বভাবতই ভিড় জমেছে মৃতদেহ সৎকারের জন্য। আগে থেকেই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই ইলেকট্রিক চুল্লিতে রাত ৯ টা থেকে সকাল ৬ টা অবধি শুধুমাত্র করোণা আক্রান্ত রোগীর দাহ সংস্কার করা হবে আদেশ আছে । কিন্তু সমস্যা হচ্ছে দাহ কার্যের। কারন মৃতদেহ দাহ করার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা দাবি করছে মোটা টাকা করোণা আক্রান্ত রোগীর পরিজনদের কাছে।

এমনই এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা জানা গেল গতরাত্রে, একটি মৃতদেহ সৎকারের জন্য যাওয়া একটি পরিবারের কাছে। দুর্গাপুরের এম.এ.এম.সির বাসিন্দা প্রাক্তন সেনা কর্মী অদীপ মিত্র (৪৫), গত ৯/০৫/২১ সকালে শ্বাসকষ্টের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হন স্থানীয় বিবেকানন্দ হাসপাতলে । গতকাল সকাল বেলায় তিনি হাসপাতালে মারা যান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারকে জানানো হয় যে রাত্রি ১১ টা থেকে সাড়ে ১১ টার মধ্যে বীরভানপুর মহাশ্মশানে তাদের পরিজনের দেহ নিয়ে যাওয়া হবে সৎকারের জন্য। তারা যেন সেখানের পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকেন । সেইমতো রাত সাড়ে ১১ টা নাগাদ তাদের দেহ মহাশ্মশানে পৌঁছালে , শ্মশান পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকা কর্মীরা পরিষ্কার জানিয়ে দেন তারা মৃতদেহ অ্যাম্বুলেন্স থেকে নিচে নামাতে ও সৎকার করতে ১৫,০০০ টাকা দিতে হবে । পরিবারের লোকজন প্রশ্ন করন কেন এই ১৫,০০০ টাকা তারা দাবি করছেন, তার কোনো সদুত্তর না দিয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দেয় তাহলে এখানেই পড়ে থেকে পচবে এই মৃতদেহ।

সৌভাগ্যবশত পরিবারের এক নিকট আত্মীয় সাংবাদিক হওয়ায় তৎক্ষণাৎ পরিবারের লোকজন তাঁকে খবর দেন। খবর দেওয়া হয় স্থানীয় কোক-ওভেন থানার পুলিশকে। কোক-ওভেন থানার পুলিশ কর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তাদের সামনেই ঠিকা কর্মীরা টাকা ছাড়া মৃতদেহ সৎকার করতে অস্বীকার করেন। উপস্থিত পুলিশ আধিকারিকরা কড়া ভাষায় হুশিয়ারি দিতে তখনকার মতন তারা রাজি হয়,মৃতদেহটি সৎকার করতে। কিন্তু পুলিশ চলে যাওয়ার পরও মৃতদেহ পড়ে রইল । বেশ কয়েক ঘণ্টা বাদে বাধ্য হয়ে পরিবারটি ভোর ৪ টে নাগাদ কোনরকম হাতে-পায়ে ধরে ৪,৫০০ হাজার টাকা নগদ দিয়ে তাদের পরিবারের মৃত ব্যক্তিকে সৎকার করান । পরিবারের পক্ষ থেকে এক ব্যক্তি ইতিমধ্যেই সমস্ত ঘটনাটি ক্যামেরাবন্দি করে রেখেছেন ভবিষ্যতে প্রমাণস্বরূপ প্রশাসনিক আধিকারিকদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য । বুধবার বেলা ১টা নাগাদ মৃতের ভাই রঞ্জন মিত্র একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন দুর্গাপুর মহকুমা শাসকের কাছে এবং অবিলম্বে উক্ত ঘটনার তদন্ত ও সুবিচার চেয়েছেন।

দুর্গাপুরের মেয়র দিলীপ অগস্থি নিজেই কোভিডে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন তাঁকে ফোনে বিষয়টি জানানোর পর তিনি বলেন, ” দুর্গাপুরকে বদনাম করার জন্য শ্মশানের দায়িত্ব যে মেয়র পরিষদ রয়েছে তার কোনো হেলদোল নেই এই কালোবাজারি বন্ধ করার। তিনি অফিসে আসেন না এবং তিনি এই ব্যাপারটার দিকে লক্ষ্য করছেন না। স্থানীয় কাউন্সিলর ওই ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করছে না কেন সেগুলো তদন্ত হওয়া দরকার রয়েছে। ” দুর্গাপুরের মহকুমা শাসক জানান, “এই ঘটনাটি ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে , এমন ঘটে থাকে কড়া ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে এই ভয়ঙ্কর মৃতদেহ সৎকারের নামে তোলাবাজির ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও শাস্তির দাবি করে দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে মহকুমা শাসক ও জেলা শাসককে একটি চিঠি দিয়েছেন সংস্থার সম্পাদক ও সভাপতি আজকেই। দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি, বিকাশ সেন ও সম্পাদক, সঞ্জীব শঁই ক্ষোভের সাথে জানান, “গত রাত্রের ঘটনাটি একজন সাংবাদিকের পরিবারের সাথে হয়েছে, তাহলে সহজেই আন্দাজ করা যায় যে সাধারণ মানুষের সাথে কি ধরনের ব্যবহার করা হচ্ছে বীরভানপুর মহাশ্মশানে। শহরজুড়ে বেশকিছু অসাধু ব্যক্তি অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারদের সাথে যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে সাধারণ রোগীদের কাছ থেকে মোটা টাকা আদায় করে যাচ্ছেন। করোনা কালে এখন মানুষের হাতে টাকা-পয়সার অভাব , আর এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও কিছু সমাজবিরোধী এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মোটা মুনাফা রোজগারের পথ খুঁজছেন। ‘ধিক শত ধিক’ সেইসব মানুষজনকে যারা মানুষের এই দুর্দিনে তাদের অসহায় অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে । আমরা ইতিমধ্যেই জেলাশাসক এবং মহকুমা শাসককে জানিয়েছি, প্রয়োজনে এবার নিজেরাই কলম হাতে নেমে পড়বো এই দুর্নীতি দমনে ।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here