এক ভোটকর্মীর অভিজ্ঞতা, নাম দিলাম “নকুলদানা”

0
1463

লেখনীতে দীপাঞ্জন দাস: সকাল থেকেই হাজারো লোকের ভীড়। কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে সে নিয়ে সবারই চিন্তার অন্ত নেই। আমি সে দিক দিয়ে অনেকটাই নিশ্চিন্ত। সুযোগ বুঝে ফ্যানের তলায় পা ছড়িয়ে বসে পড়েছি; সাথে জলের বোতল, ব্যাগ আর গল্পের বই। এদিকে গরমের বহরে সুবর্ণরেখার জলও তেতে উঠেছে। অগত্যা সব কিছু ব্যাগে ভরে নিয়ে কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়ালাম। “দাদা 2nd লাগবে নাকি? আমি আছি, লাগলে বলবেন।” একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক’এই মাছটিই লাগবে’ জাতীয় ভাব করে আমার কাঁধ(পড়ুন কানকো) চেপে ধরলেন। বললেন, আমায় দিয়ে দিন। যায় হোক তার ইচ্ছে মতো কাউন্টারের ভদ্রলোক আমাকে তার হাতে তুলে দিলেন। “আমি কোন পথে যে চলি,কোন কথা যে বলি” গানটি ভাবতে ভাবতেই ভদ্রলোকের পিছন পিছন চললাম। আমার টিমের লোকজনের সাথে পরিচয় হল। কমিশনের বদান্যতায় আজ ভারী খাবার খাওয়া হয়নি। তাই ঝালমুড়ি, সরবত এসব খেয়েই কাজ শুরু করলাম। শুরু হল বাস খোঁজো অভিযান। ঘণ্টাখানেক খোঁজার পরে ‘বাসযোগ্য’ বাস পাওয়া গেল। গন্তব্য রাণীসায়ার আদিবাসী প্রাইমারি বিদ্যালয়। পৌঁছানোর পরে গ্রামের এক যুবক আমাদের জন্য জলের ব্যবস্থা করে দিলেন। যদিও কিছু পরেই সেই জলের কলসিটিও উধাও হতে দেখলাম। সেক্টরকে বারবার জানানো সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় বাইরে থেকে জল কিনতে হল, রাতের খাবারেরও ব্যবস্থা হল নিয়ম মেনেই। আশেপাশে কোনো রাজনৈতিক নেতা নেই, নেই কোনো সৌজন্য-অসৌজন্যবোধ। আদৌ ভোট কী হবে, মানুষ কি আদৌ আসবেন সেই দ্বন্দের মধ্যেই আমরা রাতজেগে সমস্ত কাগজপত্র প্রস্তুত করে নিলাম। ভাত, ডিমের ঝোল দিয়ে রাতের খাবার সারলাম। কিন্তু কেউ বাড়তি নুন, লেবু নিয়ে আসেনি দেখে খানিক অবাকই হলাম। যায় হোক, এবার একটু জিরিয়ে নেওয়ার পালা। “ওগো ঘুম ভাঙানীয়া তোমায় গান শোনাবো”-এই স্বরের ডাক উপেক্ষা করা সম্ভব হল না। তাই আধোঘুমেই বাকি সময় কাটল। ভোর হলে সারা শরীরে উৎকণ্ঠা মেখে স্নানটি সেরে নিলাম। সকাল সকাল কয়েকজন দাদা এসে বুথে হাজির। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সতর্ক করে দিলাম। কিন্তু এরা কারা? ভিতরে আসব আসব ভাব দেখালেও কেও আসছেনও না। আমি জিজ্ঞাসা করাই বললেন, “আমি টি.এম.সির আর এই যে আমার সাথে “উ” বিজেপির এজেন্ট। সিপিএমের কাকা যে “কুথাই” গেলো কে জানে। এলে একসাথেই ঢুকতাম আমরা। এতক্ষণে উৎকণ্ঠা শরীর ঝেড়ে বেরিয়ে প্রকৃত ঘামের গন্ধ বেরোতে শুরু করল। ওদের একজন বলল, “স্যার আপনারা অতগুলান মকপোল কেনে করবেন? ১-২টো করে দেখিয়ে দিন তাতেই হবে। আপনারা শিক্ষিত মানুষ, ভুল তো করবেন না।” যায় হোক তাদের দাবির উত্তর দেওয়ার আগেই জানা গেল VVPAT খারাপ হয়েছে। সেক্টরের অফিসাররা এলেও কিছুই বুঝতে পারলেন না। সমস্ত বুথের জন্য মাত্র একজন ইঞ্জিনিয়ার বরাদ্দ থাকায় মেশিন পরিবর্তন করে ভোট শুরু করতে দেরি হল। প্রথম ভোটার ভোট দিতে গিয়ে “evm error” দেখানোই আবার অফিসারদের ডেকে পাঠাতে হল। বাইরে তখন উত্তেজিত জনতা; বুথ এজেন্টদের দেখলাম একযোগে বাইরে এসে সকলকে বোঝাচ্ছেন। আবার ভোট প্রক্রিয়া শুরু হল। অতি দ্রুত কাজ এগিয়ে নিয়ে গেলাম। দুপুর গড়িয়ে এলে এজেন্টরা বললেন “দাদা, যান এক এক করে খেয়ে আসুন। এখন তো বাইরে তেমন লাইন নেই।আর আপনারাও তো সারাদিন তেমন কিছুই খাননি।” খাওয়াও হল, সাথে নিজেদের মধ্যে আড্ডা, গল্প চলতে থাকলো চানাচুর, বাদাম সহযোগে। অবশেষে ঘড়িতে তখন সন্ধ্যে ৬:০০ টা। আমরা পোল শেষ করে সব গুছিয়ে নিচ্ছি। এজেন্টরাও তাতে হাত লাগালেন। সাথে চললো নিজেদের ছোটো বেলার গল্প, ওদের একসাথে বেড়ে ওঠার গল্প। বাবুল, মুনমুন নাকি অন্য কেও-এসবের কচকচানিতে এদের মধ্যের সম্পর্ক নষ্ট হয় না। ফেরার আগে মজা করেই জিজ্ঞাসা করলাম, দাদা কি বুঝছেন? কে জিতবে এখানে? বিজেপির এজেন্ট বললেন, বাবুল দা আর তৃণমূলের এজেন্ট বললেন মুনমুন ম্যাডাম। সবশেষে সিপিএম-এর বরিষ্ঠ ভদ্রলোক বললেন, “দাদা, প্রতিবারে যারা জেতেন, এবারও তারাই জিতবেন।” আমি বললাম,”মানে?” উনি বললেন, মানে তেমন জটিল কিছুই নয়। এখানে প্রতিবার মানুষই জেতে, মানুষই জেতায়, তারা এবারেও শেষ কথা বলবে। ফেরার বাসে চাপার সময় এই শেষ কথাগুলোই মাথায় ঘুরছিল। দেখি পিছন থেকে কে এসে ঘাড়ে হাত রেখেছেন। মটকাবেন কিনা ভাবতে ভাবতেই পিছন ফিরে দেখি সেই বয়স্ক ভদ্রলোক, সাথে নকুলদানার প্রসাদ আর এক বোতল ঠাণ্ডা জল। বললেন, “শান্তি করে খেও বাবা, এখনো তোমায় অনেক দূর যেতে হবে…”।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here