‘যাদু দন্ড’ নয়, করোনা রোগী বাঁচাতে দাঁতে দাঁত চিপে লড়ছে দুর্গাপুরের সনকা হাসপাতাল

0
9784

সায়ন্তী সাধু ও বিমান পন্ডিত, দুর্গাপুরঃ- না। কোন ‘যাদুকাঠি’ নেই, তবে, আছে যত্নের চিকিৎসা পরিষেবা। তাই, করোনা আক্রান্ত রোগীরা এই হাসপাতালে আসছেন ও যেমন, বুক বাজিয়ে সুস্থ হয়ে ঘরেও ফিরছেন তেমনি।
“এখানে কোনো ভেল্কি নেই। আছে করোনা আক্রান্তকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলার মরন-পন লড়াই। আর সেটাই এরা করে যাচ্ছেন। যেটা একজন করোনা রোগী হিসেবে গত কয়েকদিনে নিজের চোখেই দেখলাম”, কথাগুলি স্বচ্ছন্দে, এক নাগাড়ে বলে বুক ভরে শ্বাস নিলেন সঞ্জয় সুব্বা। সোমবারই হাসপাতাল থেকে ‘ছুটি’ পেয়ে পরিবারের কাছে ফিরেছেন আরেক ডেপুটি ম্যাজিস্টেট প্রবীর সিনহা। “লাগাতার তিনদিনের চিকিৎসা, যত্নে ওরা আমাকে সারিয়ে তুললো। হাসপাতালে যখন আমাকে নিয়ে আসা হল, ভেতর ভেতর একটা চাপা ভয় যে ছিল না, তা কিন্তু নয়। কিন্তু, এখানে আসার পর এদের চিকিৎসা, মেডিক্যাল স্টাফদের ব্যবহার ও পরিষেবা দ্রুত আমাকে ভুলিয়েই দিয়েছিল যে আমি একজন করোনা রোগী”, বললেন সুব্বা। তিনি দুর্গাপুর মহকুমা প্রশাসনের একজন ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট। আর, যে হাসপাতালটি নিয়ে তিনি এতটা উচ্ছসিত, সেটা দুর্গাপুরেরই মলানদিঘির সনকা কোভিড হাসপাতাল।

সঞ্জয় সুব্বা মহকুমা প্রশাসনের সেই অফিসার, যিনি দলে দলে ভিনরাজ্য থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরানোর কাজটি সামলেছেন এক্কেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে, দিনের পর দিন। অনুমান, ভিনরাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের সংস্পর্শে আসার দরুনই ঘটে তার করোনা সংক্রমন। তিনি সংক্রমিত হওয়ার পর সাথে সাথে মহকুমা প্রশাসনের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কাজ বন্ধ রেখে, ছুটি ঘোষনা করা হয়। প্রশাসনিক ভবনেই থাকা মহকুমা আদালতের কাজও স্থগিত রাখা হয়। লালারসের নমুনা সংগ্রহ করা হয় দপ্তরের অন্যান্য কর্মী আধিকারিকদেরও। আর তার রিপোর্টেই আরো একজন ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট প্রবীর সিনহা সহ অন্য দু’জনের করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। শহর জুড়ে ছড়ায় চাঞ্চল্য।

কিন্তু, মলানদিঘিতে নেই চাঞ্চল্যের ঢেউ। কারন- সনকার দক্ষ চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মীরা সেখানে করোনা রোগীদের সুস্থ করার নেশায় রয়েছেন ধ্যান মগ্ন। দক্ষিনবঙ্গেঁর ৭ টি স্বাস্থ্য- জেলার একমাত্র কোভিড হাসপাতালই হল সনকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। এ পর্যন্ত ২৫০ জন করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা হয়েছে সেখানে। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছেন ২৪৬ জন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে তিন জনের আর একজনকে দুর্গাপুরেরই ‘দ্য মিশন’ হাসপাতাল থেকে পাঠানো হলে, সনকায় ভর্তি হওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।
করোনা সংক্রমন নিয়ে গোটা বিশ্বে যখন ত্রাসের আবহ, সনকা কোভিড হাসপাতাল থেকে তখন দলে দলে রোগী সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরায়, আমজনতার মধ্যে কিঞ্চিৎ অবান্তর প্রশ্নও উকি ঝুঁকি দিতে থাকে। বিশেষ করে ‘সোস্যাল মিডিয়া’ তে দলবদ্ধ কিছু গ্রুপের ‘হোয়াটস অ্যাপ বিশেষজ্ঞ’রা সনকার চিকিৎসা নিয়ে ‘চুলচেরা’ বিশ্লেষণ করে নানাবিধ তীর্যক মন্তব্যও ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। সেখানেই জোর চর্চা শুরু হয়ে যায়- ‘ওখানে আসলে করোনা চিকিৎসা হয় না। যাদুর ভেল্কি দেখিয়ে ওরা পজিটিভ কেস কে নেগেটিভ করছেন। আবার, টাকা কামানোর ধান্দায় ‘নিরীহ’ কেসগুলো পজিটিভ বলে সরকারি টাকা লুঠ করছেন’।
প্রচার- অপপ্রচার থেকে অনেক দূরে, মানুষকে বাঁচানোর জীবন-যুদ্ধে ব্যস্ত সনকার ডাক্তার-নার্সেরা, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকের বিশ্লেষণের কথা শুনে নীরবে হেসেছেন, ক্ষমার হাসি।
“না। হেসে এড়িয়ে গেলে চলবে না। সমাজের বিভিন্ন মানুষের হাজারো প্রশ্ন থাকতেই পারে। করোনার বিরুদ্ধে লড়াইতে তাদের কনফিডেন্স জয় করাটাও আমাদের কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। কারন, রোগী হয়ে আসা মানুষটির যদি ভরসাই না থাকে, তখন চিকিৎসাটা কঠিন হয়ে পড়ে,” বললেন পার্থ পবি। সনকা হাসপাতালের কর্ণধার। তিনি বললেন, “আসা মাত্রই ভালো হয়ে ঘরে ফিরে যাচ্ছে করোনা রোগী। সত্যিই তো এটা বিশ্বাস করা অতটা সহজ নয়।” তাহলে?- এ প্রশ্নের জবাবে পার্থপবি বললেন, “এর পেছনে কোন ম্যাজিক নেই। আসলে এটা একটা ম্যাথমেটিক্স।” কি রকম? তার ব্যাখ্যা, “যখন কেউ করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন, অর্থাৎ ভাইরাস-লোড হওয়া মাত্রই, সেদিনই পরীক্ষা করলে করোনা ধরা পড়ে না। অন্ততঃ ৩ থেকে ৪ দিন পর স্যাম্পেল নিলে ধরা পড়ে। তারপর নমুনা যায় পরীক্ষাগারে। রিপোর্ট আসে ২ থেকে ৩ দিন পর। তখন জানা যায়, পজিটিভ কেস আর পাঠানো হয় সনকা’য়। অর্থাৎ, রোগীর শরীরে করোনার বাসা বাঁধা ততক্ষনে ৫ থেকে ৬ দিন হয়েও গেছে। পার্থবাবু বলেন, এরপর আমাদের কাছে রোগের মাত্রা অনুযায়ী চিকিৎসায় লাগছে আরও ৪ বা ৫ দিন, ক্ষেত্র বিশেষে ৩ দিন। তারপর ফের পরীক্ষা করা হয়। সেই পরীক্ষা আমাদের এখানেই করা হয়, তাই রিপোর্টও পাই দিনে দিনে। নেগেটিভ এলে এক- দু দিন পর রোগীর ছুটি।” তা হলে, নীট দাঁড়াল সেই ৮-১০ দিনের ব্যাপার। অর্থাৎ “আসামাত্রই যাদুদন্ডের ভেল্কিতে” সুস্থ হয়ে পাল্কি চেপে ঘরে ফেরার কথা নেহাতই গুজবের ফানুস। সনকা সুত্রেই জানা গিয়েছে, এ যাবত কাল অব্দি যতজন রোগী এখানে ভর্তি হয়েছেন, তার ৮০ শতাংশই হয় বর্ধমান মেডিক্যাল, বাঁকুড়া মেডিক্যাল, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে বা সুরক্ষা ডায়াগনস্টিকের মত বেসরকারি ল্যাব থেকে পরীক্ষা করানো।
নিজের কোভিড- পরীক্ষার ব্যবস্থা গত ১২ মে চালু হওয়ার পর থেকে ২ জুলাই অব্দি মোট ২৫ হাজার ৯৪৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে সনকায়। হাসপাতাল সুত্রেই জানা গেছে, ওই সংখ্যক রোগীরই কেবলমাত্র ১.৯২% রোগী-ই করোনা পজিটিভ কেস ছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here