দলবদলু , ধান্দাবাজদের কি এবার ঘরে ফেরার পালা

0
633

জ্যোতি প্রকাশ মুখার্জ্জী

ক্ষমতা যেখানে শেষ কথা দলবদল সেখানে অনিবার্য। গত কয়েক দশক ধরে ভারতের রাজনীতিতে এটাই চরম সত্য হয়ে উঠেছে। যোগ্যতা না থাকলেও যেকোনো দলের একটা বড় অংশ নেতা হতে চায়, জনপ্রতিনিধি হতে চায়। হতে চাওয়াটা কোনো ভুল নয়। সীমিত আসন সংখ্যার জন্য সেটা সম্ভব হয়না। তাই সবার মধ্যে থেকে সেরাটা বেছে নেওয়ার চেষ্টা চলে। যদিও শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষে সেটা কঠিন কাজ।

বছর তিনেক আগে তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মুকুল রায় দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেয়। গত নভেম্বর মাস থেকে কার্যত তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙন শুরু হয়। চাটার্ড প্লেনে করে দিল্লি নিয়ে যাওয়া হয় শুভেন্দু, রাজীব, প্রবীর, বৈশালি সহ তৃণমূলের একদল জনভিত্তিহীন নেতা-নেত্রীদের। প্রায় প্রতিদিন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অঞ্চল সভাপতি, পঞ্চায়েত প্রতিনিধি থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের নেতা-নেত্রীরা বিজেপিতে যোগ দেয়। দলত্যাগ করার সময় এমন তারা এমন মন্তব্য করে যাতে মনে হবে নির্বাচনে তৃণমূল শূন্য হয়ে যাবে। ভোট ঘোষণার পর তৃণমূলের টিকিট না পেয়ে কেউ কেউ কেঁদে ভাসিয়ে দলত্যাগ করে। একটা সময় মনে হয়েছিল মমতা ও অভিষেক ছাড়া প্রথম শ্রেণির সমস্ত নেতা-নেত্রীরা তৃণমূল দল ছেড়ে দেবে। এই পরিস্থিতিতে বিধানসভার ভোট হয়। ভোটের ফল সবার জানা।

তৃণমূল থেকে যারা বিজেপিতে গিয়েছিল তাদের সবাই নির্বাচনে টিকিট পায়নি। যারা পেয়েছিল তাদের অধিকাংশ জনই নির্বাচনে হেরে গেছে। যারা জিতেছে আশা করা যায় বিজেপিতে সেভাবে গুরুত্ব পাবেনা। মুকুল রায়কে দেখে সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। তাহলে এবার কি হবে? অবশ্যই তারা পুরনো দলে ফেরার চেষ্টা করবে।

সাধারণত ভোটের আগে-পরে দলত্যাগ ঘটে। পুরনো দলে কিছু পাওয়ার সুযোগ না থাকলে এবং নতুন দলে কিছু পাওয়ার আশায় এক শ্রেণির ধান্দাবাজ দলত্যাগ করে। এরা রাজনীতির কলঙ্ক। অবশ্য চাপ দিয়ে বা ব্ল্যাকমেল করে অনেক সময় দলত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। অধিকাংশ দলত্যাগী নিজেদের জনপ্রিয় বা দক্ষ বলে মনে করলেও কেউই নির্দল হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাহস দেখায় না।

ভোটের ফল ঘোষণার পর মমতা ব্যানার্জ্জী দলবদলুরা ঘরে ফিরতে চাইলে আপত্তি করবেন না বলেছিলেন। মমতা ব্যানার্জ্জীর মুখের উপর আপত্তি করার ক্ষমতা কারও নাই। তাসত্ত্বেও সমাজ মাধ্যমে কর্মী-সমর্থকরা প্রতিবাদের ঝড় তুলে দিলেন। প্রত্যেকের একটাই বক্তব্য – দল থেকে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার পর নির্বাচনের মুখে যারা দল ছেড়ে চলে যায় তাদের দলে নেওয়া যাবেনা। দলনেত্রী বারবার বলেন তার দলের মূল শক্তি কর্মীরা। সেটা এই ভোটেই প্রমাণিত। তাই নিজেদের স্বার্থে নেতারা দলত্যাগ করলেও দলের ভোটের শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তাই দলের কর্মীদের মতামতকে মনে হয়না মমতা উপেক্ষা করবেন। যদিও রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু হয়না।

শোনা যাচ্ছে যারা ভোটের আগে তৃণমূল নেত্রীর নিন্দায় মেতে উঠেছিল ভোটে হেরে তারা এখন মমতার প্রশংসায় মেতে উঠেছে। ঘরে ফিরতে গেলে সেটা করতেই হবে। বিজেপি সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেলে নিশ্চিতরূপে সেটা তারা করতনা। আবার জয়ীদের কেউ কেউ মমতার উন্নয়নের অংশীদার হওয়ার জন্য অর্থাৎ কোনো কিছু পাওয়ার আশায় তৃণমূলে ফিরতে চাইবে। তৃণমূল তাদের ফেরাবে কিনা সেটা তাদের ব্যাপার। তারপরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়।

আয়ারাম-গয়ারামদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করার জন্য প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী একটা আইন করেছিলেন। আইনে প্রচুর ফাঁক থাকার জন্য সেটা ফলপ্রসূ হয়নি। ব্যক্তি স্বার্থে ভোটারদের প্রতারিত করে একদল জনপ্রতিনিধি দলবদল করেই থাকে। আবার অনেক সময় অতিরিক্ত কিছু পাওয়ার আশায় বা দলীয় পদ না পেয়ে অনেকেই দলত্যাগ করে। জনগণের উন্নতি নয় ব্যক্তি স্বার্থই এদের কাছে মূল কথা। দু’একজন ব্যতিক্রমী ছাড়া কোনো দলত্যাগী কিন্তু সমাজের কোনো উপকার করেনি।

সুতরাং ভোটের ফল বের হওয়ার পর পুনরায় দলে ফেরার ব্যাপারে সেইসব দলত্যাগী ধান্দাবাজদের নিয়ে দলমত নির্বিশেষে একটা শক্তিশালী নীতি তৈরি করতে হবে। ভোটের কমপক্ষে দুই বছর আগে দলত্যাগ না করলে নির্বাচনে নতুন দল তাকে টিকিট দিতে পারবেনা। এমনকি ভোটের পর পুরনো দলে ফিরলে পরবর্তী পাঁচ বছর নির্বাচনে টিকিট দেওয়া তো দূরের কথা দলীয় পদ পর্যন্ত দেওয়া যাবেনা। অবশ্য দলত্যাগীরা কোনো দলের সমর্থন নিয়ে নির্দল হিসাবে বা নতুন দল গঠন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেই পারে। দলত্যাগী জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা দলে ফিরতেই পারে কিন্তু মন্ত্রীত্ব সহ কোনো পদ দিলে হবেনা। নাহলে দলবদল ও ঘরে ফেরার গল্প চলতেই থাকবে। আর প্রতারিত হবে সাধারণ মানুষ ও দল অন্ত প্রাণ দলের নীচু তলার কর্মীরা। রাজনীতিকে দলবদলুদের হাত থেকে বাঁচাতে রাজনৈতিক দলগুলো সেই সাহস কি দেখাবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here