তৃণমূলের সাংগঠনিক পরিবর্তন ও প্রত্যাশা

0
248

জ্যোতি প্রকাশ মুখার্জ্জী,কলকাতাঃ- অ্যাণ্টি-ইনকামবেন্সি, কাটমানি ও তোলাবাজি করা ‘তোলামূলী’দের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ, নিয়মিত এস.এস.সি না হওয়ার জন্য বেকারদের ক্ষোভ ইত্যাদি একগুচ্ছ প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জ্জী যখন বিধানসভা ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঠিক তখনই ভোটের মুখে একের পর এক দলীয় নেতা-নেত্রীরা দলত্যাগ করে প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপিতে যোগদান করে। এরাই ছিল তৃণমূলের সামনের সারির সৈনিক। এদের নিয়েই ভোট যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল। এদিকে যুদ্ধের শুরুতেই দুর্ঘটনায় দলনেত্রীর পা ভেঙে আর এক বিপত্তি দেখা যায়। এই পরিস্থিতিতে যেকোনো নেতা-নেত্রী হাল ছেড়ে দিতেন। কিন্তু প্রকৃত ‘স্ট্রীট ফাইটার’ মমতা হাল ছাড়ার পাত্রী নন। নিজে তো বটেই সঙ্গে অভিষেক ব্যানার্জ্জী ও রাজনীতির ময়দানে আনকোড়া দেবাংশুকে নিয়ে কার্যত রাজ্যজুড়ে প্রচারের ঝড় তুলে দিলেন। ওদিকে দেবের বুদ্ধিদীপ্ত প্রচারের সামনে বিজেপি দিশেহারা। সঙ্গে অন্যরা তো আছেই। ভোটের ফল সবার জানা।

একগুচ্ছ প্রথম সারির নেতাদের বাদ দিয়ে যখন একটা দল বিপুল ভোটে জয়লাভ করে তখন তাদের সামনে কিছু সাংগঠনিক পরিবর্তনের এবং দোষ ত্রুটি দূর করার সুযোগ এসে যায়। সেই লক্ষ্যে গত ৫ ই জুন তৃণমূলের সাংগঠনিক সভা হয়। মুখে ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ বলা হলেও বাস্তবে একজন ব্যক্তিকে – একই সঙ্গে একাধিক দপ্তরের মন্ত্রী, জেলা সভাপতি, একাধিক সংস্হার শীর্ষ পদে দেখা যায়। কাউকে কাউকে একইসঙ্গে বিধায়ক, জেলা বা ব্লক সভাপতির সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্বে দেখা যায়। অন্যরা যদি সুযোগ না পায় তাহলে তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করবে কি করে? দলের নীতি আদর্শ মেনে প্রত্যেক পদাধিকারীকে কিছুটা স্বাধীন ভাবে কাজ করার সুযোগ দিতেই হবে। তবে সেই সুযোগ যেন স্বেচ্ছাচারিতা না হয়।


সৌজন্যতা দেখিয়ে অভিষেক যাই বলুন সর্ব ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসাবে তৃণমূলে তিনিই দ্বিতীয় ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তি। যদিও অভিষেকের মনোনয়নে কোনো চমক ছিলনা। রাজ্য যুব সভাপতি পদে রাজনীতির ময়দানে নবাগতা সায়নীর মনোনয়ন ছিল সবচেয়ে বড় চমক। নির্বাচনে হেরে গেলেও যেভাবে তিনি আসানসোলবাসীর মন জয় করেছেন সেটা সত্যিই লক্ষ্যনীয়। আশা করা যায় যুব সভাপতি হিসাবে তিনি সফল হবেন।


‘এক ব্যক্তি এক পদ’ এই দলীয় সিদ্ধান্তকে মান্যতা দিয়ে অভিষেক সঙ্গে সঙ্গে রাজ্য যুব সভাপতির পদ ছেড়ে দিয়েছেন। কোনো বিতর্কের অবকাশ রাখেননি। এখন দেখার অন্যরা অভিষেককে অনুসরণ করে কিনা?

গত বছর ২৩ শে জুলাই তৃণমূলের একটা সাংগঠনিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু পুরোপুরি ফলপ্রসূ হয়নি। তবে পর্যবেক্ষকের পদ তুলে দেওয়া ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। কলকাতার নেতা উত্তরবঙ্গের বা এক জেলার নেতা অন্য জেলার পর্যবেক্ষক- বড্ড বেমানান। সংশ্লিষ্ট জেলার নেতা তথা জেলাবাসীকে অপমান করা হয় । এদিকে গত কয়েকদিন ধরে একটা কথা সমাজমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে – যেসব বুথে তৃণমূল হেরে গেছে সেখানকার বুথ সভাপতিদের বদলানো হবে। বুথ সভাপতিরা মূলত পঞ্চায়েত বা শহর সভাপতির নির্দেশ মেনে চলে। অন্যদিকে পঞ্চায়েত বা শহর সভাপতিরা ব্লক সভাপতি বা উপর মহলের নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য হয়। সুতরাং কেবল নীচু তলার নেতৃত্বের বদল আনলে অবিচার করা হবে। পরিবর্তনের এটাই প্রকৃত সময়। প্রবীণদের পাশাপাশি প্রতিটি জেলা থেকে রাজ্যস্তরে আরও নতুন মুখ তুলে আনলে পরিবর্তনটা অর্থবহ হয়ে উঠবে। প্রবীণদের অভিজ্ঞতায় নবীনরা সমৃদ্ধ হবে। বিধায়ক বা মন্ত্রী হিসাবে শুধু একগুচ্ছ নতুন মুখ তুলে আনলে হবেনা এক শ্রেণীর অতি উৎসাহি কর্মীদের বেয়াদবি বন্ধ করার জন্য দলকে সচেষ্ট হতেই হবে। তৃণমূল যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করুক না কেন এদের জন্যই বিজেপির নীচু তলার কর্মীরা গৃহছাড়া। শাসকদল যদি গুণ্ডারাজ বন্ধ করতে সচেষ্ট হয় তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই অন্য দলগুলো গুণ্ডাগিরি করতে সাহস করবেনা। মানুষও স্বস্তি পাবে।


মমতার গত দশ বছরের মুখ্যমন্ত্রীত্বে রাজ্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে বারবার কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশংসা আদায় করে নিয়েছে। তাঁর একাধিক প্রকল্প আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। এখন দেখার রাজনীতিকে কলুষ মুক্ত করতে মমতা ব্যানার্জ্জী আগামী প্রজন্মকে নতুন কোনো দিশা দেখিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে অমর হয়ে যেতে পারেন কিনা। পারলে তিনিই পারবেন।

         

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here