“Silent Killer” পার্থেনিয়ামে ছেয়েছে শিল্পশহর

0
1270

নিউজ ডেস্ক, এই বাংলায়ঃ আগের শিল্পশহর আর আজকের শিল্পশহরের মধ্যে অনেক তফাৎ। নতুন রাস্তাঘাট, দোকানপাট, আকাশছোঁয়া শপিং মল, সবুজের সমারোহ, শিল্পশহরের মানুষের কোলাহল সবকিছুই মিলেমিশে গত কয়েক বছরেই বেমালুম পালটে দিয়েছে আমাদের প্রিয় দুর্গাপুর শহরকে। সেদিনের সেই শিল্পশহরের তুলনায় বর্তমান শিল্পশহর দুর্গাপুর অনেক বেশি উন্নত ও জনবহুল হলেও আমরা কোথাও যেন বড় স্বার্থপরায়ণ হয়ে গেছি, আর সেই কারণেই হয়তো দিনের পর দিন, বছরের পর বছর আমাদের প্রিয় এই শিল্পশহরের চারপাশ বিষাক্ত পার্থেনিয়াম গাছে ঢাকা পড়ে গেলেও সেদিকে আমাদের কারোর নজর যায়নি। যার কারণ হল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততার মাঝে ওই অপ্রয়োজনীয় পার্থেনিয়াম গাছকে প্রত্যেকদিন প্রতিনিয়ত চোখের সামনে দেখলেও কোনও গ্রাহ্যই করিনি। কারন বিষাক্ত গাছ হিসবে পরিচিত অইউ গাছ থেকে সকলেই নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি। তাসত্বেও যেভাবে গোটা শিল্পশহরের আনাচে-কানাচে পার্থেনিয়াম গাছের রমরমা বিস্তার এই বাংলায়-র ক্যামেরায় উঠে এসেছে তা যথেষ্ট উদ্বেগপ্রবণ। কারণ এই পার্থেনিয়াম গাছ থেকে আপনি নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখেছেন ভাবলে তা ভুল, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যেকোনো ভাবে এই বিষাক্ত গাছ মনুষ্য শরীরে ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করছে, যাকে ইংরেজি ভাষায় বলা হয় “Silent Killer”।

এবার আসা যাক পার্থেনিয়াম গাছ সম্পর্কে। মূলত এই পার্থেনিয়াম গাছ ভারতীয় জলবায়ুতে বেড়ে ওঠা অন্যান্য উদ্ভিদকুলের মধ্যে পড়ে না, কারণ অতীতে সুদূর মেক্সিকোতেই কেবলমাত্র এই পার্থেনিয়াম গাছ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে চুপিসারে বংশবিস্তারের ফলে বর্তমানে এই পার্থেনিয়াম গাছ ভারতের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লক্ষ্য করা যায়। লম্বায় সাধারনত এক থেকে দেড় মিটার উচ্চতার এই পার্থেনিয়ামের বৈজ্ঞানিক নাম হল পার্থেনিয়াম হিস্টারোফোরাস। পার্থেনিয়াম গাছের জন্য কোনওরকম বিশেষ যত্নের প্রয়োজন পড়ে না। যেকোনোরকম প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে এই বিষাক্ত গাছ। আর আপনার আমার চাষের জমি পেলে তো কথায় নেই, চাষের জমি থেকে জল আর সার পেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠে পার্থেনিয়াম। সবথেকে অবাক করার বিষয় হল, এই পার্থেনিয়াম গাছের গড় আয়ু হল তিন থেকে চার মাস। আর এই তিন চারমাসের জীবনে এক একটি পার্থেনিয়াম গাছ থেকে জন্ম নেয় প্রায় ২৫ হাজার পার্থেনিয়াম গাছের চারা। একটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবেন পার্থেনিয়াম গাছে ছোট ছোট সাদা রঙের অজস্র ফুল ফুটে থাকে। এই ফুলের মধ্যেই থাকে সাদা-আঠালো পিচ্ছিল এক পদার্থ, যা মানুষের শরীর এবং চাষের জমিতে রাখা শস্যেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। জানা গেছে, কোনও চাষের জমিতে পার্থেনিয়াম গাছ গজিয়ে উঠলে সেই জমিতে শস্যের ভাগ শতকরা ৪০ শতাংশ কমে যায়। শুধু তাই নয়, এই পার্থেনিয়াম গাছের ফুল থেকে শুরু করে পাতা, ডালপালা সমস্ত গাছই মানুষের শরীরে ব্যাপক ক্ষত করে। দীর্ঘদিন ধরে পার্থেনিয়াম গাছের সংস্পর্শে থাকলে মানব শরীরে মারণ রোগ ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। শুধু তাই নয়, এই পার্থেনিয়ামের জেরে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, জ্বর, অ্যালার্জি, চর্মরোগের মতো নানান দীর্ঘকালীন রোগের শিকার হতে পারেন সাধারণ মানুষ। আমাদের দেশেই পার্থেনিয়াম গাছের বিষক্রিয়ায় একাধিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনার উদাহরণ রয়েছে। পার্থেনিয়াম গাছে যেসমস্ত অ্যাসিড রয়েছে তার সবগুলিই মনুষ্য ও প্রানীজগতের জন্য ব্যাপক ক্ষতিকর। কিন্তু আমাদের নজরদারি এবং গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে দিনের পর দিন চুপিসারে আমাদের শরীরে ভয়াবহ ক্ষতি করে চলেছে এই পার্থেনিয়াম। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে এই বিষাক্ত পার্থেনিয়াম থেকে মুক্তির উপায় কী? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, যেভাবে আগাছা পরিষ্কারের জন্য আমরা চাষের জমিতে পেস্টিসাইড ব্যবহার করে থাকি সেভাবেই এই মারণ পার্থেনিয়াম থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তারা জানাচ্ছেন, ব্রোমাসিল, টারবাসিল অথবা ডায়কুয়াট নাম রাসায়নিক জলে মিশিয়ে পার্থেনিয়ামের জঙ্গলে স্প্রে করলে তা নিধন সম্ভব। এছাড়া, আগুন লাগিয়েও এই গাছের বংশবৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব, কিন্তু এতে পার্থেনিয়ামের ফুলের মধ্যে থাকা পরাগ হাওয়ায় উড়ে গিয়ে ফের পার্থেনিয়াম গাছের বংশ বিস্তারের সহায়ক হতে পারে, তাই রাসায়নিক প্রয়োগেই এর নিধন সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রক্রিয়া। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে শিল্পশহরের নগর নিগম প্রশাসন এইবিষয়ে এখনই কেন দৃষ্টি দিচ্ছে না? বৃহৎ প্রশাসনিক দফতর এবং লোকবল থাকা সত্ত্বেও শহরজুড়ে যে বিষাক্ত পার্থেনিয়াম গজিয়ে উঠছে তার নিয়মিত নিধনের দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে না। ফলে গোটা শিল্পশহর পরিণত হয়েছে পার্থেনিয়ামের মুক্তাঞ্চলে। সব জানার পর শিল্পশহরের বাসিন্দাদেরও প্রশ্ন কবে এইবিষয়ে সজাগ দৃষ্টি দেবে পৌরনিগম ও তার আধিকারিকেরা?