দুর্গাপুরে এক আধিকারিক নিখোঁজের ঘটনায় আতঙ্কিত দুর্গাপুর শিল্প মহল ও আধিকারিকরা । কি বলছেন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

0
890

নিজস্ব সংবাদাতা, দুর্গাপুরঃ- দীর্ঘদিন লকডাউনের পর যখন শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা তাড়া করছে শিল্পাঞ্চলের মানুষকে, ঠিক তখন শিল্প কারখানার একজন আধিকারিকের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়াল শিল্পাঞ্চল জুড়ে ।

একদিকে যেমন বেকারের সংখ্যা হু হু বেড়ে চলেছে, ঠিক সেইমতো শিল্প কারখানা সংখ্যা বাড়ছে না । বরং একের পর এক শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিল্পের খরা কাটাতে বহু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন কিন্তু তাসত্বেও নতুন শিল্পের আগমন ঘটেনি । এরফলে বেকারের সংখ্যা দিনদিন বেড়েছে । সে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দুশ্চিন্তা বেড়েছে বই কমেনি । ঠিক সেইসময় করোনা আতঙ্ক নেমে আসে দেশের মানুষের উপর । লকডাউনে চলে যায় দেশ । দেশজুড়ে দীর্ঘদিন লকডাউনের ফলে সমস্ত শিল্প কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় । একদিকে কল কারখানা বন্ধ, অন্যদিকে করোনা’র আতঙ্ক, এই দুয়ে মিলে শ্রমিকদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে ।

এরপর লকডাউন শিথিল হতেই একের পর এক শিল্প কারখানার উপর নেমে আসে জঙ্গি রাজনৈতিক আন্দোলন । যে আন্দোলনে শ্রমিকদের তথা শিল্পাঞ্চলের মানুষদের কতটা উপকার হচ্ছে, তা জানা না গেলেও এটা সত্যি শিল্প কারখানায় একটা অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে । আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন ওইসব শিল্প কারখানার আধিকারিক তথা মালিকরা । এমনই অভিমত বিশেষজ্ঞ মহলের । তাদের বক্তব্য, ঘাসফুল শ্রমিক নেতারা আজ পর্যন্ত একটিও বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা খুলতে পারেনি অথচ চালু থাকা কারখানাগুলিতে বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনের নামে চাপ সৃষ্টি করতে পারদর্শী । এহেন নেতাদের কার্যকলাপে আতঙ্কিত শিল্পপতিরা ।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর এমনিতেই দুর্গাপুরে বিভিন্ন বেসরকারি কল কারখানা এখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে | শ্রমিক মহল যখন একটু আশার আলো দেখতে শুরু করেছে, ঠিক সেইসময় দুর্গাপুরে ভরদুপুরে এক বেসরকারি শিল্পের আধিকারিকের নিখোঁজের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি শিল্প কারখানার আধিকারিক এবং শিল্পপতিদের মহলে ।

এদিকে দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের কারখানা মালিক সংগঠনের প্রধান শ্রী শংকর আগারওয়াল জানান “দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে এইরকম এর ঘটনা আগে জানা যায়নি। এখন এটা আতঙ্কের ব্যাপার নিশ্চয়ই । কোথা থেকে এলো কিডন্যাপিং গ্যাং যারা এই ধরনের অপহরণ করেছে। সেই নিয়ে চিন্তিত আমরা সবাই । তবে করার তো কিছু নেই পুলিশ এর যথাযথ ব্যবস্থা নেবে বলে আশা রাখছি।”

গতমাসে এক বেসরকারি সংস্থা গ্রাফাইট কারখানার গেটে জঙ্গী আন্দোলন করে তৃণমূলের নেতারা । কোনও কাউন্সিলর যেন কোনও কারখানার গেটে না যায়, তৃণমূল নেত্রীর এমন নিদান থাকা সত্বেও গ্রাফাইট গেটে ওই জঙ্গী আন্দোলনে প্রায় দশজন কাউন্সিলর অংশগ্রহণ করে । তার কয়েকদিন পরেই গ্রাফাইট কারখানার এক আধিকারিকের দুর্গাপুর বাজার সংলগ্ন শান্তিবন-এর বাসভবনে গভীর রাতে পাঁচটি বাইকে দশজন দুষ্কৃতী এসে হামলা চালায়। এনিয়ে কোকওভেন থানায় একটি লিখিত অভিযোগ জানান ওই আধিকারিক বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে এই আন্দোলনে বীতশ্রদ্ধ হয়ে কাঁকসার এক বেসরকারি কারখানার এক আধিকারিক সাফ জানিয়ে দেন, এইরকম কারখানায় অনৈতিকভাবে গন্ডগোল পাকাতে থাকলে তিনি কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন । অর্থাৎ দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে প্রতিটি কারখানার মালিক ও আধিকারিকরা এখন বিভিন্ন কারণে আতঙ্কে রয়েছেন । রাজ্য সরকার অবিলম্বে শিল্পবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে না পারলে, শিল্পপতি এবং আধিকারিকদের নিরাপত্তা না দিতে পারলে, আগামীদিনে দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে একের পর এক শিল্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এমনই মত বিশেষজ্ঞ মহলের।

আমরা এই বিষয়ে পশ্চিম বর্ধমান জেলার প্রথম সারির চারটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে কথা বলেছি ।

পশ্চিম বর্ধমান তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতা ভি.শিবদাসন দাসু কে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, “যারা পশ্চিমবঙ্গের আইন শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা বামফ্রন্টের সময় কোথায় ছিলেন ? বামফ্রন্টের আমলে যত খুন, ডাকাতি, অপহরণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে তার বোধহয় ১% পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস আসার পর হয় নি । আর নিরাপত্তার প্রশ্নে যদি বলেন, তাহলে বলি যবে থেকে আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট হয়েছে আমাদের পশ্চিম বর্ধমান জেলাতে তখন থেকেই একটা জিনিস লক্ষ্য করা গেছে যে পুলিশ অতি দক্ষতার সাথে ক্রাইম কন্ট্রোল করেছে । ক্রাইম রেট নিচের দিকে নামিয়ে দিয়েছে। অপরাধীদের গতিবিধি অনেক কন্ট্রোল হয়েছে । একজন কারখানার আধিকারিক অপহরণ হয়েছে যদি অভিযোগ করেছে পুলিশের কাছে তার পারিবার , তাহলে অবশ্যই পুলিশ আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নেবে। এখানে রাজনৈতিক কোনো ব্যাপার বা সুরক্ষা হীনতা কোথা থেকে আসছে, তা আমার মাথায় ঢুকছেনা।”

জেলা জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা তরুণ রায় বলেন “পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ এখন দলদাসে পরিণত হয়েছে। যে সমস্ত ভালো অফিসাররা এখনো পুলিশে আছে তাদেরকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। গোটা রাজ্য জুড়ে প্রশাসন এখন দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে। এই রকম চলতে থাকলে আগামী দিনে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে দুর্গাপুর ও তার আশেপাশের শিল্পাঞ্চল এলাকা গুলিতে ।

পশ্চিম বর্ধমান জেলা বিজেপির শীর্ষস্থানীয় নেতা লক্ষ্মণ ঘড়ুই বলেন “শুধু দুর্গাপুর আসানসোল শিল্পাঞ্চলেই নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গে এখন আইনের শাসন নেই । সারা শিল্পাঞ্চল জুড়ে যেভাবে তোলাবাজি, কাটমানি, গুন্ডামি চলছে সবই তৃণমূল পুলিশকে সঙ্গে নিয়েই করছে । তাই সমস্ত শিল্পাঞ্চলে আজ আর কোনও মানুষের নিরাপত্তা নেই । সে আপনি স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে কারখানা ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে বলুন না কেনো । দুর্গাপুর আসানসোল শিল্পাঞ্চলে এই ধরনের ঘটনা আগে ছিল না । গত দু’বছর আগে দুর্গাপুর পৌরনিগম নির্বাচনের পর থেকেই এই সব ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে । এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমাদের জেলা পশ্চিম বর্ধমানের কুলটিতে অস্ত্র তৈরীর কারখানার হদিশ পাওয়া গেছে । কিন্তু পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি এখনো পর্যন্ত । তাই মানুষ যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সেটা এক কথাতেই বলতে পারা যায় । তবে কিছুদিনের মধ্যেই আগামী বিধানসভা নির্বাচনের পরেই মানুষকে আমরা নিরাপত্তা দিতে পারব বলে নিশ্চিত করে বলতে পারি ।”

পশ্চিম বর্ধমান জেলার সি.পি.আই.এম দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা পঙ্কজ রায় সরকার বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে ল এন্ড অর্ডার বলে কিছু নেই । পশ্চিমবঙ্গে এমনিতে কোন শিল্প আসছে না । আর যে ক’টি শিল্প এখানে রয়েছে তৃণমূলের গুণ্ডাবাহিনীর দাদাগিরি জন্য তারাও পাততাড়ি গোটানোর রাস্তায় রয়েছেন । তৃণমূলের দাদাগিরি জন্য তারা অতিষ্ঠ । গত ২০১১ থেকে এই এখন অবধি এটা চলে আসছে । পশ্চিমবঙ্গের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার জন্য যে ক’টি শিল্প এখনও চলছে সেগুলো খুব তাড়াতাড়ি রাজ্য থেকে বিদায় নেবে । এইরকম ভাবে একটা শহর চলতে পারে নাকি? যে একজন ব্যবসায়ী বা কারখানার আধিকারিক দুর্গাপুর থেকে অপহরণ বা নিখোঁজ হয়ে গেলেন আর পুলিশ এখনো ৭২ ঘণ্টার পরেও তাকে খুঁজে বার করতে পারলো না ? যে পুলিশের কাছে পাই-টু-পাই প্যাডের কয়লার লাখ লাখ টাকার সময় ধরে ধরে হিসেব থাকে । কোন গাড়িতে প্যাড লাগিয়ে অবৈধ কয়লা যাচ্ছে, কোন গাড়িতে অবৈধ লোহা যাচ্ছে এবং কোন গাড়িতে বালি অবৈধ যাচ্ছে তার হিসেব থাকে। আর একজন ব্যবসায়ী বা আধিকারিক দুর্গাপুর থেকে নিখোঁজ হয়ে গেল আর পুলিশ তা খুঁজে বার করতে পারল না এখনো । মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই পুলিশ মন্ত্রী হিসেবে ব্যর্থ । এইতো কয়েকদিন আগেই দুর্গাপুরের কোক ওভেন থানার আধিকারিক বড়বাবুকে বদলি করে দেওয়া হলো । কারণ তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্বের জন্য । পুলিশের মধ্যে এখনো অনেক এরকম আধিকারিক আছেন যারা দক্ষ, যোগ্য ও সক্রিয় । কিন্তু তারা যখন দেখছেন যে তাদের পুলিশ বিভাগে তাদের পাশে নেই তখন তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন । তাই সেই সব পুলিশ আধিকারিকরাও এখন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছেন । এটা আমাদের জন্য দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যের বিষয়।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here