বিজে-বাম বনাম বিজে-মূল…

0
1098

দীপাঞ্জন দাসঃ ছোটোবেলায় চা বানিয়েছেন, মানুষজনকে বিক্রি করে খাইয়েছেন।এমনটাই দাবী করে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই স্বাদ আস্বাদন করা আজকের কারোর সম্ভব হয়নি বলেই আমার ধারণা। সেই মাটি খুঁজে ভাঁড় তৈরী করেন যারা, তাদের গল্প বলতেও একসময় শোনা যেত একদল ছাপোষা লোকজনের কাছে। লাল-সবুজ-গেরুয়া কোনো রঙ তাদের ছুঁয়ে ফেলতে পারেনি। হাজারো কাজের মাঝেই তখন তুমুল বিতর্কে মেতে উঠত শিক্ষিত-‘অশিক্ষিত’দের দল। কেউ তাদের অশিক্ষিত বলে গাল পাড়ত না; আর চাওয়ালা হওয়ার বিদ্রুপও তাদের সহ্য করতে হয়নি কখনও। সেই চা নালার গ্যাস থেকে তৈরী হয়েছিল কিনা জানার উপায় নেই। তবে মানুষ সে সবে তখনও মেতে উঠতে শেখেনি। লড়াই ছিল তবে লড়াইয়ের মতোই।শুধু জিভে লেগে থাকা ওই চাইয়ের স্বাদই বারংবার প্রতিদিনের অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাতো কোনো এক অমোঘ আকর্ষণে। একদল ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীর গল্প বলত, সবাই শুনত থিতু হয়ে। বিশ্বাস সেদিন ছিল রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আজ ওই গল্প বলার লোক থাকলেও শোনার লোকের বড়ই অভাব। মাটির ভাঁড়ের ধোঁয়া ওঠা সেই চা-এর গন্ধ আজকের তথাকথিত কমরেডরাই ভুলতে বসেছেন, শ্রেণিশত্রু বানিয়েছেন নিজের বন্ধুদের। মনে পড়ে কমরেড সেই দিনগুলোর কথা? দোকানের আলোচনা যখন তুফান হয়ে ধরা দিয়েছিল এই বাংলায়। মাটির তাগিদে মাটি কামড়ে থাকার সেই লড়াই কিন্তু আমজনতারই ছিল। সিদ্ধার্থ সেদিন গৌতম বুদ্ধ হতে পারেনি, যেমনটা পরবর্তীতে পারেননি বুদ্ধবাবুও। বিরোধাভাসকে টুঁটিচেপে হত্যা করার মানসিকতা কোনো অংশে কম ছিল না।“ওরা ৩৪,আমরা ২৩৪”–এর গর্ব ছিন্ন হয়েছিল আপনাদেরই দেখানো পথে। যে আন্দোলন আনন্দমারগীদের হত্যায় সংঘটিত হয়নি, যে আন্দোলন সুশান্ত, মজিদ, লক্ষণদের বিরুদ্ধে সংঘটিত করা যায়নি, তা আছড়ে পরে জনরোষোরূপে। সেদিনের রক্তমাখা ভাতের কথাও অনায়াসেই মিথ্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার সাহস দেখান, হ্যাঁ আজও। মানুষ যুক্তি দিয়েই বিচার করে। কিন্তু সবার আগে সমসাময়িক দৃষ্টিভঙ্গীকে দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে। প্রতিবার আপনারা স্বঘোষিত বামপন্থার জোড়ে যে জয়লাভ করেছিলেন তা অনেকাংশেই ছিল স্বরচিত রবীন্দ্রসংগীতের মতো যাকে বামপন্থার মোড়কে উপস্থাপন করেছিলেন আর পাঁচটা রাজনৈতিক দলের মতোই। ‘পৈতে আমার পিঠ চুলকাতে কাজে লাগে’ জাতীয় ধর্মবিরোধী মন্তব্য করেই বামপন্থী হতে হয়-এভাবনাতো আপনারায় জনমানসে প্রবেশ করিয়েছেন। অথচ অনেক বামপন্থীদের দেখেছি বাড়িতে শতাব্দীপ্রাচীন পূজোকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, স্মরণ নিতে দেখা গিয়েছে ইষ্টদেবতার। আদপে সুবিধাবাদী রাজনীতির যে বীজ আপনারা পুঁতেছিলেন, তাঁর ফল যে আপনাদেরকেও খেতে হবেই।অবশ্য একটি বিষয়ে কৃতিত্বের দাবী রাখতে পারেন। কোনো ধর্মকে বিশেষ তোয়াজ আপনারা করেননি। ধর্মের নামে হিংসার বীজবপনকারীদের কড়া শাস্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। আবার সামাজিক ক্ষেত্রে আপনারা তা যে মেনে চলেননি তা প্রকট হয়ে পরে সাচার কমিটির রিপোর্টে। ক্ষমতাকে ধরে রাখার সমস্ত অগণতান্ত্রিক মেশিনারিও সেদিন আপনাদের বাঁচাতে পারেনি। “বদলা নয়, বদল চাই” স্লোগানে গড়ে উঠল মা-মাটি-মানুষের সরকার। যদিও বদলা নেওয়া হয়নি এমনটা হলফ করে বলা যায় না। তবে আপনাদের অতীত আচরণের ফলশ্রুতি রূপেই তাকে গ্রহন করেছিল সাধারণ মানুষ। সামাজিক খাতে বিবিধ কাজ করা সত্ত্বেও বারংবার বিদ্ধ হলেন তোষণের। আজকের ভোটের ময়দানে মাননীয়া মমতা দিদিকে খেলতে হল খানিক ব্যাকফুটেই। যদিও ফল ভোগ করেছেন কিছু সংখ্যালঘু ধর্মগুরু; সাধারণ মানুষ আছেন সেই তিমিরেই। এই বাংলায় ধর্মীয় মেরুকরণ হল প্রথমবার। তাতে ইন্ধন যোগাল পঞ্চায়েতে সবার ভোট দিতে না পারার ক্ষোভ।অনশনরত এস.এস.সি পরীক্ষার্থীদের সাথে করা তাচ্ছিল্য, পাড়ার স্বঘোষিত নেতাদের অহংকারের জবাব প্রতিফলিত হল ভোটবাক্সে। “ঘেও ঘেও” ছেড়ে কামড়েই দিলেন সরকারী কর্মচারীরা। “জয় শ্রী রাম” কে গালি হিসাবে পরিগণিত করে হঠাৎ প্রাসঙ্গিক করে তুললেন আর হিন্দু জাগরণের ধুয়ো তুলে হিন্দু ভোটের বড় অংশ পেল বিজেপি। আর খানিক ভক্তি ও খানিক ভয়ে সংখ্যালঘুর প্রায় পুরো ভোটই পেল তৃণমূল।বামেদের অকাতরে রক্তদানের ছিটে পড়ল চারপাশেই।তথাকথিত বামেদের ঔদ্ধত্বের তবুও আজ শেষ নেই। আসনভিত্তিক আলোচলা করতে বসলে অনেক কথা বলা যায়। তবে কয়েকটি আসনের কথা আপাতত বলতে চলেছি। যাদবপুর থেকে জিতেছেন অভিনেত্রী মিমি। সিপিএম এর বিকাশবাবু জিততে না পারার দায় মানুষের উপর ঠেলে দিয়ে ইতিমধ্যেই তাদের শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন স্বঘোষিত বামপন্থীরা। বিকাশবাবু নিঃসন্দেহে যোগ্য রাজনীতিবিদ কিন্তু কোলকাতা পৌরসভায় মেয়র থাকাকালীন তাঁর কাজের মূল্যায়ন করতে তারা পিছিয়ে আসেন কেন? তাঁর থেকেও বড় বিষয় এটিই যে, মানুষ চাননি তাই ভোট দেননি। সেটা মাথা পেতে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের। বসিরহাটে নূসরতই হোন বাঁ হুগলীতে লকেট, তারা অভিনেত্রী পরিচয়ে পরিচিতি লাভ করেছেন বলে তাদের অশ্লীল আক্রমণ করা যায় না। মুখে আধুনিকতার কথা বললেও তাদের পোষাক পরিচ্ছদ দেখে বুক পিঠের মাপ নেওয়া এই মেকী বামপন্থীরাই নিজেদের পতন ডেকে সুবিধা করে দিয়েছেন অন্যদের। অন্যের হিন্দী, ইংরেজি ভাষার উচ্চারণে নজর না এবার অন্তত সূর্যবাবুরা বাংলায় ফিরে আসুন। ফেবু বিপ্লবে জয়ী হয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগা আপনাদের এই পরাজয়ের আরেকটি কারণ।মানুষের রায় বিজেপিতেই যাক বা অন্য দলেই ঝুলিতে, তাকে সম্মান করতে শিখুন।বাম্পন্থাতো অনেক আগেই মারা গিয়েছিল।শূধু থেকে গিয়েছিল ক্ষমতা ধরে রাখার সুনিপুণ কৌশল। স্থবিরতা আপনাদের কয়েক বছর পিছিয়ে দিলেও আপনারা আত্মসমালোচনায় বিন্দুমাত্র আগ্রহী নন, সেখানে পাশের ত্রিপুরা থেকে মানুষ শিক্ষা নেবেন এ আশা করা অন্যায়।পুটকি দিয়ে তাই জপমালা গায়ে নিতেও এদের দু মিনিট লাগে না। মার্ক্স বলেছিলেন, ধর্ম মানুষের জন্য আফিম ও শোষিতের দীর্ঘনিঃশ্বাস। প্রথম অংশটুকু প্রচার করে আপনারা শোষিতদের কান্না থামাতে পারেননি, পারবেনও না।সময় বড় কম,শোধরাতে চাইলে অহং ত্যাগ করুন। সবশেষে কবির কথাতেই বলি – “তিন মিনিট বাইশ সেকেণ্ডে বিপ্লব আসে না…”