বাসাবাড়ি ও দোকানঘর ভাড়া দেওয়া-নেওয়াকে কেন্দ্র করে আর এক বাস্তব জীবন- জীবিকার মুখোমুখি মানুষ

0
1653

অমল মাজি, দুর্গাপুরঃ- সারা দেশজুড়ে লকডাউন চলছে। তারমধ্যে বাসা বাড়ি ভাড়া এবং দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে গোটা শিল্পাঞ্চল জুড়ে।
এই ভাড়া দেওয়া-নেওয়া ক্ষেত্রে কি হবে, সেইনিয়ে আমাদের রাজ্য তথা জেলা প্রশাসন এখনো তেমন কিছুই জানায়নি। তবে সমাজের বিভিন্ন মহলের মানুষ এই ভাড়া দেওয়া – নেওয়া বিষয়টি নিয়ে তেমন গুরুত্ব দিতে রাজি নন। তবে তাদের একটাই বক্তব্য , লকডাউনে সমস্ত কল কারখানা বন্ধ থাকার জন্য শ্রমিক শ্রেণীদের কাছ থেকে বাসা বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ব্যাপারে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ অনুসরণ করা উচিত। অর্থাৎ লকডাউন সময় ভাড়া না নেওয়া উচিত | লকডাউন উঠে যাওয়ার পর ভাড়াটিয়ারা বকেয়া বাসা বাড়ি ভাড়া মিটিয়ে দেবেন।
দেখে নেওয়া যাক, দেশে লকডাউন ঘোষণা হওয়ার পর দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কি বলেছিলেন ?
আগামী দুই থেকে তিন মাসের ভাড়া দিতে যদি কেউ অসমর্থ হয়, তাহলে তাদের বাড়ি ভাড়া সরকার পরিশোধ করবে বলে জানিয়েছিলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। এছাড়া লকডাউনে সময় ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে জোর করে বাড়ি ভাড়া আদায় না করার জন্য বাড়ির মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিলেন তিনি। এক প্রেস কনফারেন্সে কেজরিওয়াল বলেছিলেন , করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে যাতে নাগরিকদের সাধারণ জীবনযাপন করতে কোনও বেগ পেতে না হয় তা দেখতে হবে।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন , ‘ আমি সব বাসাবাড়ির মালিকদের অনুরোধ করব, সামনের দুই থেকে তিন মাস বাড়ি ভাড়া আদায়ের জন্য জবরদস্তি করবেন না। দয়া করে কয়েক মাসের জন্য এটা স্থগিত রাখুন। যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তখন যদি কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে অসমর্থ হয় তখন সরকার তাদের হয়ে বাড়ি ভাড়া দিয়ে দেবে। এরপরও যদি কোনো বাসাবাড়ির মালিক বাড়ি ভাড়া আদায়ে জবরদস্তি করে, তাহলে তাদের বিরদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকেও নির্দেশিকা জারি করে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, ভিন রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের থেকে এক মাসের বাড়ি ভাড়া নিতে পারবেন না।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে সামনে রেখেই দুর্গাপুর স্টেশন বাজার কমিটির জয়েন্ট সেক্রেটারি শুভজিৎ নিয়োগী এবং গৌতম দাস বলেন ,এই ভাড়া দেওয়া বা নেওয়ার বিষয়ে সরকারি কোনও নির্দেশ তাদের কাছে নেই। তাই ভাড়া মুকুবের কোনও প্রশ্নই উঠে না। আর কেউ যদি স্বেচ্ছায় ভাড়া না নেয় তাহলে সেটা আলাদা ব্যাপার। আমরা কাউকে চাপ দিয়ে বলতে পারবো না , কেউ ভাড়া নেবেন না। খারাপ আর্থিক অবস্থার জন্য কেউ যদি ভাড়া দিতে না পারে , আর সেটা যদি বাজার কমিটিকে জানায় , সেক্ষেত্রে আমরা অনুরোধ করতে পারি মাত্র। তার বেশিতো কিছু করতে পারবো না। তাহলে সবাই একই দাবি তুলতে পারে। সেক্ষেত্রে কতজনের দাবি মেটানো সম্ভব ?
শুভজিৎবাবু বলেন, এটা বাজার অর্থাৎ ব্যবসাক্ষেত্র , বাসা-বাড়ি ভাড়া নয়। দোকানঘর ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন ব্যবসায়ীরা। সেক্ষেত্রে ভাড়াতো দিতেই হবে। তবে এখন লকডাউনের সময় কোনও দোকান ঘরের মালিক জবরদস্তি ভাড়া চাইবেন না। লকডাউন উঠে যাওয়ার পর, ব্যবসা চালু হওয়ার কিছুদিন পর মালিকরা ভাড়া চাইতে পারবেন অবশ্যই। আর যাদের ব্যবসা ভালো চলে, তারা অনেকেই এই লকডাউনের সময়ই ভাড়া দিয়ে দিচ্ছেন। শুভজিৎবাবু বলেন, অনেক দোকান ঘর মালিক আছেন, যাদের সংসার চলে এই ভাড়ার উপর নির্ভর করে। তারা যদি ভাড়া না পান তাহলে অভুক্ত অবস্থায় থাকবেন তারা। তাই তাদের দিকটাও দেখতে হবে এবং ভাবতে হবে।
গৌতম দাস বলেন , দুর্গাপুর স্টেশন বাজারে ৬৮০ টি দোকান আছে। তারমধ্যে দুশোর মতো দোকান খুব ভালো চলে না। তাদের ক্ষেত্রে দোকানঘর মালিকরা যদি মানবিক খাতিরে নিদিষ্ট ভাড়া থেকে কিছুটা কম নেন তাহলে অবশ্যই ভালো হয়। না নিলে কিছুই করার নেই। সেটাও সেই মানবিক খাতিরেই দেখতে হবে।
এদিকে স্টেশন বাজারে ‘জনতাস্টোর’ নামে এক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী অনিত আগরওয়াল বলেন, সরকারি নির্দেশ না থাকায় ভাড়া দিতেই হবে। এটা সরকারি দোকান ঘর নয়, এইগুলো পাবলিক দোকান ঘর। তাই তিনি তার দোকানের ১৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে যাচ্ছেন এবং দেবেনও।
অধিকাংশ ব্যাবসায়ীর যেখানে বসবাস, সেই জোনাল সেন্টারের এক ব্যাবসায়ী অমিত সরাফ বলেন, ভাড়া মুকুবের প্রশ্নই উঠে না। সরকারি কোনও নির্দেশ না থাকায় তিনি তার সমস্ত দোকানের ভাড়া দিচ্ছেন। আর এক ব্যাবসায়ী স্বপন কুমার দাস বলেন, দোকান ঘরের ভাড়াতো দিতেই হবে। বাসা বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রে মানবিক দিক দিয়ে হয়তো এক দুই মাস মুকুব করা যেতে পারে। তবে ভাড়া মুকুবের বিষয়ে সরকারিভাবে কোনও নির্দেশ নেই। এছাড়া বাড়ির মালিকের দিকটাও দেখতে হবে সবাইকে। অনেকের ব্যাঙ্ক লোনের ই এম আই চলছে। সেক্ষেত্রে তিনি যদি ভাড়া না পান তাহলে ই এম আই দেবেন কি করে ? সেইদিকটাও ভাবতে হবে।
দুর্গাপুর চেম্বার অফ কমার্সের প্রেসিডেন্ট কবি দত্ত বলেন, এই ভাড়া নেওয়া এবং দেওয়ার ব্যাপারে বা ভাড়া মুকুবের ব্যাপারে সরকারি কোনও নির্দেশ তাদের কাছে নেই।
অন্যদিকে, সরকার যেসমস্ত ক্ষেত্রে ভাড়া নেয় সেখানে ভাড়া মুকুবের কোনও নোটিশ জারি করে নি। এডিডিএ (আসানসোল দুর্গাপুর ডেভলপমেন্ট অথরিটি ) জানিয়ে দিয়েছে, যেসমস্ত ক্ষেত্রে এডিডিএ রেন্ট নেয়, তা সময়মত না দিলে 10% লেট ফি দিতে হতো। কিন্তু এখন লকডাউন চলার জন্য সেই রেন্ট পরে দিলেও কোনও লেট ফি দিতে হবেনা।
এদিকে ওয়াকিবহাল মহলের প্রশ্ন , সরকার যেখানে গাড়ি বাড়ি লোনের ইএমআই তিন মাসের জন্য মুকুব করেনি, সেখানে বাড়িওয়ালাদের ভাড়া কিভাবে মুকুব করবে ? একমাত্র অনুরোধ করতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here