নিজের মৃত্যুর সময় আগাম জেনে সমাধির জায়গা দেখিয়েই দিয়েছিলেন সাধক বামাক্ষ্যাপা

0
272

সঙ্গীতা চৌধুরী, বহরমপুরঃ-  আজ ২রা শ্রাবণ। আজকের দিনেই মা তারার সন্তান সাধকশ্রেষ্ঠ বামাক্ষ্যাপার তিরোধান হয়েছিলো। বীরভূম জেলায় জন্ম গ্রহণ করা এই কালী সাধক মা তারাকে বড়মা বলে ডাকতেন, শ্মশানে করতেন সাধনা, কথিত আছে তারাপীঠের শ্মশানে মা তারা তাকে দর্শন দিয়ে সন্তান স্নেহে স্তন্যপান করিয়েছিলেন। এই সাধকের জীবনের কিছু কথায় আজকে আপনাদের বলব।

সাধক বামাক্ষ্যাপার যখন প্রায় ৭৪ বছর বয়স,তখন‌ই তার শরীরের মাংস পিণ্ড ঝুলে গিয়েছিলো, বয়স জনিত কারণে ওঠানামা করতেও তারপর কষ্ট হতো,তাই বাবার সর্বক্ষণের সঙ্গে থাকা সঙ্গী নগেন সাধক বাবাকে উঠিয়ে বসিয়ে দিতেন। তবে একদিন ক্ষ্যাপাবাবা নগেন কে ডাক দিয়ে বলেন, “ডাক এসেছে লগেন, ডাক এসেছে। ওরা আমাকে ডাকছেন”। নগেন তখন ক্ষ্যাপা বাবাকে বলেন,“ তুমি কি সব উল্টোপাল্টা বকছো বলতো? অনেক রাত হয়েছে শুয়ে পড়ো, মায়ের মঙ্গল আরতির এখনো অনেক দেরি!” এইভাবে ধমক দিয়ে ক্ষ্যাপা বাবাকে চুপ করিয়ে দিলেও সেরাতে নগেন বুঝেছিল বাবা আর বেশিদিন ইহজগতে থাকবেন না।

পরদিন ভোর বেলাতে ক্ষ্যাপা বাবা আবার নগেন কে ডাক দিয়ে বললেন,“লগেন আমাকে নদীর ঘাটে নিয়ে চল আমি চান করবো লগেন।”নগেন একথা শুনে অবাক হয়ে বললেন,“ ক্ষ্যাপা বাবা তোমার তো শরীর ভালো নেই এত ভোরে তুমি দ্বারোকা নদীর জলে চান করবে?” বাবা আবার তার স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিতে বলে উঠলেন,“হ্যাঁ করব শালা, তাতে তোর কী‌রে শালা?” বাবার সেই হুংকারে যেন জঙ্গলের সমস্ত পাখিরা জেগে উঠল মহাশ্মশান কেঁপে গেল ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ক্ষ্যাপা বাবাকে দ্বারোকা নদীর ঘাটে নিয়ে গেল নগেন।

সেখানে ক্ষ্যাপা বাবা নদীতে ডুব দিলেন আর প্রতি ডুবে তিনি জয় জয় তারা বলতে শুরু করলেন। এরপর নগেন ক্ষ্যাপা বাবাকে ঝোপড়া নিয়ে গেল,সেখান থেকে বেরিয়ে আবার তিনি শিমুলতলায় গেলেন সেখানে মায়ের চরণে মাথা রেখে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে মায়ের সাথে কীসব বললেন, এরপর মঙ্গলারতির আওয়াজ বাজতে শুরু করলে “মা তারা জয় মা তারা” বলতে বলতে ক্ষ্যাপা বাবা নিনাদ করতে থাকলেন। তাঁর যে বয়স হয়েছে তা তখন দেখে বোঝার উপায় ছিলোনা। মঙ্গলারতির ঘন্টা যখন শেষ হলো তখন ক্ষ্যাপা বাবার নগেন কে ডেকে বললেন, “লগেন এই দেখ শালা এইখানে আমার সমাধি দিবি। আমার বড়মার সাথে এই কথা হল।” এই বলে ক্ষ্যাপা বাবা নগেন কে বললেন,তোল শালা তোল আমায়।

ক্ষ্যাপা বাবাকে দুই বাহু ধরে তুলে দাড় করালেন। নগেন ও বাবা ‘ ক্ষ্যাপা ঝোপড়া’ চলে গেলেন। ততক্ষণে সেখানে বাবার অপর একজন সঙ্গী নন্দা এসে গেছে। নন্দা সারাদিন ক্ষ্যাপা ঝোপড়াতে থাকলেও রাতের দিকে গঙ্গার ওপারে বাড়ি চলে যেতো। এরপর ক্ষ্যাপা বাবা নগেন কে বললেন,“ শালা গ্যাঁজা সাজ” বাবার কথায় নগেন গাঁজা সাজতে শুরু করলো আর সমস্ত কথা নন্দা কে বলল।

বাবা কান্নার শব্দ শুনে বললেন, ও শালা লগনা নন্দা শালা কাঁদছে কেন রে? নগেন বললেন ও কিছু নয় বাবা।

এরপর সারাটা দিন গেল দুপুরে মায়ের সামান্য ভোগ খেলেন বাবা আর সন্ধ্যেবেলায় মায়ের আরতি করলেন তারপর আরতির পর সামান্য প্রসাদ ( লুচি চিঁড়ে মুড়কি)খেয়ে নগেন ও নন্দাকে খেতে বললেন। তারা প্রসাদ গ্রহণ করলে তারপর খ্যাপা বাবা তন্ত্রের ক্রিয়া শুরু করলেন মাঝে শুরু করলেন গাঁজা সেবন‌ করলেন। তন্ত্র ক্রিয়া শেষ করার পর উত্তর দিকে মুখ করে ‘জয় তারা জয় জয় তারা’ রব ধরে রইলেন ক্ষ্যাপা বাবা।

সেই রাতে আনুমানিক ১ টা ৫ মিনিট নাগাদ ক্ষ্যাপা বাবার ব্রহ্মতালু ফট করে ফেটে গেল ব্রহ্মতালু দিয়ে সামান্য রক্ত গড়িয়ে পড়লো। তন্ত্র সিদ্ধি ত্রিকালদর্শী বামাচারী সাধক বামাক্ষ্যাপা ১৩৮৮ সালের ২রা শ্রাবণ আষাঢ়ে কৃষ্ণ অষ্টমী তিথিতে মনুষ্য শরীর ত্যাগ করে সূক্ষ্ম শরীরে শিব লোকে পৌঁছে গেলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here