তাৎপর্যময় ২১ শে জুলাই

0
197

জ্যোতি প্রকাশ মুখার্জ্জী, কলকাতাঃ- রাত পেরলেই ‘অমর’ ২১ শে জুলাই। সচিত্র ভোটার কার্ডের দাবিতে কংগ্রেসের তৎকালীন যুব সভানেত্রী মমতা ব্যানার্জ্জীর ডাকে ১৯৯৩ সালের ২১ শে জুলাই যুব কংগ্রেসের হাজার হাজার সদস্য মহাকরণ ঘেরাও করে। পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ সবার জানা। এই ঘটনা মমতা ব্যানার্জ্জীর রাজনৈতিক জীবনের এক বড় ‘টার্নিং’ পয়েন্ট। তারপর থেকে তিনি প্রথমে যুব কংগ্রেসের ও পরে তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যানারে এই দিনটি ‘শহীদ দিবস’ হিসাবে পালন করে আসছেন। করোনা পরিস্থিতিতে গত বছরের মত এবছরও দিনটি ভার্চুয়ালি পালন করা হলেও এবারে দিনটির তাৎপর্য আলাদা।


প্রথমত, এই প্রথম মমতা ব্যানার্জ্জীর ভাষণ পশ্চিমবঙ্গের বাইরে গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ সহ অন্তত ছ’টি রাজ্যে জায়েণ্ট স্ক্রিনের মাধ্যমে তৃণমূল প্রচারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এদের মধ্যে কয়েকটি বিজেপি শাসিত রাজ্য । লক্ষ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূলের সংগঠন গড়ে তোলা এবং সত্যিকারের সর্বভারতীয় হয়ে ওঠা।

দ্বিতীয়ত, সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২১ এর ঐতিহাসিক বিধানসভা জয়ের পর এটাই প্রথম ২১ শে জুলাই এবং ভার্চুয়াল সমাবেশ। যদিও সেটা বড় ব্যাপার নয়। বড় বিষয় হলো তৃণমূলের বহুল চর্চিত ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় সেটাই দেখার। তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সহ একাধিক ব্যক্তি একই সঙ্গে একাধিক পদ ‘হোল্ড’ করছে। বিধায়ক, মন্ত্রী, জেলা বা ব্লক সভাপতি সহ একাধিক প্রশাসনিক পদও অলংকৃত করতে অনেককেই দেখা যায়। ফলে দলে নিজেদের অপরিহার্য মনে করে অনেকেই নিজ নিজ এলাকায় নিজেদের ‘বেতাজ বাদশাহ’ ভাবতে শুরু করে দেয়। তখন তিনি শোনার, দেখার ও বিচার করার বিষয়টা নিজের পরিবর্তে অপরের হাতে ছেড়ে দেন। এদেরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ক্ষমতার দালাল চক্র। এতে লাভের পরিবর্তে দলের যে ক্ষতি হচ্ছিল সেটা পিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। শোনা যাচ্ছে ২১ শে জুলাই হয়তো ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি কার্যকর হতে পারে। এখন দেখার বিষয় দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা ভোগকারীরা স্বেচ্ছায় একটি বাদে নিজেদের অন্যান্য পদগুলো ছেড়ে দেন কিনা। তবে মনে রাখা দরকার দলের সংগঠন বৃদ্ধিতে এদের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।


মমতা ব্যানার্জ্জী গত কয়েক বছর ধরেই দলের দুর্দিনের অর্থাৎ জন্মলগ্ন থেকে জড়িত এবং বর্তমানে নিষ্ক্রিয় কর্মীদের যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে দলে ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু প্রায় সব জায়গাতেই তার নির্দেশকে কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে। পরিবর্তে এমনকি ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যারা অন্য দলের দালালি করেছে এবং পরে তৃণমূলে যোগদান করেছে তাদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় স্তরের এক শ্রেণির নেতার প্রশ্রয়ে এদের জন্য তৃণমূলের যত দুর্নাম। তৃণমূল নেতৃত্ব কি এদের পরিবর্তে পুরনো দিনের কর্মীদের মর্যাদা দিতে পারবে? দলের সত্যিকারের শ্রীবৃদ্ধি চাইলে পুরনোদের সঙ্গে সঙ্গে নতুনদের গুরুত্ব দিতেই হবে। দেখার বিষয় দলের সুদিনে অন্য দল থেকে নিজের স্বার্থে আসা ব্যক্তিরা না দলের দুর্দিনের কর্মীরা এই গুরুত্ব পায়।


বিধানসভা ভোটের পর তৃণমূলের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শতাধিক পৌরসভার নির্বাচন। এদের মধ্যে বিধানসভা নির্বাচনে বেশ কয়েকটি পৌরসভায় বিজেপির থেকে মোট ভোটের সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ড সংখ্যাতেও তৃণমূল পেছিয়ে আছে। যদিও শোনা যাচ্ছে কোনো কোনো পৌরসভায় দলীয় প্রার্থীকে বা শহর সভাপতিকে হারানোর লক্ষ্যে তৃণমূলের এক শ্রেণির নেতারা নাকি সক্রিয় ছিল। এখন দেখার সেই সব পৌর শহরের ক্ষেত্রে তৃণমূল নেতৃত্ব কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে যেসব বুথে অথবা অঞ্চলে তৃণমূল প্রার্থী পরাজিত হয়েছে সেখানকার সভাপতিদের বদল করা হবে। লক্ষ্য করার বিষয় শুধু বুথ বা অঞ্চল সভাপতিদের ‘স্কেপ গোট’ করা হবে না ব্লক সভাপতিদেরও পরিবর্তন করা হবে?


ইতিমধ্যে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা কথা ঘুরে বেড়াচ্ছে – দলের বিধায়কের পরামর্শে নাকি সংশ্লিষ্ট ব্লকের দলীয় কর্মকর্তাদের নিয়োগ করা হবে। অনেকের আশঙ্কা এরফলে বিধায়কের পেটোয়ারা দায়িত্ব পাবে এবং যোগ্যরা বাদ যেতে পারে। কয়েকটি ব্লকে সেই সংক্রান্ত পরিবর্তনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। যদিও দলের সাংসদের ফেসবুক ওয়ালে এটা গুজব বলা হচ্ছে। ব্যক্তিগত স্বার্থে গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কিনা সেটাও দেখার। দলকে নুন্যতম নিয়ম-শৃঙ্খলায় বেঁধে রাখার এটাই সুবর্ণ সুযোগ।


‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি কার্যকর করা, পুরনোদের মর্যাদা দেওয়া, গদ্দারদের সরিয়ে দেওয়া ইত্যাদি সংক্রান্ত সমস্ত প্রশ্নের উত্তর হয়তো আগামীকাল পাওয়া যেতে পারে। এখন শুধু ভাল-খারাপের অপেক্ষা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here