অদূর ভবিষ্যতে মনুষ্য জগতকে টিকিয়ে রাখবে স্পিয়ারহেডের “বায়ো গ্যাস”

0
1122

নিউজ ডেস্ক, এই বাংলায়ঃ বর্তমান বিশ্বে সপ্তম আশ্চর্য সম্পর্কে অনেকেই শুনেছেন। বহু ভ্রমণপীপাসুও রয়েছেন যারা ইতিমধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত সেই সাত আশ্চর্য নিজের চোখে দেখেও এসেছেন। কিন্তু আধুনিক এই বিশ্বে সাতটি আশ্চর্য বিরাজ করলেও আরও এক আশ্চর্য হল প্রযুক্তি। কারণ প্রত্যেকদিন যেভাবে আমাদের এই বিশ্বে প্রযুক্তি উন্নত থেকে উন্নততর হয়ে চলেছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিই হয়তো মনুষ্য সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করবে। যার আঁচ বর্তমান যুগেই মানুষ উপলবদ্ধি করছে। কিন্তু তা বলে প্রযুক্তিকে অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। বর্তমান এই প্রযুক্তির হাত ধরেই আধুনিক বিশ্ব আজ উন্নতির চরম সীমায়। আমাদের দৈনন্দিন জীবন আজ প্রযুক্তির সঙ্গে এমনভাবে মিশেছে তা থেকে বেরিয়ে আসা আমাদের পক্ষে সম্ভবও নয়। তবে এই প্রযুক্তি নির্ভর হতে গিয়েই যেভাবে দিনের পর দিন আমরা প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতিসাধন করে চলেছি তাতে খুব দ্রুত যেমন শেষ হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ, তেমনি অত্যাধিক খনিজ সম্পদের ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ভারসাম্যও ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। একটু বিস্তারিতভাবে বললে বলা যেতে পারে, কয়লা, খনিজ তেল, ভূগর্ভস্থ গ্যাস সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ অবৈজ্ঞানিকভাবে বা বছরের পর বছর উত্তোলনের ফলে একদিকে যেমন এই সম্পদের পরিমাণ কমছে তেমনি দৈনন্দিন এইসমস্ত খনিজ সম্পদ জ্বালানী হিসেবে ব্যবহারের ফলে ব্যাপকভাবে দূষিত হচ্ছে আমাদের পরিবেশ। যার ফলস্বরূপ পৃথিবীর ওজন স্তরের ক্ষতিসাধন, হিমবাহের ধ্বংসসাধন, পরিবেশ দূষণ, পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির মতো একাধিক ঘটনার সাক্ষী হচ্ছে আমাদের এই সবুজ পৃথিবী। যার বিকল্প ব্যবস্থা এখন থেকে গ্রহণ না করলে দ্রুত ধবংসের পথে এগিয়ে যাবে পৃথিবী। বর্তমান বিশ্বে প্রায় সমস্ত ছোট-বড় দেশই এই বিষয়ে অবগত। তাই বেশ কয়েকবছর ধরেই বিকল্প জ্বালানী সম্পদের খোঁজ শুরু করেছে বিভিন্ন দেশ। তাই সেই ছোট-বড় বিভিন্ন দেশগুলির দেখানো পথে হেঁটেই একই উদ্যোগ নিল পশ্চিমবঙ্গের এক সংস্থা। স্পিয়ারহেড নামক এই সংস্থা পশ্চিমবঙ্গে প্রায় তিন বছর যাবৎ কাজ করে চলেছে। যাদের মূল লক্ষ্য হল রাজ্যবাসীকে বায়ো-গ্যাস ও সৌরশক্তি ব্যবহারের প্রতি আকৃষ্ট করা। এই লক্ষ্যে স্পিয়ারহেড সংস্থার তরফে ২০১৬ সালেই বায়ো গ্যাস প্রজেক্ট চালু করা হয়েছিল। যা সাধারণ মানুষের কাছে খুবই সহজলভ্য হবে। সংস্থার লক্ষ্য হল আগামী কয়েক বছরে এই বায়ো গ্যাস রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া। এখানে জানিয়ে রাখা হল, বায়োগ্যাস উৎপাদনের জন্য কোনোরকম প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদের (যেমন-খনিজ তেল, কয়লা, গ্যাস ইত্যাদি) প্রয়োজন হয়না। আমাদের দৈনন্দিন ফেলে দেওয়া সব্জির উচ্ছিষ্ট, আখের ছিবড়ে, নারকেল ছিবড়ে, গোবর বা জৈব সারকে কাজে লাগিয়েই বায়ো গ্যাস তৈরী করা সম্ভব। আর এই উপায়কেই কাজে লাগিয়ে বর্তমানে নিজেদের তৈরী বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক দ্রব্যকে কাজে লাগিয়ে বায়ো গ্যাস তৈরী করছে স্পিয়ারহেড। সংস্থার তরফে জানা গেছে, বর্তমানে এই সংস্থার কর্মীরা বর্জ্র পদার্থকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে উৎপাদিত বায়োগ্যাস গৃহিনীদের রান্নাঘরে এবং বিভিন্ন কলকারখানায় পৌঁছে দেওয়া যায় তা নিয়ে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, একদিকে যেমন এলপিজি গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বায়ো গ্যাস তৈরীর চেষ্টা চালানো হচ্ছে তেমনি বর্তমান সিএনজি গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বায়ো-সিএনজি গ্যাস তৈরীর জন্য বায়ো-সিএনজি বটলিং প্ল্যান্ট তৈরীরও উদ্যোগ নিয়েছে। যার ফলে অদূর ভবিষ্যতে বায়ো-সিএনজি গ্যাসকে বিকল্প হিসেবে কাজে লাগানো যায়। স্পিয়ার হেড সংস্থার আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, বর্তমানে বায়ো-গ্যাস তৈরীর জন্য বিশাল প্ল্যান্ট তৈরীরও তেমন একটা প্রয়োজন নেই। তাঁরা জানাচ্ছেন, এটি অনেকটা প্লাগ এন্ড প্লে মডেলের। বাড়ীতে রান্নার জন্য, কিংবা হোটেল, রেস্তরাঁ, ক্যান্টিন কিংবা বিদ্যালয়ে যেকোনো ক্ষেত্রেই বর্তমানে পোর্টেবেল বায়োগ্যাস সিস্টেম ব্যবহার করা খুবই সহজ। উদাহরণ হিসেবে স্পিয়ারহেড সংস্থার একদল গবেষক জানিয়েছেন, কলকাতায় অবস্থিত অস্ত্র কারখানা কর্তৃপক্ষ ২০১৭ সালে স্পিয়ারহেড সংস্থাকে তাদের সমস্যার কথা জানায়। তাদের সমস্যা ছিল, ওই অস্ত্র কারখানার স্টাফ ক্যান্টিন থেকে উদ্ভূত বিপুল পরিমাণ উচ্ছিষ্ট বর্জ্র কারখানা ক্যাম্পাসে দিনের পর দিন সঞ্চিত হচ্ছিল। ওই বর্জ্র পদার্থকে কাজে লাগাতে কারখানা কর্তৃপক্ষ স্পিয়ারহেড সংস্থাকে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানালে সংস্থার একদল কর্মী ওই অস্ত্র কারখানায় হাজির হন। সংস্থার এক কর্মী জানান, পরীক্ষা করে দেখা যায় ওই সেন্ট্রাল ক্যান্টিন থেকে প্রত্যেক দিন গড়ে ৫০ কেজি করে বর্জ্র্য পদার্থ ওই কারখানা ক্যাম্পাসে জমা হয়। এরপর তারা ওই কারখানা কর্তৃপক্ষকে কারখানার অভ্যন্তরেই একটি পোর্টেবেল বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বসানোর কথা জানান। স্পিয়ারহেড সংস্থার কথামতো ক্যান্টিনের বর্জ্র নিষ্কাশনের উপায় হিসেবে ওই কারখানা কর্তৃপক্ষ একটি পোর্টেবেল বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বসায়। বাকিটা সকলের চোখের সামনে। বর্তমানে ওই কারখানার সমস্ত কর্মীর খাবার তৈরী হয় ওই বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট থেকে তৈরী জ্বালানী থেকে। এরফলে একদিকে যেমন কারখানা কর্তৃপক্ষের এলপিজি সিলিন্ডার ক্রয়ের খরচ হ্রাস পেল তেমনি কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা বর্জ্র পদার্থ থেকেও মুক্ত হল কারখানা ক্যাম্পাস। উদাহরণ হিসেবে স্পিয়ারহেড সংস্থার এক আধিকারিক জানান, ওই কারখানা থেকে দৈনিক ৫০ কেজি বর্জ্য থেকে যে পরিমাণ বায়োগ্যাস তৈরী হয় তা মাসে প্রায় ৫টি এলপিজি সিলিন্ডারের সমান। তাহলে একবার হিসেব করুন, দৈনিক সারা বিশ্বে যে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক বর্জ্য আমরা অপ্রয়োজনীয় হিসেবে ফেলে দিচ্ছি তা থেকে ঠিক কত পরিমাণ জ্বালানী উৎপাদিত হওয়া সম্ভব। আর এখানেই স্পিয়ারহেড সংস্থার সাফল্য। পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা বিশ্বকে অপ্রচলিত শক্তি ব্যবহার করেও যে প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা যায় সেইবিষয়ে পথ দেখাচ্ছে এই সংস্থা। বর্তমানে কলকাতায় অবস্থিত কাদিহাটি কালীনাথ হাই স্কুল ও বিষ্ণুপুর স্যার রমেশ ইন্সটিটিউশনে এই একই পদ্ধতিতে বায়ো গ্যাস তৈরী করে প্রত্যেক দিন স্কুলের ৩০০ পড়ুয়ার মিড-ডে মিলের খাবার তৈরী করা হয়। এই পরিসংখ্যান সত্যিই তাৎপর্যপূর্ণ। জানা গেছে ওই স্কুলের বায়ো গ্যাস প্ল্যান্টে প্রত্যেকদিন যে পরিমাণ মিথেন গ্যাস তৈরী হয় তা পাইপ লাইনের সাহায্যে স্কুলের কিচেনে পাঠানো হয়। একবার ওই প্ল্যান্টের গ্যাস ধারণ ক্ষমতা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছালে তা থেকে টানা দুঘন্টা রান্নার কাজ চালানো সম্ভব হয় বলে জানিয়েছে স্পিয়ারহেড। এইসব তথ্য পাওয়ার পর এই প্রশ্ন উঠতেই পারে যে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে বায়ো গ্যাস বা সৌরশক্তিকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে কী ধরণের আগ্রহ রয়েছে। স্পিয়ারহেড সংস্থার তরফে দাবী করা হয়েছে, গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গ সহ সারা ভারতে অপ্রচলিত শক্তি ব্যবহারের প্রচলন উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। তবে তারা এও জানিয়েছেন এই অপ্রচলিত শক্তিকে আরও মানুষের কাছে নিয়ে যেতে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারকে যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। খনিজ সম্পদের দ্রুত নিঃশ্বেষ, দেশের আর্থিক ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি পরিবেশ রক্ষায় খনিজ তেল ও খনিজ পদার্থ ব্যবহারের হ্রাস করতে বায়োগ্যাস ও সৌরশক্তি ব্যবহারে জনগনকে নিয়মিত সচেতন ও বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালানোর পরামর্শ দিচ্ছে এই সংস্থা। আর তাহলেই আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী হয়ে উঠতে পারে সুস্থ, সবল ও সুন্দর।