“ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে তৃণমূল শ্রমিক সংগঠন আজ বিপন্ন, কে স্বচ্ছ আর কে অস্বচ্ছ তা নিয়ে বিভ্রান্ত স্থানীয় মানুষ”

0
1423

অমল মাজি,দুর্গাপুরঃ- ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে দুর্গাপুরে তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের ঐতিহ্য আজ বিপন্ন। উদ্ভুত পরিস্থিতি সামাল দিতে কয়েকজনকে নবান্নে ডেকে পাঠালেন দলনেত্রী। দুর্গাপুরে গ্রাফাইট কারখানায় ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে ফের প্রকাশ্যে চলে এলো তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। প্রভাত চ্যাটার্জি বনাম কংগ্রেস বিধায়ক বিশ্বনাথ পারিয়াল গোষ্ঠী। শুক্রবার দুর্গাপুরের সাগরভাঙার গ্রাফাইট ইন্ডিয়া লিমিটেড কারখানা চত্বরে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তুমুল গন্ডগোল বাঁধে। বিশ্বনাথ পাড়িয়ালের অভিযোগ, এই কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে স্বজন পোষণ চলছে। স্থানীয় বেকার যুবকদের বঞ্চিত করে বাইরে থেকে লোক এনে নিয়োগ করা হচ্ছে মোটা টাকার বিনিময়ে | কারখানার শ্রমিক নেতারা নিজেদের ভাগ্নে, ভাইপো,জামাইদের চাকরি দিচ্ছে।
ঘটনায় প্রকাশ, কংগ্রেস বিধায়ক তথা আইএনটিটিইউসি জেলা সভাপতি বিশ্বনাথ পারিয়াল গ্রাফাইট কারখানায় কর্মী নিয়োগের এমন দুর্নীতির বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে কারখানার বাইরেই বিধায়ক ও তার সঙ্গীদের আটকে দেয় প্রভাত চ্যাটার্জি ও মলয় ঘটক ঘনিষ্ঠ ওই কারখানার শ্রমিক নেতা রমজান শেখ, দিলীপ ধীবর ও তার দলবল। অভিযোগ, প্রভাত চ্যাটার্জির অনুগামী গ্রাফাইটের শ্রমিকরা বিশ্বনাথবাবুর আসার খবর পেয়েই সকাল থেকে কারখানার উৎপাদন বন্ধ রেখে কারখানার গেটের সামনে কালো পতাকা লাগিয়ে দেয় এবং প্রায় তিনশো শ্রমিককে গেটের ভেতর মোতায়েন করা হয়। সকাল এগারোটাই বিশ্বনাথ পাড়িয়াল ও তার অনুগামী কর্মী ও কাউন্সিলররা আসেন কারখানার সামনে। কিন্তু তাদের কারখানার ভেতর ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সকাল এগারোটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত কারখানার গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন বিশ্বনাথবাবু ও তার অনুগামীরা। তাদের ধর্য্যের বাঁধ ভাঙে। বিকেল চারটে নাগাদ কারখানার গেট ভাঙার উপক্রম চলে কোনোক্রমে গেট খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং কারখানার ভেতরে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ। এই নিয়ে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে গন্ডগোল বাধে। উত্তেজনা ছড়ায় কারখানার ভেতর চত্বরে। পুলিশের কম্ব্যাট ফোর্স ব্যাপক লাঠি চার্জ শুরু করে। আহত হয় ৪নং বোরো চেয়ারম্যান চন্দ্রশেখর ব্যানার্জি সহ কয়েকজন | বিশ্বনাথ ও তার অনুগামীদের বিরুদ্ধে কারখানার গেট ও অফিসঘর ভাংচুরের অভিযোগ ওঠে।
এই প্রসঙ্গে বিধায়ক তথা আইএনটিটিইউসি-র সভাপতি বিশ্বনাথ পাড়িয়ালের বক্তব্য, তিনি অভিযোগ পেয়েছিলেন যে গ্রাফাইট কারখানার রমজান সেখ, দিলীপ ধীবর সহ একদল ধান্দাবাজ নেতা মোটা টাকার বিনিময়ে বাইরে থেকে লোক নিয়োগ করছে গ্রাফাইট কারখানায়। তাই শ্রমিকদের স্বার্থে তিনি নিয়োগের স্বচ্ছতার বিষয়ে কারখানার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু, রমজান শেখ, দিলীপ ধীবর ও তার দলবল পথ আটকায়। এমনকি তাদের উপর রীতিমত হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ।
বিশ্বনাথ পাড়িয়ালের বক্তব্য, তাকে স্বয়ং দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জি তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের জেলার দায়িত্ব দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন, তাসত্বেও কেনো
শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক সংগঠনের রাশ নিয়ে প্রভাত চ্যাটার্জীর সঙ্গে তার কোন্দল জিইয়ে রাখা হচ্ছে ?
বিশ্বনাথবাবু বলেন, রমজান সেখ তৃণমূলের বহিস্কৃত নেতা। অথচ এই রমজান সেখ মন্ত্রী মলয় ঘটকের অনুগামী নেতা বলে পরিচিত। মলয় ঘটকের নির্দেশ ছাড়া রমজান সেখ, দিলীপ ধীবররা কিছু করেন না। আবার বিশ্বনাথবাবু মলয় ঘটকের সঙ্গে আলোচনা করে এসেই এদিন গ্রাফাইট কারখানায় ঢোকার চেষ্টা করেন। অথচ তাকে বাধা দেন রমজান শেখ ও তার অনুগামীরা এর মানে কি? সমীকরণটা কারোর বুঝতে অসুবিধা নেই। যখন তাকে গেটে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, তখন মলয় ঘটক কারখানায় বারবার ফোন করে বলেছেন, বিশ্বনাথকে ঢুকতে দেওয়া জন্য। অপরদিকে আসানসোলের আর এক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা কারখানায় ফোন করে বলেছেন, কোনোভাবেই বিশ্বনাথকে কারখানায় ঢুকতে দেবে না। এ এক জটিল সমীকরণ। শুধু তাই নয়, বিশ্বনাথবাবু অভিযোগ তুলেছেন, রমজান সেখ, দিলীপ ধীবররা মোটা টাকার বিনিময়ে গ্রাফাইট কারখানায় চাকরি দিচ্ছে। স্বজন পোষণ চলছে। বিশ্বনাথবাবু ঠিক বলেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই এমনটাই চলছে। কিন্তু বিশ্বনাথবাবুর সঙ্গে সগর ভাঙার যারা গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যারা এই গ্রাফাইট কারখানায় চাকরি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বহু মানুষের কাছ থেকে মোটা টাকা নিয়ে রেখেছেন। বিশ্বনাথবাবু কি টা জানেন? সগর ভাঙ্গায় কান পাতলেই জানতে পারবেন সেইসব অভিযোগের কথা | কেউ কেউ আছেন যারা চাল চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত। তারা এখন নিজেদের পিঠ বাঁচাতেই বিশ্বনাথবাবুর নৌকায় চেপে বৈতরণী পার হতে চাইছেন।
অন্যদিকে, বেশ কিছুদিন ধরে গ্রাফাইট কারখানায় ভি আর এস -এর মাধ্যমে পোষ্যদের চাকরি দেওয়ার কথা চলছে। অভিযোগ সেখানেও কোটি কোটি টাকার গল্প চলছে | স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, সিপিএমের আমল থেকে যারা গ্রাফাইট কারখানায় চাকরি করছেন, যাদের অবসরের সময় হয়ে এসেছে, তারা ভি আর এস -মাধ্যমে নিজের ছেলেদের চাকরি দেওয়ার সুযোগ পাবে। এই প্রথা চালু করার জন্য সুযোগসন্ধানীরা জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আরও অভিযোগ, প্রত্যেক মাথাপিছু কর্মীর কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়ার কথা চলছে | সেক্ষেত্রে একশোজনের কাজ হলে পাঁচ কোটি টাকার গল্প | এই চক্রান্তের পেছনে হাত কার ? বিশ্বনাথবাবু এর পক্ষে না বিপক্ষে? যদি বিপক্ষে হন তাহলে প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করুন। আর যারা চাকরি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইতিমধ্যে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে বসে আছেন, প্রকাশ্যে ঘোষণা করুন তাদের পাশেও আপনি নেই।
শুধু গ্রাফাইট কারখানাতেই নয়। তার সামনে এসআরএমবি কারখানাতেও একই চিত্র। স্থানীয় বেকার যুবকদের বঞ্চিত করে সেখানেও বহিরাগতরা চাকরি করছে। এখানেও ধান্দাবাজ নেতারা ছড়ি ঘোরাচ্ছে। এনিয়ে এলাকার মানুষদের বহু অভিযোগ। এই কারখানাতে স্থানীয়দের চাকরি হলে এলাকায় আর বেকার থাকবে না। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে ?

এ সম্পর্কে ৪নং বোরো চেয়ারম্যান চন্দ্রশেখর ব্যানার্জি বলেন, গ্রাফাইট আর এসআরএমবি -তে স্থানীয় বেকারদের চাকরি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে স্থানীয় যুবকরা বেকাররা চাকরি পাবে না, অথচ বাইরের থেকে লোক এনে মোটা টাকার বিনিময়ে চাকরি দেওয়া চলবে না। এটা বন্ধ করতে হবে। আর স্থানীয় নেতাদের কারোর দেওয়া নামের তালিকা মোতাবেক লোক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। যদি নিয়োগ করতে হয়, সেক্ষেত্রে একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি, যেমন মেয়র। তিনি তার নিরপেক্ষ তদন্তের প্রেক্ষিতে বিচার করে দেখবেন। এলাকায় কারা বেকার, কোন পরিবারের একটি চাকরির প্রয়োজন আছে এমন বেকার, এলাকার গরিব, অসহায় পরিবারের বেকার যুবকদের চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। চন্দ্রশেখর বাবু বলেন, গ্রাফাইট কারখানায় প্রস্তাবিত ভিআরএস মাধ্যমে চাকরি প্রক্রিয়া চক্রান্ত বন্ধ করতে হবে| এমন দুর্নীতি মেনে নেওয়া হবে না। কারণ এভাবে চাকরি প্রক্রিয়া চালু হলে সিপিএম নেতারা বংশানুক্রমে চাকরি পেতেই থাকবে। আর অন্যরা বঞ্চিত হতেই থাকবে। এটা কোনোমতেই মেনে নেওয়া হবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here