বিজেপি নেতাকে সাথে নিয়ে চিট ফান্ড ডন কে ধরতে এসে নাকাল হল উত্তরপ্রদেশ পুলিশ

0
946

মনোজ সিংহ ও বিমান পন্ডিত, দুর্গাপুরঃ- টানা ছ’ঘন্টা টানা পোড়েনের পর শেষ পর্যন্ত বেলা সোওয়া ৩ টা’য় তার সিটিসেন্টারের বাড়ি থেকে চিট ফান্ড জালিয়াতিতে অভিযুক্ত প্রফুল্ল কুন্ডু কে দ্বিতীয়বার উঠিয়ে নিয়ে গেল উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। পাশাপাশি হানা চলল প্রফুল্ল কুন্ডুর শাগরেদ সৈকত ব্রম্মচারীর দুর্গাপুরের ডেরাতে ও।


বুধবার সকাল সাড়ে ৯ টা’য় প্রফুল্ল’র সিটিসেন্টারের আলাউদ্দিন খান বিথি’র বাড়িতে হানা দেয় উত্তরপ্রদেশের দেউরিয়া জেলার সালেমপুর থানার পুলিশের দলটি। সে সময়ই, পুলিশ দেখেই বাড়ির পাঁচিল টপকে ঘর থেকে উধাও হয়ে যায় প্রফুল্লর পুত্র অর্ণব কুন্ডু। কিন্তু, তাদের কাছে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তৎক্ষনাৎ না থাকায় এবং সাথে স্থানীয় দুর্গাপুর পুলিশের কোনো আধিকারিক না থাকায় গোড়ায় কুন্ডুর পরিবারের প্রতিরোধের মুখে পড়ে সাদা পোষাকে থাকা উত্তরপ্রদেশ পুলিশের দলটি। বিপত্তি আরো বাড়ে, পুলিশের সাথে সেখানকার ৩৪১ নম্বর বিধানসভা এলাকার ভারতীয় জনতা পার্টির আই.টি. সেলের সহকারি সংযোজক পঙ্কজ পাশোয়ান নিজে কুন্ডু’র গ্রেপ্তারীর তদারকি করায়। আলাউদ্দিন খান বিথি’র স্থানীয়রা প্রশ্ন করেন, পুলিশের সাথে বিজেপির আই.টি. সেলের লোক কেন? পঙ্কজ গোটা গ্রেপ্তারি পর্বের ভিডিওগ্রাফী করছিলেন। স্থানীয়দের বাধায় গোড়ায় মেজাজ হারালেও, থতমত খেয়ে যান যখন কুন্ডু’র স্ত্রী স্থানীয় থানায় ফোন করেন। তখন পঙ্কজ বলেন, “যারা আমাদের ওখানে এই প্রফুল্ল কুন্ডুর দ্বারা প্রতারিত, আমরা দলের পক্ষ থেকে তাদের কে গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশের সাথে রয়েছি। এটা এখন ওখানকার রেওয়াজ। আমাদের ওপর দলের নির্দেশও সেই রকম”। সেখানকার শাসক দলের কর্মী কে সাথে নিয়ে দুর্গাপুরে আসায় বেকায়দায় পড়ে উত্তরপ্রদেশ পুলিশও। সালেমপুর থানার সাব ইন্সপেক্টর মঙ্গঁলা প্রসাদ কনস্টেবল রাম নরেশ পাশোয়ান তখন কুন্ডু’র পরিবারের চাপে প্রফুল্ল কে সিটিসেন্টার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যেতে বাধ্য হন। আবার তারা যে গাড়িটিতে কুন্ডু কে ধরতে আসেন, সেই স্করপিও গাড়টি (নং- এ.এস.০৬ এম/৫২৬৯) ও আসাম রাজ্য পরিবহণ দপ্তরে নথীকৃত। দুর্গাপুর পুলিশও সাফ জানায়, কাস্টডি মেমো না দিয়ে, ট্রানজিস্ট রিমান্ড না করিয়ে অভিযুক্ত কে দুর্গাপুর থেকে নিয়ে যাওয়া যাবে না। এরপরই সিটিসেন্টার পুলিশ ফাঁড়ি থেকে প্রফুল্ল কে ফের তার বাড়ীতে ফেরৎ পাঠানো হয় এর সেখানে নজরদারিতে বসে পড়েন কনস্টেবল রাম নরেশ। ঘন ঘন উত্তরপ্রদেশ পুলিশ কর্তাদের সাথে ফোনে কথা বলতে দেখা যায় মঙ্গঁলা প্রসাদ এবং পঙ্কজ পাশোয়ান কে। বিনা কাগজ কলমে প্রফুল্ল কুন্ডু কে ধরতে আসা যে কিছুটা কাঁচা কাজ হয়ে গেছে, ততক্ষনে বুঝে গেছেন মঙ্গঁলা প্রসাদ। তিনি বলেন, “প্রফুল্ল কুন্ডু’র জালিয়াতির বিষয়টির তদন্ত ভার আমার হাতে আসে ২০ নভেম্বর, ২০১৯ এ। এর আগে এই কেসের নয় জন তদন্তকারি অফিসার বদলি হয়ে গেছেন। সালেমপুরের থানায় এ বিষয়ে একটি কথা প্রচলিত আছে- পি.কে (প্রফুল্ল কুন্ডু) মামলায় হাত দিলেই নাকি তাবাদলা হয়ে যায়। দেড় বছরে আমি চারটি চিটফান্ড কেসে পান্ডাদের গ্রেপ্তার করেছি। এখন ধরলাম একে”।
দুর্গাপুর পুলিশ মহলে নাকি বিস্তর প্রভাব ছিল পি.কে.র, বলে মঙ্গঁলা প্রসাদ জানান। বলেন, “দু’বছরে চারবার ওকে ধরতে এসেও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে আমাদের পুলিশ কে”।


প্রফুল্ল কুন্ডু নয়ের দশকে গ্রীন ব্যানিয়ান নামে চিটফান্ড খুলে দুর্গাপুরের প্রশাসনিক মহল, পুলিশ ও তৎকালীন রাজনৈতিক মহলে দারুন প্রভাব খাটাতেন। ১৯৯৫ সালে গ্রেপ্তারের পর তার ব্যবসাও গুটিয়ে যায় দুর্গাপুরে। শাগরেদ করুনাময় হালদার কে সাথে নিয়ে নদিয়ার বেথুয়াডহরী, হরিনঘাটা, বাঁকুড়া, দুর্গাপুরে চিটফান্ড কারবারের রমরমা ছিল তার। কিন্তু, ২০০৯ সাল থেকে তিনি যে উত্তরপ্রদেশের বেনারস, গোরক্ষপুর, গাজীপুর, গোলাবাজার সহ ১২ টি জায়গায় দপ্তর খুলে নতুন করে চিটফান্ড কারবার শুরু করে বসেছেন, তা অজানা ছিল দুর্গাপুর বাসীর। বিষয়টি নিয়ে জোরদার নড়াচড়া শুরু হয়, ১২ মে, ২০১৭ তে সালেমপুরের সুরেশ কুশওয়াহ প্রফুল্লর বিরুদ্ধে ৩০ লক্ষ টাকার প্রতারনার মামলা রুজু করলে অভিযোগে সুরেশ দাবি করেন, ২০১৬ সালের ৪ মে তিনি প্রফুল্লর’র সংস্থায় ৩০ লক্ষ টাকা বিভিন্ন আমানতকারীর কাছ থেকে নিয়ে জমা করছিলেন। একই অভিযোগ আরেক এজেন্ট মনোজ সিং-র। মনোজ বলেন, “আমার মাধ্যমে আমানতকারীরা ৮০ লক্ষ টাকা জমা করেছে এম.বি. কয়ে সংস্থায়”।
উত্তরপ্রদেশ পুলিশ তাকে সিটিসেন্টার পুলিশ ফাঁড়িতে আনার পর প্রফুল্ল দাবি করেন, ওই রাজ্য থেকে তার সংস্থা ৯ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করেছিল ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। কিন্তু, তিনি বলেন, “আমার ওখানকার পার্টনার রবি প্রসাদের মারফৎ আমি ৫ কোটি টাকা ইতিমধ্যেই ফেরৎ দিয়েছি। সেই রবি টাকা নিয়ে বিদেশে পালিয়েছে, আমি আর কি করবো?
কি করবেন? বাঁকুড়ার ধ্বনি মোড়ে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে পেল্লাই হোটেল বানিয়েছে প্রফুল্ল। বর্ধমানে খুলে বসেছেন মোটর সাইকেলের ডিলার শিল্পের ব্যবসা।
“আমরা ওর প্রতিটি ব্যবসার ব্যাপারে সব রকম খোঁজ খবর নিচ্ছি”, বললেন সালেমপুর থানার ষ্টেশন হেড অফিসার এ.কে. রায়। তিনি জানান, “সৈকত ব্রম্ভচারী ও আরেক অভিযুক্ত অলঙ্কার গুপ্তার খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি”।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here